রিভিশনিষ্ট দৃষ্টিকোণে কোরানের বিভাজন:
আগের পর্বে কোরানের মাক্কী সুরাগুলি যে আসলে খৃষ্টীয় শ্লোকগুচ্ছ ছিল তা নির্দিষ্টভাবে প্রমান করা হয়েছে। গবেষক গান্টার লুলিং অধিকাংশ মক্কী সুরাকে খৃষ্টীয় শ্লোকে পুনর্গঠিত করে দেখিয়েছেন। মক্কী ও মাদানি (অন্য কোন পরিভাষা না থাকায় ইসলামী পরিভাষাই ব্যবহার করতে বাধ্য হলাম) সুরার মধ্যে ভাষাগত ও বক্তব্যগত উভয়দিক থেকেই বিপুল তফাৎ রয়েছে। কোরানের ভাষাগত অসংলগ্নতার যে অভিযোগ তা মূলত মক্কী সুরাগুলিকে ঘিরেই। মক্কী সুরাগুলোর বিষয়বস্তু হয় নীতিকথা না হয় পুরাকালের নবীদের গাল-গল্প। অপরদিকে মাদানি সুরাগুলোর বক্তব্য পরিস্কার, কিন্তু বিশেষ কোন ছন্দগত বৈশিষ্ট নেই। ব্লগার নরসুন্দর মানুষ তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে মদিনায় অবতীর্ণ সুরাগুলিকে ‘জিহাদ আর গনিমতের মালে মাখামাখি’- বলে বর্ণনা করেছেন।
প্রকৃতই মক্কী সুরার সাথে মাদানি সুরার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য হল দৃষ্টিভঙ্গীর। নিচে কতগুলি মক্কায় অবতীর্ণ (ইসলামী বিবরণ অনুসারে)আয়াত দেওয়া হল-
১. “আমি তো একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র” [সূরা - আনকাবুত ২৯:৫০] ( মক্কায় অবতীর্ণ)
২. “তোমার ধর্ম তোমার কাছে, আমার ধর্ম আমার কাছে” [সূরা কাফিরুন -১০৯: ০৬] ( মক্কায় অবতীর্ণ)
৩. “কাফেররা বলেঃ তাঁর প্রতি তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন অবতীর্ণ হল না কেন? আপনার কাজ তো ভয় প্রদর্শন করাই এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যে পথপ্রদর্শক হয়েছে”[সূরা রাদ -১৩: ৭] ( মক্কায় অবতীর্ণ)
৪. “আর তোমার পরওয়ারদেগার যদি চাইতেন, তবে পৃথিবীর বুকে যারা রয়েছে, তাদের সবাই ঈমান নিয়ে আসতে সমবেতভাবে। তুমি কি মানুষের উপর জবরদস্তী করবে ঈমান আনার জন্য?” [ সুরা ইউনুস ১০:৯৯ ] ( মক্কায় অবতীর্ণ)
৫.“অতএব, আপনি উপদেশ দিন, আপনি তো কেবল একজন উপদেশদাতা, আপনি তাদের শাসক নন” [সুরা গাশিয়াহ, ৮৮:২১-২২](মক্কায় অবতীর্ণ)
এবার কতগুলি মাদানি সুরা দেখুন-
১. যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে| এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি|[সুরা মায়েদা, ৫:৩৩] (মদিনায় অবতীর্ণ)
২. তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবে র ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে। [সুরা তাওবা, ৯:২৯] (মদিনায় অবতীর্ণ)
৩. অভিশপ্ত অবস্থায় তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে, ধরা হবে এবং প্রাণে বধ করা হবে। [ সুরা আহযাব ৩৩:৬১ ] (মদিনায় অবতীর্ণ)
৪. আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব। কাজেই গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাট জোড়ায় জোড়ায়।[ সুরা আনফাল ৮:১২ ] (মদিনায় অবতীর্ণ)
৫. সুতরাং যদি কখনো তুমি তাদেরকে যুদ্ধে পেয়ে যাও, তবে তাদের এমন শাস্তি দাও, যেন তাদের উত্তরসূরিরা তাই দেখে পালিয়ে যায়; তাদেরও যেন শিক্ষা হয়। [ সুরা আনফাল ৮:৫৭ ] (মদিনায় অবতীর্ণ)
৬. যুদ্ধ কর ওদের সাথে, আল্লাহ তোমাদের হস্তে তাদের শাস্তি দেবেন। তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন এবং মুসলমানদের অন্তরসমূহ শান্ত করবেন। [ সুরা তাওবা ৯:১৪ ] (মদিনায় অবতীর্ণ)
