রবিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৭

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-১৪

রিভিশনিষ্ট পর্যবেক্ষনে নবী মুহম্মদ:

ফেসবুক ও ব্লগের দৌলতে মুহম্মদের জীবনী এখন কমবেশী প্রায় সবারই জানা। নিশ্চয়ই আর তা নতুন করে বলার কিছু নেই। দ্বিতীয় পর্বে ইসলামী বিবরণের একটা ছোট রূপরেখা দেওয়া আছে। অপরপক্ষে রিভিশনিষ্ট পর্যবেক্ষনে আমরা যে চিত্র পাই তা সম্পূর্ণভাবে আলাদা। আমরা এর আগের তেরোটি পর্বে দেখেছি-
  • প্রচলিত বিবরণে মুহম্মদের মৃত্যুকাল ৬৩২ খৃষ্টাব্দে ধার্য করা হয়েছে। অথচ একটি খৃষ্টীয় নথিতে আমরা এক আরব নবীর উল্লেখ পাই যিনি অন্তত ৬৩৪ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত্য সক্রিয় ছিলেন
  • সপ্তম শতাব্দীর কোন ঐতিহাসিক বিবরণে আরবদের (অর্থ্যাৎ এই নবীর অনুগামীদের) মুসলীম বলা হয়নি। বলা হয়েছে সারাসেনীয়, ইসমেলাইট, হাজারীয় ইত্যাদী
  • আরব বিজেতাদের যে সর্বপ্রাচীন মুদ্রা পাওয়া যায় তাতে বিসমিল্লাহ নেই। পরের দিকে দু একটিতে মুহম্মদ-শব্দটি থাকলেও ওই শব্দটি কি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে সেটা অনিশ্চিত। বিস্তারিত পঞ্চম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
  • অন্তত দুটি মুদ্রা আমরা পেয়েছি যেখানে মুসলিম শাসককে ক্রসবহনরত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। তৃতীয় পর্বে ছবি দেওয়া আছে
  • নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক উপাদান থেকে দেখা যাচ্ছে অষ্টম শতাব্দীর প্রথম দশকের আগে কোরান প্রচলিত হয়নি। এমনকি সে কোরানও আজকের প্রচলিত আকারে ছিল না।
  • ইসলামিক বিবরণগুলি এত পরের যে তাতে আস্থা রাখা মুশকিল। প্রথম ব্যাপকভাবে প্রচলিত হাদিস সংকলন প্রকাশিত হয় মুহম্মদের কথিত সময়কালের অন্তত ১৪ দশক পরে। প্রথম সিরাত গ্রন্থ লেখা হয় ১২৫ বছর পরে।
  • আবদ আল মালিকের আমল থেকে আমরা ইসলামের নবী মুহম্মদের উল্লেখ পেতে শুরু করি। এইসময় থেকেই হাদিসের প্রচলন শুরু হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রনোদনা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক।
  • কোরান বিশেষজ্ঞ স্ক্রিস্তোফ লুক্সেমবার্গ আর রিচার্ড বেল কোরানে একাধিক সম্পাদনার চিহ্ন আবিস্কার করেছেন।
  • পরিশেষে ১২ তম পর্বে এসে আমরা আরেকজন কোরান বিশেষজ্ঞ গান্টার লুলিং এর গবেষনার সাথে পরিচিত হয়েছি। খৃষ্টধর্ম ও ইসলামের অভ্যান্তরীন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
এখন এই সবকিছুর অর্থ কি? নবী মুহম্মদ কি প্রকৃতই ছিলেন ছিল নাকি তিনি শুধুই পরবর্তীকালের কল্পনা? স্বীকার করতেই হবে আমরা নির্দিষ্টভাবে কিছুই জানি না। তবে যে ব্যাপারে নিস্চিত হওয়া যাচ্ছে তা হল ইসলামী বিবরণের অনির্ভরযোগ্যতা। নবী মুহম্মদের যদি অস্তিত্ব থেকেও থাকে তার ব্যাপারে আমরা প্রচলিত বিবরণ থেকে যা কিছু জানতে পারছি সবই প্রায় অতিকথন।

মধ্যযুগ হল জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বন্ধা যুগ। এইসময় ধর্ম প্রায় পুরো দুনিয়ার দখল নিয়ে নেয়। সব ধর্মই আসলে ঠারে ঠারে বলতে চায়- ‘ব্রহ্ম সত্যং জগন্মিথ্যা’ (‘ব্রহ্মই সত্য, জগৎ মিথ্যা)- তাদের কল্পিত ঈশ্বর, তাদের চাপিয়ে দেওয়া নৈতিকতা, তাদের নির্দেশিত অনুষ্ঠানাদির বাইরে আর সব মিথ্যা। এ ব্যপারে অষ্টম শতকের শঙ্করাচার্য আদপেই একা নন। ধর্মের ব্যাপক প্রভাবের কারণে মধ্যযুগে যে কোন রাজনৈতিক চিন্তাকে ধর্মীয় ভেক নিয়ে আসতে হত। ধর্মের মূলো ছাড়া গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা ছিল অসম্ভব। ইসলামের উদ্ভব ও বিস্তারের রাজনৈতিক প্রনোদনা নিয়ে সিরিয়াস গবেষনা খুব কমই হয়েছে। যা দু একটা হয়েছে তার ঐতিহাসিক ভিত্তি খুবই দুর্বল। ফলে আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মত অবস্থায় নেই। তবে কিছু যৌক্তিক আন্দাজ অবশ্যই করা সম্ভব।

আধুনিক যুগের আগে প্রতিটি রাষ্ট্রের স্থাপনা হত নির্দিষ্ট ধর্মতত্বের ভীত্তিতে। রোমান সাম্রাজ্য যেমন যেমন প্রসারিত হয়েছিল, রোমান দেবদেবীদের আরাধনা তেমন তেমনই ছড়িয়ে পড়েছিল। আবার মধ্যযুগের ইউরোপে মূল ক্ষমতাকেন্দ্র ছিল ক্যাথলিক চার্চ। শত অনৈক্যের মধ্যেও পোপতন্ত্র ইউরোপে ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রেখেছিল। পোপ যে কাউকে এমনকি যে কোন সম্রাটকে ধর্মত্যাগী বলে ঘোষনা করতে পারতেন। পোপের এই ঘোষনার পর সেই রাজার পতন অনিবার্য ছিল। ক্যাথলিক চার্চের এই বিপুল ক্ষমতার পিছনে থাকত ইউরোপের মানুষের খৃষ্ট ও বাইবেল বিশ্বাস, চার্চের সিদ্ধান্তকে ঈশ্বরের সিদ্ধান্ত হিসাবে মান্যতাদান।

আরবরা যখন সপ্তম শতকে রোমানদের তাড়িয়ে প্রথমে মধ্যপ্রাচ্য ও তার কিছুদিন পরে উত্তর আফ্রিকা জয় করল তাদের সামরিক শক্তি যথেষ্ট থাকলেও কোন রাজনৈতিক ধর্মদর্শন (political Theology) ছিল না। রাজনৈতিক ধর্মতত্ব মধ্যযুগে সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার আবশ্যিক উপাদান হিসাবে পরিগণিত হত। খিলাফৎ প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই অভ্যান্তরীন অন্তর্দন্দ্ব ছিল নিত্যসঙ্গী। ইসলামী বিবরণেই দেখা যায় আদব আল-মালিকের আমলে হেজ্জাজের আধিপত্য চলে যায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে। তার সাথে ছিল বর্হিশত্রুর আক্রমনের আশঙ্কা। কারণ বাইজানটাইন সাম্রাজ্য দুর্বল হলেও গেলেও তা ধংস হয়ে যায় নি। খিলাফতের প্রজাদের মধ্যে বেশীরভাগই ছিল ক্যাথলিক খৃষ্টান, তাদের স্বাভাবিক আনুগত্য ছিল বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের প্রতি। কারণটা খুব সোজা- বাইজানটাইন সম্রাট হলেন খৃষ্টীয় ঈশ্বরের প্রতিনিধি; তার অনুগত হওয়া প্রত্যেক সৎ খৃষ্টানের কর্তব্য। সাম্রাজ্যের পূর্ব অংশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল পারস্যের অগ্নি উপাসকদের। তাদেরও ছিল নিজস্ব রাজনৈতিক ধর্মদর্শন: জরাথুষ্ট্রবাদ। সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে গেলে খলিফাদেরও অনুরূপ একটি ধর্মের মূলো প্রয়োজন ছিল। শুধু অনুরূপ ধর্ম হলেই চলত না এই নতুন ধর্মকে ক্যাথলিক খৃষ্টধর্ম ও জরাথুষ্ট্রবাদের থেকে অধিক আগ্রাসী, অধিক আত্বসচেতন, অধিক একেশ্বরবাদী হতে হত।

ঐতিহাসিক উৎসে মুহম্মদের উল্লেখ অনির্দিষ্ট এমনকি পরস্পরবিরোধীও। এর থেকে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা কঠিন। ঘটনা যাই হোক না কেন মনে হয় সপ্তম শতাব্দীর শেষ দিক থেকে উমাইয়ারা এই যুদ্ধবাজ নবীকে সামনে আনতে শুরু করে। কারণ সাম্রাজ্য রক্ষায় ধর্মের গুরুত্ব ততদিনে তাদের সামনে পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল। এই নতুন ধর্মের কেন্দ্রীয় চরিত্রকে যুদ্ধবাজ হতেই হত কারণ তা ছাড়া খলিফাদের সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্রনীতির কোন বৈধতা দেওয়া যেত না। খিলাফতের মূল শক্তি ছিল আরব উপজাতিরা-যারা সম্ভবত কোনরকম শিথিল খৃষ্টধর্মের সাথে যুক্ত ছিল, দ্বাদশ পর্বে এই খৃষ্টধর্মের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। অতএব নবীর আরব উপজাতি পরিচয় ছিল আবশ্যিক, তাকে অবশ্যই মরুভূমির বহু ভিতরের কোন এক অঞ্চলের বাসিন্দা হতে হত। কিংবদন্তী ইতিমধ্যেই তৈরী হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু পূর্নাঙ্গ ধর্ম হিসাবে গৃহীত হতে গেলে দরকার ছিল বাইবেলের মত একটি ধর্মগ্রন্থ। এইজন্যই কোরানে বারবার সম্পাদনার চিহ্ন পাওয়া যায়। পুরাতন খৃষ্টীয় স্তোত্তকে নবীন কিংবদন্তীর সাথে মিলিয়ে নিতে যে যথেষ্ট কসরত করতে হয়েছিল তাতে কোন সন্দেহই নেই।

বহু ঐতিহাসিক মক্কা ও মদিনা থেকে ইসলামের উদ্ভবের কাহিনীতে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বিস্তারিত দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। প্যাট্রিশিয়া ক্রোন সম্ভাব্য উৎপত্তিস্থল হিসাবে প্যালেষ্টাইনের নাম করেছেন। প্যালেষ্টাইনকে ইসলামিক ধর্মতত্বে যে মারাত্বক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তার দিকে তাকালে এই মতামত বিশেষ অবাস্তব বলেও মনে হয় না।

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-১৩


রিভিশনিষ্ট দৃষ্টিকোণে কোরানের বিভাজন:

আগের পর্বে কোরানের মাক্কী সুরাগুলি যে আসলে খৃষ্টীয় শ্লোকগুচ্ছ ছিল তা নির্দিষ্টভাবে প্রমান করা হয়েছে। গবেষক গান্টার লুলিং অধিকাংশ মক্কী সুরাকে খৃষ্টীয় শ্লোকে পুনর্গঠিত করে দেখিয়েছেন। মক্কী ও মাদানি (অন্য কোন পরিভাষা না থাকায় ইসলামী পরিভাষাই ব্যবহার করতে বাধ্য হলাম) সুরার মধ্যে ভাষাগত ও বক্তব্যগত উভয়দিক থেকেই বিপুল তফাৎ রয়েছে। কোরানের ভাষাগত অসংলগ্নতার যে অভিযোগ তা মূলত মক্কী সুরাগুলিকে ঘিরেই। মক্কী সুরাগুলোর বিষয়বস্তু হয় নীতিকথা না হয় পুরাকালের নবীদের গাল-গল্প। অপরদিকে মাদানি সুরাগুলোর বক্তব্য পরিস্কার, কিন্তু বিশেষ কোন ছন্দগত বৈশিষ্ট নেই। ব্লগার নরসুন্দর মানুষ তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে মদিনায় অবতীর্ণ সুরাগুলিকে ‘জিহাদ আর গনিমতের মালে মাখামাখি’- বলে বর্ণনা করেছেন।


প্রকৃতই মক্কী সুরার সাথে মাদানি সুরার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য হল দৃষ্টিভঙ্গীর। নিচে কতগুলি মক্কায় অবতীর্ণ (ইসলামী বিবরণ অনুসারে)আয়াত দেওয়া হল-

১. “আমি তো একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র” [সূরা - আনকাবুত ২৯:৫০] ( মক্কায় অবতীর্ণ)
২. “তোমার ধর্ম তোমার কাছে, আমার ধর্ম আমার কাছে” [সূরা কাফিরুন -১০৯: ০৬] ( মক্কায় অবতীর্ণ)
৩. “কাফেররা বলেঃ তাঁর প্রতি তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন অবতীর্ণ হল না কেন? আপনার কাজ তো ভয় প্রদর্শন করাই এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যে পথপ্রদর্শক হয়েছে”[সূরা রাদ -১৩: ৭] ( মক্কায় অবতীর্ণ)
৪. “আর তোমার পরওয়ারদেগার যদি চাইতেন, তবে পৃথিবীর বুকে যারা রয়েছে, তাদের সবাই ঈমান নিয়ে আসতে সমবেতভাবে। তুমি কি মানুষের উপর জবরদস্তী করবে ঈমান আনার জন্য?” [ সুরা ইউনুস ১০:৯৯ ] ( মক্কায় অবতীর্ণ)
৫.“অতএব, আপনি উপদেশ দিন, আপনি তো কেবল একজন উপদেশদাতা, আপনি তাদের শাসক নন” [সুরা গাশিয়াহ, ৮৮:২১-২২](মক্কায় অবতীর্ণ)

এবার কতগুলি মাদানি সুরা দেখুন-


১. যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে| এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি|[সুরা মায়েদা, ৫:৩৩] (মদিনায় অবতীর্ণ)
২. তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবে র ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে। [সুরা তাওবা, ৯:২৯] (মদিনায় অবতীর্ণ)
৩. অভিশপ্ত অবস্থায় তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে, ধরা হবে এবং প্রাণে বধ করা হবে। [ সুরা আহযাব ৩৩:৬১ ] (মদিনায় অবতীর্ণ)
৪. আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব। কাজেই গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাট জোড়ায় জোড়ায়।[ সুরা আনফাল ৮:১২ ] (মদিনায় অবতীর্ণ)
৫. সুতরাং যদি কখনো তুমি তাদেরকে যুদ্ধে পেয়ে যাও, তবে তাদের এমন শাস্তি দাও, যেন তাদের উত্তরসূরিরা তাই দেখে পালিয়ে যায়; তাদেরও যেন শিক্ষা হয়। [ সুরা আনফাল ৮:৫৭ ] (মদিনায় অবতীর্ণ)
৬. যুদ্ধ কর ওদের সাথে, আল্লাহ তোমাদের হস্তে তাদের শাস্তি দেবেন। তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন এবং মুসলমানদের অন্তরসমূহ শান্ত করবেন। [ সুরা তাওবা ৯:১৪ ] (মদিনায় অবতীর্ণ)

অ্যাপ্রোচের পার্থক্য অতি পরিস্কার। আলী দস্তিকে অনুসরণ করে হালফিলের প্রায় সব নাস্তিক ব্লগাররা যে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন তা হল- যে মক্কায় মুহম্মদ ছিলেন একজন সামান্য ধর্মপ্রচারক, তার অনুগামীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। সংখ্যালঘু হওয়ার ফলে তার কারুর বিরুদ্ধে জিহাদ করার বা প্রতিশোধ নেওয়ার সাধ্যই ছিল না। তাই তখন তার মুখ দিয়ে বেড়িয়েছে শান্তির বাণী। অপরপক্ষে মদিনায় যখনই তার যুদ্ধ করার মত সামর্থ্য হয়েছে এই শান্তির ধর্মপ্রচারক পরিণত হয়েছেন যুদ্ধবাজ নেতায়। সুতরাং মুহম্মদের এই পরিবর্তিত মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে তার রচিত মাদানি সুরায়। স্বাভাবিকভাবেই আমরা এইরকম বিশ্লেষনের সাথে একমত হতে পারছি না। এর আগের কয়েকটি পর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি কোরান আর যাই হোক না কেন মুহম্মদ নামক কোন ব্যক্তির রচিত নয়। শুধু মুহম্মদ কেন কোরান কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে রচিত হয়নি। পূর্নাঙ্গ ধর্মগ্রণ্থ উদ্ধূত হওয়ার আগে হিসাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোরান সংকলন ও সম্পাদনা চলতে থেকেছে।


ইসলামিক বিবরণের যে বেশীরভাগটাই অতিকথন তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। যেখানে খোদ মুহম্মদের ঐতিহাসিক অস্তিত্তই সন্দেহজনক সেখানে মক্কী ও মাদানি সুরার পার্থক্য যে পুরোপুরি যদৃচ্ছ হতে বাধ্য তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ মক্কী ও মাদানি সুরায় কোরানের বিভাজনের সাথে কথিত মুহম্মদের জীবন জড়িত। সরল যুক্তি অনুসারে মক্কী ও মাদানি সুরার মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্যই থাকা উচিত নয়। কারণ এই পরিভাষা দুটির সাথে জড়িয়ে থাকা প্রায় সমস্ত কাহিনীই শুধুমাত্র পৌরাণিক গল্প। অথচ আমরা একটু আগেই দেখলাম এই দুই ধরণের সুরা দুটি প্রায় বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিনিধিত্ব করে। অর্থ্যাৎ প্রচলিত ইসলামিক অর্থে না হলেও মক্কী ও মাদানি হিসাবে কথিত দুই ধরণের সুরার মধ্যে প্রকৃতই পার্থক্য রয়েছে।

আসলে মক্কী সুরাগুলি মধ্যপ্রাচ্যের এক ক্ষুদ্র খৃষ্টীয় ধর্মীয় আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে যেটা রোমান ক্যাথলিসিজম থেকে ক্রমাগত নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছিল। কয়েকশত বছরের ব্যবধানে যেটা নতুন ধর্ম হিসাবে উদ্ধুত হবে। আর মাদানি সুরাগুলি প্রতিনিধিত্ব করে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যের। উপরে উল্লিখিত আয়াতগুলিতে আমরা কি একজন যুদ্ধবাজ সম্রাটকে দেখতে পাই না? যিনি তার অধীনস্থ সেনাদলকে শত্রুপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে নির্দেশ দিচ্ছেন। এইভাবে সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে তৈরী হয় একটা গোটা ধর্ম। আমরা ইসলামের যে আগ্রাসী রূপের সাথে পরিচিত তার মূল উৎস হয়ত কল্পিত মুহম্মদের জীবনের মধ্যে নয় বরং তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে।


খৃষ্টীয় স্তোত্তকে বারবার সম্পাদনার মাধ্যমে ইসলামিক বিন্যানের সাথে মিলিয়ে নিতে হয়েছে। বারবার সম্পাদনা করতে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ভাষাগত অসংলগ্নতা। এইকারণেই মক্কী সুরাগুলির অর্থ অতি দুর্বোধ্য, এমনকি আমরা আগে দেখেছি তাফসিরকারকরা পর্যন্ত্য অনন্যোপায় হয়ে অযৌক্তিক সমঝোতা করতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে মাদানি সুরাগুলি খৃষ্টীয় শ্লোক ছিল না, তাই সম্পাদনারও প্রয়োজন পরে নি। সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক প্রয়োজনে পরবর্তীকালে ঢোকানো হয়েছে। তাই এই সুরাগুলির ভাষা ও বক্তব্য উভয়েই যথেষ্ট সুসঙ্গত। রিভিশনিষ্ট পর্যবেক্ষণ এইভাবে আমাদের একটি সামগ্রিক চিত্রের সামনে হাজির করে যা ইতিপূর্বের বিশ্লষনে ছিল অনুপস্থিত।







বি.দ্র: আপনি যদি অতি অনুসন্ধিৎসু পাঠক হয়ে থাকেন; আমার এই ব্লগ পড়ার পর উৎসাহীত হয়ে নিজেই মক্কী ও মাদানি সুরার পার্থক্য মিলিয়ে দেখতে যান- তাহলে দু জায়গায় বড়সড় ধাক্কা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। দুটি ক্ষেত্রে মাদানি সুরায় উপরোল্লিখিত মক্কী আয়াতের মতো সহনশীলতা চোখে পড়বে। একটা হল অতিপরিচিত সুরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াত - দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই (২:২৫৬) আর একটা হল সুরা মায়েদার ৩২ নং আয়াত- “যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে” (৫:৩২)। যেহেতু ইসলামিক বিবরণে বিশেষ আস্থা রাখি না, তাই বেশী গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না। সুরা মায়েদার একেবারে পরের আয়াতেই একেবারে উল্টো বক্তব্য আছে। আর বাকারার এই সহনশীল আয়াতটির সামনে পেছনে উগ্র বক্তব্যযুক্ত বিস্তর আয়াত পাওয়া যাবে। এই আয়াতদুটি অনায়াসে প্রক্ষিপ্ত অংশ হতে পারে।

বুধবার, ১২ এপ্রিল, ২০১৭

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহ্ম্মদ, পর্ব-১২

আদি ইসলাম ও ক্রিশ্চিয়ানিটির আন্তসম্পর্ক

পাঠকদের প্রথমেই বলে রাখতে চাই বাংলা অনুবাদ নিয়ে কোরানের ভাষাগত অসঙ্গতি বুঝতে চাইলে ঠকে যাবেন। কারণ সৌদি আরবে গৃহীত মান অনুসরণ করে সাম্প্রতিক কালে যেসব অনুবাদ বেড়িয়েছে সেগুলীতে অসঙ্গতি যহাসাধ্য পরিহার করে একটি সুষ্ঠ, সামঞ্জস্যপূর্ণ, মার্জিত কোরান তৈরী করার চেষ্টা হয়েছে। অন্ততপক্ষে কোরানের মূলানুগ ইংরাজী অনুবাদ ছাড়া গবেষনামূলক লেখার সম্পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা সম্ভব হবে না। কোরানের ৭৪ নং সুরার ইংরাজী অনুবাদ এখানে দেওয়ার লোভ অতিকষ্টে সংবরণ করলাম। যারা অষ্টম পর্ব পড়েন নি তাদের আগে অষ্টম পর্বটি পড়ে এই পর্বটি শুরু করতে অনুরোধ করছি।


সুরা আল- মুদ্দাসসির

১. ওহে বস্ত্র আবৃত

২. ওঠ, সতর্ক কর।

৩. আর তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।

৪. তোমার পোশাক পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ।

৫. অপবিত্রতা থেকে দূরে থাক।

৬. অনুগ্রহ করো না অধিক পাওয়ার উদ্দেশে।

৭. আর তোমার রবের জন্যই ধৈর্যধারণ কর

৮. যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে,

৯. সেদিনটি হবে বড়ই কঠিন দিন,

১০. কাফিরদের জন্য মোটেই সহজ নয়।

১১. আমাকে ছেড়ে দাও এবং তাকে, যাকে আমি সৃষ্টি করেছি অসাধারণ করে।

১২. আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন সম্পদ।

১৩. আর উপস্থিত অনেক পুত্র

১৪. আর তার জন্য সুগম স্বাচ্ছন্দ্যময় করেছি।

১৫. এসবের পরেও সে আকাংখা করে যে, আমি আরো বাড়িয়ে দেই।

১৬. কখনো নয়, নিশ্চয় সে ছিল আমার নিদর্শনাবলীর বিরুদ্ধাচারী।

১৭. শীঘ্রই আমি তাকে উঠাব শাস্তির পাহাড়ে

১৮. সে চিন্তা ভাবনা করল এবং সিদ্ধান্ত নিল

১৯. সে ধ্বংস হোক! কীভাবে সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল?

২০. আবারো ধ্বংস হোক সে, সে সিদ্ধান্ত নিল কীভাবে!

২১. তারপর ভ্রু কুঁচকালো আর মুখ বাঁকালো।

২২. তারপর সে পিছনে ফিরল আর অহংকার করল।

২৩. এবং ঘোষণা করল, এতো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছু নয়।

২৪. এটা তো মানুষের কথামাত্র’।

২৫. আমি তাকে নিক্ষেপ করব সাকার-এ

২৬. তুমি কি জান সাকার কি?

২৭. এটা অবশিষ্টও রাখবে না এবং ছেড়েও দেবে না।

২৯. চামড়াকে দগ্ধ করে কালো করে দেবে।

৩০. তার উপর রয়েছে ঊনিশ

৩১. আর আমি ফেরেশতাদেরকেই জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক বানিয়েছি। আর কাফিরদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ আমি তাদের সংখ্যা নির্ধারণ করেছি। যাতে কিতাবপ্রাপ্তরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে; আর মুমিনদের ঈমান বেড়ে যায় এবং কিতাবপ্রাপ্তরা ও মুমিনরা সন্দেহ পোষণ না করে। আর যেন যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা এবং অবশিষ্টরা বলে, এরূপ উপমা দ্বারা আল্লাহ কী ইচ্ছা করেছেন? এভাবেই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন আর যাকে ইচ্ছা সঠিক পথে পরিচালিত করেন। আর তোমার রবের বাহিনী সম্পর্কে তিনি ছাড়া কেউ জানেন না। আর এ হচ্ছে মানুষের জন্য উপদেশমাত্র” (আয়াত ১-৩১)



অষ্টম পর্বে সুরা আলাকের পুনর্গঠন দেখানো হয়েছে। ইসলামী সূত্র আমাদের জানায় সুরা আল-মু্দ্দাসসির সর্বপ্রথমে নাজিলকৃত সুরা আলাকের পরেই নাজিল হয়েছিল। অর্থ্যাৎ নাজিলের সময়কালের দিক থেকে সুরা আল-মু্দ্দাসসিরের স্থান হল দু নম্বর। কোরানের বহু মক্কী সুরার মতোই তাফসিরের সাহায্য ছাড়া এই সুরাটির অর্থ বোঝা দুঃসাধ্য। বক্তব্যের বিষযবস্তুর দিক থেকে প্রথম দশটি আয়াতের সাথে পরবর্তী আয়াতগুলীর দূর-দূরান্তরেও কোন সম্পর্ক নেই। ১১ নং আয়াত- “যারনী ওয়া মান খলাক’তু ওয়া হ’ীদাঁ” ইউসুফ আলী যার অনুবাদ করেছেন- Leave me With him whom I created alone, আগের (এবং পরেরও) আয়াতগুলির পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে অর্থহীন প্রলাপ বলেই মনে হয়। সর্বশক্তিমান আল্লা আবার কার সাথে নিজেকে ছেড়ে ছেওয়ার দাবী করছেন। পরের আয়াতগুলির সাথেও বিশেষ কোন সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না।

১২. আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন সম্পদ।
১৩. আর উপস্থিত অনেক পুত্র
১৪. আর তার জন্য সুগম স্বাচ্ছন্দ্যময় করেছি।
১৫. এসবের পরেও সে আকাংখা করে যে, আমি আরো বাড়িয়ে দেই।
১৬. কখনো নয়, নিশ্চয় সে ছিল আমার নিদর্শনাবলীর বিরুদ্ধাচারী।
১৭. শীঘ্রই আমি তাকে উঠাব শাস্তির পাহাড়ে



ইসলামী সূত্র অবশ্য যথারীতি গল্প নিয়ে হাজির হয়। চতুর্দশ শতকের তাফসিরকারক ইবনে কাসীর আমাদের জানাচ্ছেন যে এই সমস্ত আয়াতে কুরাইশ নেতা ও মুহম্মদের বিরোধী ওয়ালিদ ইবনে মুগীরার কথা বলা হয়েছে। মুগীরা অপরাপর কুরাইশদের মতো কোরানকে আল্লার বাণী হিসাবে অস্বীকার করায় আল্লা এইসমস্ত আয়াত নাজিল করেন। তামাম বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লা কিনা এক ব্যক্তির প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে কুড়িটি আয়াত ধরে তাকে অভিশাপ দিচ্ছেন! আপনার পাড়ার খিটখিটে বৃদ্ধা আর আল্লার কোন তফাৎ নজরে পরে কি? গল্পই বটে, তবে সিরিয়াস গল্প নয়; নেহাতই বিনোদনমূলক গল্প।



তাহলে আসল কাহিনী কি- আগেরবারের মতোই আমরা এবারেও গবেষক গান্টার লুলিঙের শরণাপন্ন হব। বস্তুত গান্টার লুলিঙের গবেষনা না থাকলে কোরানের রিভিশনিষ্ট ব্যাখ্যা সম্ভবই হত না (আমার ভবিষ্যতে লুলিঙের A Challenge to Islam for Reformation বইটি থেকে সরাসরি অনুবাদ করে দেওয়ার ইচ্ছা আছে)। রাসম অর্থ্যাৎ মূল নথী পর্যালোচনা করে ১১ নং আয়াতে জারনী- ‘একা ছেড়ে দাও’ এর জায়গায় লুলিং জারানী ‘তিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন অর্থ ধরেছেন। তার পুনর্গঠনে ১১-১৭ নং আয়াত দাঁড়িয়েছে-

১১. তিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন অসামান্য জীবরুপে
১২. তিনি তাকে সৃষ্টি করলেন তার অনুগত দাসরুপে
১৩. তিনি তাকে দেখা দিয়ে অস্তিত্ব প্রমান করলেন
১৪. এবং তাকে পথপ্রদর্শন করলেন
১৫. তারপর তিনি চাইলেন সে বড় হোক
১৬. তা নয় সে তার নির্দেষ অমান্য করল
১৭. সেইজন্য শেষে তিনি তাকে সুউচ্চ মৃত্যুর পথে ফেলে দিলেন।



লুলিং লক্ষ্য করেছেন যে সুরার ১ থেকে ৩০ নং আয়াত পর্যন্ত্য ভাষাগত দিক থেকে সুরাটি মোটামুটি সমসত্ব। ৩০ নং আয়াত পর্যন্ত্য ছন্দোবদ্ধ বিন্যাস রয়েছে এবং প্রতিটি আয়াত গড়ে তিন চারটি করে শব্দ নিয়ে গঠিত। ৩১ নং আয়াত বিশাল বড় এবং বাকি আয়াতগুলির মতো ছন্দের বুননে বাঁধা নয়। সুতরাং, বোঝা যায় আয়াত ৩১ সুরার অংশ ছিল না। আয়াতটিকে দেখে ৩০ নং আয়াতের টিকা বলে মনে হয়। ৩১ নং আয়াত যে তুলনামূলকভাবে পরবর্তীকালে সন্নিবেশিত হয়েছে, এমনকি ইসলামী সূত্র থেকেও সে বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইসলামী সূত্র মতে সুরা আল মুদ্দাসসিরের ৩০ নং আয়াত পর্যন্ত্য নাজিল হওয়ার পর আবু জাহেল ও তার সঙ্গী কুরাইশরা জাহান্নামের প্রহরীদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করেন।কুরাইশদের মধ্যে থেকে কালাদাহ নামের এক ব্যক্তি বলেন যে জাহান্নামের ১৯ জন প্রহরীর মধ্যে ১৭ জনকে তিনি একাই দেখে নেবেন। তার উত্তরে আয়াত ৩১ নাজিল হয়। বস্তুত, এই আয়াতটিকে ঢোকানো হয়েছে মূলত ৩০ নং আয়াতকে ব্যাখ্যা করতে। ৩০নং আয়াতে উনিশ সংখ্যা দিয়ে কি বোঝানো হচ্ছে একেবারেই পরিস্কার নয়। মধ্যযুগের মধ্যপ্রাচ্যে খৃষ্টধর্ম বিভিন্ন ধরনের যাদুবিদ্যা, উইচক্রাফট ইত্যাদীর সাথে সংযুক্ত হয়ে পরেছিল। কোন কোন ঐতিহাসিক একে যাদুবিদ্যায় ব্যাবহৃত কোন মিরাকেল সংখ্যা হিসাবে গণ্য করেছেন। এই বিষয়ে আরো গবেষনার প্রয়োজন আছে। তার পরের আয়াত ৩২ থেকে অবশিষ্ট সুরার বিষয়বস্তু ও গঠন উভয়েই আলাদা। এমনকি অনুবাদেও বিষয়টা বোঝা যায়-

৩২. কখনো নয়, চাঁদের কসম!

৩৩. রাতের কসম, যখন তা সরে চলে যায়,

৩৪. প্রভাতের কসম, যখন তা উদ্ভাসিত হয়।

৩৫. নিশ্চয় জাহান্নাম মহাবিপদসমূহের অন্যতম।

৩৬. মানুষের জন্য সতর্ককারীস্বরূপ।

৩৭. তোমাদের মধ্যে যে চায় অগ্রসর হতে অথবা পিছিয়ে থাকতে, তার জন্য।

৩৮. প্রতিটি প্রাণ নিজ অর্জনের কারণে দায়বদ্ধ।

৩৯. কিন্তু ডান দিকের লোকেরা নয়,

৪০. বাগ-বাগিচার মধ্যে তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করবে,

৪১. অপরাধীদের সম্পর্কে,

৪২. কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করাল?

৪৩. তারা বলবে, ‘আমরা মুসুল্লীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না’।

৪৪. ‘আর আমরা মিসকিনদের খাদ্য দান করতাম না’।

৪৫. ‘আর আমরা অনর্থক আলাপকারীদের সাথে মগ্ন থাকতাম’।

৪৬. ‘আর আমরা প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করতাম’

৪৭. আমাদের নিকট মৃত্যুর আগমন পর্যন্ত।

৪৮. অতএব সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না।

৪৯. তাদের কি হয়েছে যে, তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় উপদেশ হতে?

৫০. তারা যেন ভয়ে সন্ত্রস্ত গাধা,

৫১. সিংহের সামনে থেকে পালাচ্ছে।

৫২. বরং তাদের মধ্যকার প্রত্যেক ব্যক্তিই কামনা করে যে তাকে উন্মুক্ত গ্রন্থ প্রদান করা হোক।

৫৩. কখনও নয়! বরং তারা আখিরাতকে ভয় করে না।

৫৪. কখনও নয়! এটিতো উপদেশ মাত্র।

৫৫. অতএব যার ইচ্ছা সে তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করুক।

৫৬. আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কেউ উপদেশ গ্রহণ করতে পারে না। তিনিই ভয়ের যোগ্য এবং ক্ষমার অধিকারী।(সুরা আল- মুদ্দাসসির, ৩২-৫৬)



কিছুটা একই রকম বক্তব্যসম্বলিত দুটি পৃথক স্তোত্তকে ৩১ নং আয়াত দিয়ে জোড়াতালি লাগিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আগেই আমরা দেখেছি যে সিরিয়াক উৎসে কুর’রান অর্থে Liturgical Text বা খৃষ্টীয় স্তোত্তসংকলন ছাড়া আর কিছুই বোঝাত না। লুলিং দেখিয়েছেন কোরানের অধিকাংশ মক্কী সুরা আসলে কয়েকটি স্ট্রোফিক স্তোত্তের সমষ্টি। স্ট্রোফিক বিন্যাস হল মূলত ধর্মসঙ্গীতে ব্যাবহৃত ছন্দ ও সুরের এক ধরনের বিন্যাস। মধ্যযুগে সংকলিত অধিকাংশ খৃষ্টীয় সঙ্গীত মূলত এক ধরনের স্ট্রোফিক বিন্যাসে রচিত হত। মধ্যযুগের মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত খৃষ্টীয় গীতির সাথে তুলনা করে গবেষক গান্টার লুলিং প্রমান করেছেন যে সামান্য যৌক্তিক অদল বদলের সাহায্যে অধিকাংশ মক্কী সুরাকে খৃষ্টীয় ধর্মগানে বদলে ফেলা যায়। শুধু তাই নয় অসাধারণ বিশ্লেষনের সাহায্যে A Challenge to Islam for Reformation বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন যে কোরানে ব্যাবহৃত স্ট্রোফিক ছন্দের সঙ্গে খৃষ্টীয় শ্লোকে ব্যাবহৃত স্ট্রোফিক ছন্দবিন্যাসের ব্যাপক মিল বর্তমান যা কাকতালীয় হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। অবশ্য পুনঃগঠন ছাড়া স্ট্রোফিক বিন্যাস খুঁজে পাওয়া মুশকিল। উদাহরণস্বরূপ কোরানের ৮৯ তম সুরা আল ফজরের ৭ ও ১৪ নং আয়াতে রাব্বু ‘তোমার রব’ শব্দটি আছে। লুলিং দেখিয়েছেন আয়াতদ্বয় থেকে শব্দদুটি বাদ দিলে স্ট্রোফিক ছন্দ পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব হয়।



খৃষ্টীয় ধর্মগীতিকে ইসলামিক আবরণ দিতে গিয়ে ব্যাপক সম্পাদনার প্রয়োজন হয়েছে। তার উপর আছে অর্থবিকৃতি। যেহেতু কোরানের মূল নথীতে প্রাচীন যেকোন আরবী লিপির মতোই অক্ষরবাচক চিহ্নগুলি ছিল না, (সম্ভবত ইচ্ছাকৃত) অনায়াসে অর্থবিকৃতি ঘটানো সম্ভব হয়েছে। তারপর এই বনিয়াদের উপর গড়ে উঠেছে তাফসির, সিরাত, হাদিস। যেহেতু শত শত বছর ধরে কোরান সংকলিত হয়েছে মানুষ ভূলেই গিয়েছিল এইসব ধর্মীয় স্তোত্তের আদত অর্থ কি। খোদ ইসলামী বিবরণেই অনেকবার কোরান সংকলনের কথা পাওয়া যায়। লুলিং তার বইতে কোরানের অনেকগুলি সুরাকে খৃষ্টীয় শ্লোকে পুনর্গঠিত করে দেখিয়েছেন যে এই পদ্ধতিতে কোরানের ভাষাগত অসংলগ্নতা সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব হয়। এর আগে নবম পর্বে আমি দেখিয়েছি যে সুরা বাকারা ও সম্ভবত সুরা নিশা বহু পরে কোরানে ঢুকেছে। বস্তুত সুরা বাকারা, সুরা নিশা, সুরা তওবা ইত্যাদী মাদানী সুরাগুলি বহু পরে সরাসরি কোরানে ঢুকেছে। এগুলী খৃষ্টীয় শ্লোক ছিল না, তাই সম্পাদনারও প্রয়োজন পরে নাই। জিহাদ আর গণিমতের মালে মাখামাখি এইসব সুরায় ভাষাগত অসংলগ্নতা অনেক কম, বক্তব্য পরিস্কার ও স্পষ্ট, সাথে সাথে বিশেষ কোন ছন্দগত বৈশিষ্ট নেই। সেইকারণে মক্কী ও মাদানী সুরার যে বিভাজন রয়েছে রিভিশনিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে তার পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। পরের পর্বে হবে সে আলোচনা। আজ বরং খৃষ্টীয় উৎস থেকে ইসলামের উদ্ভব আরো একটু খতিয়ে দেখা যাক।



৩১৩ সালে রোমান সম্রাট প্রথম কনষ্টানটাইন খৃষ্টধর্মকে বৈধতা প্রদান করেন। সম্রাট দূরদর্শী ছিলেন সন্দেহ নাই। তার এই সিদ্ধান্ত যে শুধু সাম্রাজ্যের অন্তর্দন্দ্ব রোধ করে তাই নয়, আরো এক হাজার বছর সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে। রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টের সাথে সাথে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যাথলিক পোপতন্ত্র। ক্যাথলিক চার্চের সাথে খৃষ্টধর্মের অনান্য শাখার বিরোধ গোড়া থেকেই ছিল। অনান্য শাখাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল গ্রীক অর্থোডক্স চার্চ এবং আলেকজান্দ্রিয়ার কপটিক চার্চ। আমরা এখানে যে ধরনের খৃষ্টধর্ম নিয়ে আলোচনা করছি তা হল চতুর্থ আরেক ধরনের খৃষ্টধর্ম। খৃষ্টধর্মের এই শাখায় যীশুর ঐশ্বরিকতা স্বীকার করা হত না। এই খৃষ্টধর্মের পুরোধাদের মধ্যে যাদের নাম জানা যায় তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সম্রাট কনষ্টানষ্টাইনের সমসাময়িক আলেকজান্দ্রিয়ার যাযক এরিয়াস। খৃষ্টধর্মে যীশুর মর্যাদা নিশ্চিত করতে সম্রাট ৩২৫ খৃষ্টাব্দে নিসাইয়াতে প্রথম খৃষ্টীয় ধর্মসম্মেলন আহ্বান করেন। এরিয়াসের তত্ব অর্থ্যাৎ যীশু ঈশ্বরের অংশ নন- নিসাইয়াতে পর্যুদস্ত হয় এবং এরিয়াসকে ধর্ম থেকে বহিস্কার করা হয়। তা সত্বেও বহুদিন ধরে তার প্রভাব বজায় ছিল। এমনকি একসময়ে তার অনুগামীরা নিসাইয়ার সিদ্ধান্তকে বাতিল করার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন।



তা সত্বেও সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে এরিয়াসের অনুসারীরা অতি দ্রত কোনঠাসা হতে থাকেন। তারা আলেকজান্দ্রিয়া ত্যাগ করে মধ্যপ্রাচ্য চলে যান। পরে মধ্যপ্রাচ্যেও ক্যাথলিক খৃষ্টধর্ম প্রভাব বিস্তার করতে থাকলে তারা আরও ভিতরে আরবের মরু অঞ্চলে সরে যান। কোরানে একেশ্বরবাদী হানিফদের উল্লেখ আছে; নবী ইব্রাহিমকে হানিফ বলা হয়েছে-
 
“ইব্রাহীম ইহুদী ছিলেন না এবং নাসারাও ছিলেন না, কিক্তু তিনি ছিলেন `হানীফ' অর্থাৎ, সব মিথ্যা ধর্মের প্রতি বিমুখ এবং আত্নসমর্পণকারী, এবং তিনি মুশরিক ছিলেন না” [ সুরা আলে ইমরান, ৬৭ ]। 
অর্থ্যাৎ বোঝা গেল হানিফরা ইহুদী নয় ক্যাথলিক খৃষ্টানও নয়, আবার মুশরিক বা মূর্তিপূজকও নয়। তাহলে আমি যদি বলি হানিফরা আসলে ছিল খৃষ্টান, কিন্তু তারা পবিত্র ট্রিনিটির ধারণাকে অস্বীকার করত; তাহলে খুব একটা ভূল হবে কি? প্রকৃতপক্ষে এই গোষ্ঠী ধীরে ধীরে কয়েক শতাব্দী ধরে খৃষ্টধর্ম থেকে সরে যাচ্ছিল আর গঠন করছিল নতুন ধর্মের অঙ্কুর। এই বিচ্ছিন্নতার উপাদান অবশ্য সংশ্লিষ্ট অঞ্চলেই বর্তমান ছিল। উপজাতীয় সমাজ, কোন কেন্দ্রীয় শাসনের অনুপস্থিতি, বিশাল মরুভূমি, রোমের বিলাস ব্যাসনের তুলনায় অতি কঠোর জীবন এই সমস্ত কিছুই এই অঞ্চলের খৃষ্টধর্মকে ভীন্নভাবে বিবর্তিত হতে বাধ্য করেছে। যীশুর অনৈশ্বরিকতা আগ্রাসী একেশ্বরবাদে রূপ নিতে চলেছিল। ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল, ইতিহাস শুধু অপেক্ষা করছিল অনুকূল সময়ের ;এতদ অঞ্চলে রোমান কর্তৃত্ব দুর্বল হওয়ার দরকার ছিল। সেই সুযোগ এসে গেল ৬১০ খৃষ্টাব্দে যখন সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরৌ পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখল করে নিলেন। ৬১০ খৃষ্টাব্দ শুনে কিছু মনে পড়ল কি? না পড়লে মস্তিস্কের কুঠুরীতে আরেকটু চাপ দিন, কাজ হবে নিশ্চয়ই





[কোরানের আয়াতগুলি মূলত https://www.hadithbd.com/ থেকে নেওয়া। মূলানুগ ইংরাজী অনুবাদ অনুসরণ করে দু-একটি জায়গায় পরিবর্তন করা হয়েছে]