অ্যাপ্রোচের পার্থক্য অতি পরিস্কার। আলী দস্তিকে অনুসরণ করে হালফিলের প্রায় সব নাস্তিক ব্লগাররা যে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন তা হল- যে মক্কায় মুহম্মদ ছিলেন একজন সামান্য ধর্মপ্রচারক, তার অনুগামীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। সংখ্যালঘু হওয়ার ফলে তার কারুর বিরুদ্ধে জিহাদ করার বা প্রতিশোধ নেওয়ার সাধ্যই ছিল না। তাই তখন তার মুখ দিয়ে বেড়িয়েছে শান্তির বাণী। অপরপক্ষে মদিনায় যখনই তার যুদ্ধ করার মত সামর্থ্য হয়েছে এই শান্তির ধর্মপ্রচারক পরিণত হয়েছেন যুদ্ধবাজ নেতায়। সুতরাং মুহম্মদের এই পরিবর্তিত মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে তার রচিত মাদানি সুরায়। স্বাভাবিকভাবেই আমরা এইরকম বিশ্লেষনের সাথে একমত হতে পারছি না। এর আগের কয়েকটি পর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি কোরান আর যাই হোক না কেন মুহম্মদ নামক কোন ব্যক্তির রচিত নয়। শুধু মুহম্মদ কেন কোরান কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে রচিত হয়নি। পূর্নাঙ্গ ধর্মগ্রণ্থ উদ্ধূত হওয়ার আগে হিসাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোরান সংকলন ও সম্পাদনা চলতে থেকেছে।
ইসলামিক বিবরণের যে বেশীরভাগটাই অতিকথন তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। যেখানে খোদ মুহম্মদের ঐতিহাসিক অস্তিত্তই সন্দেহজনক সেখানে মক্কী ও মাদানি সুরার পার্থক্য যে পুরোপুরি যদৃচ্ছ হতে বাধ্য তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ মক্কী ও মাদানি সুরায় কোরানের বিভাজনের সাথে কথিত মুহম্মদের জীবন জড়িত। সরল যুক্তি অনুসারে মক্কী ও মাদানি সুরার মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্যই থাকা উচিত নয়। কারণ এই পরিভাষা দুটির সাথে জড়িয়ে থাকা প্রায় সমস্ত কাহিনীই শুধুমাত্র পৌরাণিক গল্প। অথচ আমরা একটু আগেই দেখলাম এই দুই ধরণের সুরা দুটি প্রায় বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিনিধিত্ব করে। অর্থ্যাৎ প্রচলিত ইসলামিক অর্থে না হলেও মক্কী ও মাদানি হিসাবে কথিত দুই ধরণের সুরার মধ্যে প্রকৃতই পার্থক্য রয়েছে।
আসলে মক্কী সুরাগুলি মধ্যপ্রাচ্যের এক ক্ষুদ্র খৃষ্টীয় ধর্মীয় আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে যেটা রোমান ক্যাথলিসিজম থেকে ক্রমাগত নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছিল। কয়েকশত বছরের ব্যবধানে যেটা নতুন ধর্ম হিসাবে উদ্ধুত হবে। আর মাদানি সুরাগুলি প্রতিনিধিত্ব করে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যের। উপরে উল্লিখিত আয়াতগুলিতে আমরা কি একজন যুদ্ধবাজ সম্রাটকে দেখতে পাই না? যিনি তার অধীনস্থ সেনাদলকে শত্রুপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে নির্দেশ দিচ্ছেন। এইভাবে সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে তৈরী হয় একটা গোটা ধর্ম। আমরা ইসলামের যে আগ্রাসী রূপের সাথে পরিচিত তার মূল উৎস হয়ত কল্পিত মুহম্মদের জীবনের মধ্যে নয় বরং তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
খৃষ্টীয় স্তোত্তকে বারবার সম্পাদনার মাধ্যমে ইসলামিক বিন্যানের সাথে মিলিয়ে নিতে হয়েছে। বারবার সম্পাদনা করতে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ভাষাগত অসংলগ্নতা। এইকারণেই মক্কী সুরাগুলির অর্থ অতি দুর্বোধ্য, এমনকি আমরা আগে দেখেছি তাফসিরকারকরা পর্যন্ত্য অনন্যোপায় হয়ে অযৌক্তিক সমঝোতা করতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে মাদানি সুরাগুলি খৃষ্টীয় শ্লোক ছিল না, তাই সম্পাদনারও প্রয়োজন পরে নি। সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক প্রয়োজনে পরবর্তীকালে ঢোকানো হয়েছে। তাই এই সুরাগুলির ভাষা ও বক্তব্য উভয়েই যথেষ্ট সুসঙ্গত। রিভিশনিষ্ট পর্যবেক্ষণ এইভাবে আমাদের একটি সামগ্রিক চিত্রের সামনে হাজির করে যা ইতিপূর্বের বিশ্লষনে ছিল অনুপস্থিত।
বি.দ্র: আপনি যদি অতি অনুসন্ধিৎসু পাঠক হয়ে থাকেন; আমার এই ব্লগ পড়ার পর উৎসাহীত হয়ে নিজেই মক্কী ও মাদানি সুরার পার্থক্য মিলিয়ে দেখতে যান- তাহলে দু জায়গায় বড়সড় ধাক্কা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। দুটি ক্ষেত্রে মাদানি সুরায় উপরোল্লিখিত মক্কী আয়াতের মতো সহনশীলতা চোখে পড়বে। একটা হল অতিপরিচিত সুরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াত - দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই (২:২৫৬) আর একটা হল সুরা মায়েদার ৩২ নং আয়াত- “যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে” (৫:৩২)। যেহেতু ইসলামিক বিবরণে বিশেষ আস্থা রাখি না, তাই বেশী গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না। সুরা মায়েদার একেবারে পরের আয়াতেই একেবারে উল্টো বক্তব্য আছে। আর বাকারার এই সহনশীল আয়াতটির সামনে পেছনে উগ্র বক্তব্যযুক্ত বিস্তর আয়াত পাওয়া যাবে। এই আয়াতদুটি অনায়াসে প্রক্ষিপ্ত অংশ হতে পারে।
খৃষ্টীয় স্তোত্তকে বারবার সম্পাদনার মাধ্যমে ইসলামিক বিন্যানের সাথে মিলিয়ে নিতে হয়েছে। বারবার সম্পাদনা করতে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ভাষাগত অসংলগ্নতা। এইকারণেই মক্কী সুরাগুলির অর্থ অতি দুর্বোধ্য, এমনকি আমরা আগে দেখেছি তাফসিরকারকরা পর্যন্ত্য অনন্যোপায় হয়ে অযৌক্তিক সমঝোতা করতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে মাদানি সুরাগুলি খৃষ্টীয় শ্লোক ছিল না, তাই সম্পাদনারও প্রয়োজন পরে নি। সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক প্রয়োজনে পরবর্তীকালে ঢোকানো হয়েছে। তাই এই সুরাগুলির ভাষা ও বক্তব্য উভয়েই যথেষ্ট সুসঙ্গত। রিভিশনিষ্ট পর্যবেক্ষণ এইভাবে আমাদের একটি সামগ্রিক চিত্রের সামনে হাজির করে যা ইতিপূর্বের বিশ্লষনে ছিল অনুপস্থিত।
বি.দ্র: আপনি যদি অতি অনুসন্ধিৎসু পাঠক হয়ে থাকেন; আমার এই ব্লগ পড়ার পর উৎসাহীত হয়ে নিজেই মক্কী ও মাদানি সুরার পার্থক্য মিলিয়ে দেখতে যান- তাহলে দু জায়গায় বড়সড় ধাক্কা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। দুটি ক্ষেত্রে মাদানি সুরায় উপরোল্লিখিত মক্কী আয়াতের মতো সহনশীলতা চোখে পড়বে। একটা হল অতিপরিচিত সুরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াত - দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই (২:২৫৬) আর একটা হল সুরা মায়েদার ৩২ নং আয়াত- “যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে” (৫:৩২)। যেহেতু ইসলামিক বিবরণে বিশেষ আস্থা রাখি না, তাই বেশী গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না। সুরা মায়েদার একেবারে পরের আয়াতেই একেবারে উল্টো বক্তব্য আছে। আর বাকারার এই সহনশীল আয়াতটির সামনে পেছনে উগ্র বক্তব্যযুক্ত বিস্তর আয়াত পাওয়া যাবে। এই আয়াতদুটি অনায়াসে প্রক্ষিপ্ত অংশ হতে পারে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন