আদি ইসলামের কেন্দ্রীয় চরিত্র কে ছিলেন?
ইসলামের উদ্ভব যে আরব সাম্রাজ্যের বিস্তারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আমরা আগের পর্বেই সে বিষয়ে ঈঙ্গিত পেয়েছি। এই পর্বে আমরা সূচনাকালীন ইসলাম নিয়ে আলোচনা করব। সপ্তম শতাব্দীর আরব বিজেতারা যে কোরানের অনুপ্ররণা ও কথিত মুহম্মদের আদর্শকে ধারণ করে দুর্দমনীয় গতিতে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলল, আশ্চর্যের বিষয় সেই মুহম্মদ আর কোরানকেই সংশ্লিষ্ট সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাদের পাওয়া যায় তার বহু পরে লেখা এবং বিবরণীতে একমাত্র তার বহু পরে লেখা বিবরণীতে। এমন নয় যে সমসাময়িক প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনের অভাব আছে। আরব বিজেতাদের সবচেয়ে পুরানো যেসব মুদ্রা পাওয়া গেছে তাতে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ (bism Allah অর্থাৎ আল্লাহর নামে) খোদিত রয়েছে। আল্লাহ হল ঈশ্বরের আরবী প্রতিশব্দ মাত্র। ইহুদী ও খৃষ্টান আরববাসীরাও তাদের ঈশ্বরকে আল্লাহ নামে ডেকে থাকে। অনান্য যেসব মুদ্রা পাওয়া গেছে তাতে ‘বিসমিল্লাহ রাব্বি’- অর্থাৎ আমার প্রভু আল্লার নামে, ‘রাব্বি আল্লাহ’- আমার প্রভু আল্লাহ, ‘বিসমিল্লাহ আল-মালিক’- মহাসম্রাট আল্লাহর নামে ইত্যাদী লেখা পাওয়া যায়। যদি আমরা এইসময়ের একটিও মুদ্রা পেতাম যেখানে ‘মুহম্মদ রাসুলাল্লাহ’ অর্থাৎ মু্হম্মদ আল্লার রাসুল- খোদিত আছে, সেক্ষেত্রে আমরা অন্তত আংশিকভাবে (পুরোপুরি না হওয়ার কারণ পরে আলোচিত হবে) সাম্রাজ্যের ইসলামিক চরিত্র নিয়ে নিশ্চিত হতে পারতাম, কিন্তু সেইরকম একটিও পাওয়া যায় না।
৬৪৭-৬৫৮ এর মধ্যে মধ্যে ছাপানো একটি মুদ্রায় অবশ্য Muhammad লিপিকৃত রয়েছে। কিন্তু এর উল্টো পিঠে মুশলিম শাসকের প্রতিকৃতি দেখা যায়। এই রকম বেশ কিছু মুদ্রা এর পর থেকে পাওয়া যেতে শুরু করে। ছবি বা মূর্তির ব্যাপারে ইসলামের প্রবল সংবেদনশীলতার কথা মনে রেখে এইসমস্ত লিপিকে মুসলিম শাসনের প্রমান হিসাবে মেনে নেওয়া শক্ত। বরং এটাই প্রতীয়মান হয় যে ওইসময় ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলি আদপেই প্রচলিত হয়নি। আদি ইসলামে মুহম্মদ বলতে প্রকৃতপক্ষে ইসলামের তথাকথিত নবীকে বোঝাত না, মুহম্মদ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘নিযুক্ত, প্রশংসিত জন’ বোঝাত। এইসমস্ত মুদ্রাগুলিতে প্রকৃতপক্ষে খলিফাকে ঈশ্বর দ্বারা নিযুক্ত/প্রশংসিত ব্যক্তি হিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, বেশ ভাল সংখ্যক মুদ্রায় খলিফার একহাতে একটি ক্রুশ দেখা যায়।
মুয়াবিয়ার আমলের আর একটি লিপি পাওয়া গেছে প্যালেষ্টাইনের গাদারায়। এটি ৬৬২ খৃষ্টাব্দে একটি স্নানাগারের উপরে উৎকীর্ণ হয়েছিল। লিপিটি শুরু হচ্ছে একটি ক্রুশের চিহ্ন দিয়ে। মনে রাখা দরকার এটি ছিল সরকারি স্নানাগার, খলিফার নির্দেশেই লিপিটি উৎকীর্ণ হয়েছিল। তার প্রমান আমরা লিপিতেই পাই- এখানে মুয়াবিয়াকে আল্লার দাস, রক্ষকদের নেতা ইত্যাদী অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে। মুয়াবিয়ার উত্তরসূরী প্রথম ইয়াজিদের(৬৮০-৬৮৩) মুদ্রাতেও একইভাবে খলিফার ক্রুশবহনকারী প্রতিমূর্তি পাওয়া যায়।
“পরম করুনাময় আল্লাহর নামে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ এক, তার কোন সঙ্গী নেই [কিছু অতিরিক্ত বক্তব্যের সাথে শাহাদার প্রথম অংশ] আধিপত্য তাহারই এবং প্রশংসা তাহারই, তিনি জীবনদান করেন ও তিনি মৃত্যু ঘটান এবং তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান [সুরা তাগাবুনের ১ নং আয়াত ও সুরা হাদিদের ২নং আয়াতের কিছু অংশ মিশ্রিত] মুহম্মদ আল্লার বান্দা ও তার রাসুল [একটু পরিবর্তিতভাবে শাহাদার শেষ অংশ] আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাহার ফিরিসতারাও নবীকে অনুগ্রহ করেন, হে মুনিনগন, তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও [সুরা আহযাবের ৫৬ নং আয়াত সম্পূর্ন] আল্লাহর অনুগ্রহ তার উপর এবং তার উপরে শান্তি বর্ষিত হোক ও আল্লাহর করুণা থাকুক তার উপর [কোরানের অংশ নয়] হে আহলে-কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর শানে নিতান্ত সত্য ছাড়া কোন কথা বলো না। নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং রূহ-তাঁরই কাছ থেকে আগত। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রসূলগণকে মান্য কর। একথা বলো না যে, তিন, থাম; তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তান-সন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমান সমূহ ও যমীনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। মসীহ আল্লাহর বান্দা হবেন, তাতে তার কোন লজ্জাবোধ নেই এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাদেরও না। বস্তুতঃ যারা আল্লাহর দাসত্বে লজ্জাবোধ করবে এবং অহংকার করবে, তিনি তাদের সবাইকে নিজের কাছে সমবেত করবেন।[সুরা নিসা আয়াত ১৭১-৭২ সম্পূর্ন], হে আল্লাহ, আপনার রাসুল ও বান্দা মরিয়ম পুত্র ঈসাকে অনুগ্রহ করুন (অব্যয়ের চিহ্ন, পরবর্তী ভাষ্যকে সূচীত করে) তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক যেদিন তিনি জন্মলাভ করেছিলেন যেদিন তার মৃত্যু হয় এবং যেদিন তিনি পুনরুত্থিত হবেন [সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৩ সম্পূর্ন; শুধুমাত্র সর্বনাম পদগুলি উত্তম পুরুষ থেকে প্রথম পুরুষে পরিবর্তিত হয়েছে।] এই মারইয়ামের পুত্র ঈসা। সত্যকথা, যে সম্পর্কে লোকেরা বিতর্ক করে। আল্লাহ এমন নন যে, সন্তান গ্রহণ করবেন, তিনি পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, তিনি যখন কোন কাজ করা সিদ্ধান্ত করেন, তখন একথাই বলেনঃ হও এবং তা হয়ে যায়। [সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৪-৩৫ সম্পূর্ন] নিশ্চয় আল্লাহ আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তার এবাদত কর। এটা সরল পথ।[সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৬, সুরার শুরুতে একটি সংযোযক অব্যয় ‘এবং’ বাদ দেওয়া হয়েছে] আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম। এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ, যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি কুফরী করে তাদের জানা উচিত যে, নিশ্চিতরূপে আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত দ্রুত। [সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮-১৯ সম্পূর্ন]
যে বিষযটি চোখে না পড়েই পারে না তা হল এলোমেলোভাবে বিভিন্ন আয়াতের অংশ লিপিতে উঠে এসেছে। কোরান থেকে যদি সরাসরি লিপিকৃত করা হত তাহলে আমরা একই জায়গায় একটি সম্পূর্ন সুরা বা তার অংশবিশেষ পেতাম। ব্র্যাকেটের মধ্যের অংশগুলি মূল কোরানের সাথে এই লিপির পার্থক্য ও ঘনিষ্ঠতা বোঝাবার জন্য দেওয়া হয়েছে। কোরানের আয়াত বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে আমরা আজকে যে আকারে কোরানকে পাই তার সাথে বহু ছোটোখাটো পার্থক্য রয়েছে। হয়ত তুচ্ছ পার্থক্য এতে অর্থের পরিবর্তন ঘটছে না, কিন্তু মনে রাখা দরকার একজন মুসলিমের কাছে কোরান আল্লাহর বাণী। তাই একজন ধার্মিক মুসলিম জেনেশুনে কোরানের আয়াত পরিবর্তিত করছে এটা অচিন্তনীয়। সুতরাং মনে হয় ওই সময় পর্যন্ত্য কোরান (অন্তত আজকের আকারে) প্রচলিত ছিল না। কোরান চালু থাকলে কখনই আয়াতগুলি পরিবর্তিত আকারে আমরা পেতাম না। তবে কি এই লিপি থেকেই পরবর্তীকালে কোরানের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলি সংকলিত হয়। এই সম্ভাবনাটি যথেষ্ট বিচারযোগ্য বটে তবে গবেষক এসটেল হোয়েলান এই যুক্তির অসাড়তা দেখিয়েছেন। যদি কোরানের অংশবিশেষ এই শিলালিপি থেকে গৃহীত হয়ে থাকে তবে সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলি একেবারে এই লিপির আকারেই পাওয়ার কথা। সবচেয়ে বড় কথা হল-“আধিপত্য তাহারই এবং প্রশংসা তাহারই, তিনি জীবনদান করেন ও তিনি মৃত্যু ঘটান এবং তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান”- সেক্ষেত্রে এই লেখটির একটি অংশ এক সুরায় এবং অপর অংশ অন্য সুরায় ঢোকাবার কোনই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এটা অত্যন্ত অবিশ্বাস্য যে একই জায়গা থেকে নেওয়া এই বাক্যটিকে ভেঙে প্রথম অংশকে সুরা তাগাবুনে ঢোকানো হল আর পরেরটিকে সুরা হাদিদে ঢোকানো হল। এরপর আমাদের হাতে আর একটিমাত্র বিকল্প থাকে তা হল, কোরান এবং Dome of the Rock লিপি দুটিই কোন পূর্ববর্তী উৎস থেকে এসেছে; যেটির এখন আর কোন অস্তিত্ত নেই। উৎসাহী পাঠকদের কিছুটা নিরাশ করেই বিষযটি আপাতত স্থগিত রাখলাম, পরে কোরান আলোচনার সময়ে আবার এই প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাবে। এখন Dome of the Rock লিপির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টের দিকে নজর দেব।
মোট উৎকীর্ণ লিপির সামান্য অংশই তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও বারবার পড়লে দেখতে পাবেন যে Dome of the Rock লিপি আল্লাহর গুনকীর্তন ছাড়া মূলত বলতে চাইছে যে ঈসা নবী অর্থাৎ যীশু খৃষ্ট ঈশ্বর নন, তিনি ঈশ্বরের পুত্রও নন; তিনি আল্লাহর বান্দা ও সুসংবাদ দানকারী মাত্র। দেখলে মনে হবে যেন কোরানের ঈসা নবী সংক্রান্ত বক্তব্যগুলিই বেছে বেছে তুলে আনা হয়েছে। ঈসা নবীকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কি কারণ? পূর্বেই বলা হয়েছে মু্হম্মদ শব্দের আবিধানিক অর্থ হল নিযুক্ত/প্রশংসিত ব্যক্তি, যেটা প্রকৃতপক্ষে একটা উপাধি। আল-মুহম্মদ হল সঠিকভাবে আরবীতে প্রশংসিত ব্যক্তি। ক্রিস্তোফ লুক্সেমবার্গ নামে এক ভাষাবিদ দেখিয়েছেন আরবী নির্দেশক পদ ‘আল’ বাদ দিয়ে শুধু ‘মুহম্মদ’ শব্দটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। এতে করে “মুহম্মদ আল্লার বান্দা ও তার রাসুল” বাক্যটির অনেক বেশী যৌক্তিক অর্থ হয় -“(সকল) প্রশংসা আল্লার বান্দা ও রাসুলের”। তার মতে গোড়ায় মুহম্মদ শব্দটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য হিসাবেই ব্যবহার হত, পরবর্তীকালে কোরানের কয়েকটি আয়াতের উপর ভিত্তি করে এটি ব্যক্তিনাম হিসাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
তা নাহয় বোঝা গেল, কিন্তু আল্লাহর রসুল বা বার্তাবহনকারী কে? Dome of the Rock লিপি পরিস্কার উত্তর দিচ্ছে “নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল”। তবে কি ঈসা বা যীশু খৃষ্টই ছিলেন আদি ইসলামের কেন্দ্রীয় চরিত্র? চলুন এবার ইসলামিক সূত্রই অনুসন্ধান করি, না হলে মুনিন ভাইয়েরা গোঁসা করতে পারেন। মুহম্মদের প্রথম জীবনীকার ইবনে ইশাক লক্ষ্য করেছেন বাইবেলে ‘Munahhemana’ শব্দটি আছে যার অর্থ ‘The Comforter’(খৃস্টধর্মের হোলি ট্রিনিটির তিন অংশের এক অংশ)। ইবনে ইশাক বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার পর আমাদের জানাচ্ছেন “মুনাহেমানা, ঈশ্বর তাকে অনুগ্রহ ও রক্ষা করুন, সিরিয়াক ভাষায় হলেন মুহম্মদ; গ্রীক ভাষায় হলেন প্যারাক্লিট” সিরাত রসুল উল্লাহের ইংরাজী অনুবাদক Alfred Guillaume দেখিয়েছেন যে মুনাহেমানা এই শব্দটি দ্বারা প্রাচ্যের খৃষ্টীয় সাহিত্যে আদতে যীসু খৃস্টকে বোঝানো হত। অর্থাৎ মুনাহেমানা বা মুহম্মদ এই উপাধীটির আদি গ্রাহক ছিলেন যীশু খৃষ্ট। চুপি চুপি বলে রাখি খোদ কোরানেই ঈসার উল্লেখ আছে ২৫ বার, মুহম্মদ শব্দটি এসেছে মাত্র ৪ বার।
“হে আহলে-কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর শানে নিতান্ত সত্য ছাড়া কোন কথা বলো না। নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং রূহ-তাঁরই কাছ থেকে আগত। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রসূলগণকে মান্য কর। একথা বলো না যে, তিন, থাম; তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তান-সন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমান সমূহ ও যমীনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট”
তবে মনে রাখা দরকার খৃষ্টধর্মের শাথা হিসাবে আদি ইসলামের সূচনা হলেও এর সাথে রোমান ক্যাথলিসিজমের প্রবল বৈপরীত্য রয়েছে। বারবার যীশুর ঐশ্বরিকতা অস্বীকার করার প্রচেষ্টাতেই এটা পরিস্কার। উপরের লিপির অংশটি (যেটি একটি কোরানের আয়াতও বটে) ঈশ্বর তিন নন, ঈশ্বর এক ইত্যাদী বলে খৃষ্টধর্মের হোলি ট্রিনিটির ধারণাকে সরাসরি নাকচ করছে।
ইসলামের উদ্ভব যে আরব সাম্রাজ্যের বিস্তারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আমরা আগের পর্বেই সে বিষয়ে ঈঙ্গিত পেয়েছি। এই পর্বে আমরা সূচনাকালীন ইসলাম নিয়ে আলোচনা করব। সপ্তম শতাব্দীর আরব বিজেতারা যে কোরানের অনুপ্ররণা ও কথিত মুহম্মদের আদর্শকে ধারণ করে দুর্দমনীয় গতিতে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলল, আশ্চর্যের বিষয় সেই মুহম্মদ আর কোরানকেই সংশ্লিষ্ট সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাদের পাওয়া যায় তার বহু পরে লেখা এবং বিবরণীতে একমাত্র তার বহু পরে লেখা বিবরণীতে। এমন নয় যে সমসাময়িক প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনের অভাব আছে। আরব বিজেতাদের সবচেয়ে পুরানো যেসব মুদ্রা পাওয়া গেছে তাতে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ (bism Allah অর্থাৎ আল্লাহর নামে) খোদিত রয়েছে। আল্লাহ হল ঈশ্বরের আরবী প্রতিশব্দ মাত্র। ইহুদী ও খৃষ্টান আরববাসীরাও তাদের ঈশ্বরকে আল্লাহ নামে ডেকে থাকে। অনান্য যেসব মুদ্রা পাওয়া গেছে তাতে ‘বিসমিল্লাহ রাব্বি’- অর্থাৎ আমার প্রভু আল্লার নামে, ‘রাব্বি আল্লাহ’- আমার প্রভু আল্লাহ, ‘বিসমিল্লাহ আল-মালিক’- মহাসম্রাট আল্লাহর নামে ইত্যাদী লেখা পাওয়া যায়। যদি আমরা এইসময়ের একটিও মুদ্রা পেতাম যেখানে ‘মুহম্মদ রাসুলাল্লাহ’ অর্থাৎ মু্হম্মদ আল্লার রাসুল- খোদিত আছে, সেক্ষেত্রে আমরা অন্তত আংশিকভাবে (পুরোপুরি না হওয়ার কারণ পরে আলোচিত হবে) সাম্রাজ্যের ইসলামিক চরিত্র নিয়ে নিশ্চিত হতে পারতাম, কিন্তু সেইরকম একটিও পাওয়া যায় না।
৬৪৭-৬৫৮ এর মধ্যে মধ্যে ছাপানো একটি মুদ্রায় অবশ্য Muhammad লিপিকৃত রয়েছে। কিন্তু এর উল্টো পিঠে মুশলিম শাসকের প্রতিকৃতি দেখা যায়। এই রকম বেশ কিছু মুদ্রা এর পর থেকে পাওয়া যেতে শুরু করে। ছবি বা মূর্তির ব্যাপারে ইসলামের প্রবল সংবেদনশীলতার কথা মনে রেখে এইসমস্ত লিপিকে মুসলিম শাসনের প্রমান হিসাবে মেনে নেওয়া শক্ত। বরং এটাই প্রতীয়মান হয় যে ওইসময় ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলি আদপেই প্রচলিত হয়নি। আদি ইসলামে মুহম্মদ বলতে প্রকৃতপক্ষে ইসলামের তথাকথিত নবীকে বোঝাত না, মুহম্মদ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘নিযুক্ত, প্রশংসিত জন’ বোঝাত। এইসমস্ত মুদ্রাগুলিতে প্রকৃতপক্ষে খলিফাকে ঈশ্বর দ্বারা নিযুক্ত/প্রশংসিত ব্যক্তি হিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, বেশ ভাল সংখ্যক মুদ্রায় খলিফার একহাতে একটি ক্রুশ দেখা যায়।
মুয়াবিয়ার আমলের আর একটি লিপি পাওয়া গেছে প্যালেষ্টাইনের গাদারায়। এটি ৬৬২ খৃষ্টাব্দে একটি স্নানাগারের উপরে উৎকীর্ণ হয়েছিল। লিপিটি শুরু হচ্ছে একটি ক্রুশের চিহ্ন দিয়ে। মনে রাখা দরকার এটি ছিল সরকারি স্নানাগার, খলিফার নির্দেশেই লিপিটি উৎকীর্ণ হয়েছিল। তার প্রমান আমরা লিপিতেই পাই- এখানে মুয়াবিয়াকে আল্লার দাস, রক্ষকদের নেতা ইত্যাদী অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে। মুয়াবিয়ার উত্তরসূরী প্রথম ইয়াজিদের(৬৮০-৬৮৩) মুদ্রাতেও একইভাবে খলিফার ক্রুশবহনকারী প্রতিমূর্তি পাওয়া যায়।
আমরা সবাই জানি ক্রুশ হল খৃষ্টান ধর্মের প্রতিকচিহ্ন। তবে কি আদি ইসলামিক খলিফারা নিজেদের খৃষ্টান শাসক বলে মনে করতেন? যদিও উমাইয়া খলিফারা ধর্মীয় শিথিলতার জন্য ঈশ্বরহীন খলিফা নামে আখ্যায়িত হয়েছেন (বহু পরে রচিত ইসলামিক সূত্র আমাদের সেইরকমই জানায়); ধর্মের বিষয়ে শিথিলতা দেখানো এক বিষয় আর পুরোপুরি আলাদা ধর্মের প্রতিকচিহ্ন ধারণ করা সম্পূর্ন অন্য বিষয়। পাঠকরা নিশ্চই প্রশ্ন করবেন- যে তাহলে কখন নতুন ধর্ম ইসলামের উদ্ধব ঘটল, ইতিহাস আমাদের এই বিষয়ে কি বলে? প্রকৃতপক্ষে আবদ আল মালিকের (৬৮৫-৭০৫) রাজত্বকালের আগে কোনরকম জোরালো প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায় না যা খাঁটি ইসলামিক বলে গণ্য হতে পারে। আবদ আল মালিকের রাজত্বকালে নির্মিত Dome of the Rock মসজিদে (জেরুজালেমে
অবস্থিত কুব্বাত আল-সাখরা)প্রাপ্ত লিপিই হল ইসলামিক ধর্মতত্বের প্রথম ঐতিহাসিক ঘোষনা। ৬৯১ সালে কৃত এই শিলালিপিটিতে কোরানের আয়াত খোদাই করা হয়েছে। মসজিদের একটি অষ্টাভূজ তোরণের ভিতরের অংশে এই লেখটি উৎকীর্ণ আছে-
“পরম করুনাময় আল্লাহর নামে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ এক, তার কোন সঙ্গী নেই [কিছু অতিরিক্ত বক্তব্যের সাথে শাহাদার প্রথম অংশ] আধিপত্য তাহারই এবং প্রশংসা তাহারই, তিনি জীবনদান করেন ও তিনি মৃত্যু ঘটান এবং তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান [সুরা তাগাবুনের ১ নং আয়াত ও সুরা হাদিদের ২নং আয়াতের কিছু অংশ মিশ্রিত] মুহম্মদ আল্লার বান্দা ও তার রাসুল [একটু পরিবর্তিতভাবে শাহাদার শেষ অংশ] আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাহার ফিরিসতারাও নবীকে অনুগ্রহ করেন, হে মুনিনগন, তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও [সুরা আহযাবের ৫৬ নং আয়াত সম্পূর্ন] আল্লাহর অনুগ্রহ তার উপর এবং তার উপরে শান্তি বর্ষিত হোক ও আল্লাহর করুণা থাকুক তার উপর [কোরানের অংশ নয়] হে আহলে-কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর শানে নিতান্ত সত্য ছাড়া কোন কথা বলো না। নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং রূহ-তাঁরই কাছ থেকে আগত। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রসূলগণকে মান্য কর। একথা বলো না যে, তিন, থাম; তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তান-সন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমান সমূহ ও যমীনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। মসীহ আল্লাহর বান্দা হবেন, তাতে তার কোন লজ্জাবোধ নেই এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাদেরও না। বস্তুতঃ যারা আল্লাহর দাসত্বে লজ্জাবোধ করবে এবং অহংকার করবে, তিনি তাদের সবাইকে নিজের কাছে সমবেত করবেন।[সুরা নিসা আয়াত ১৭১-৭২ সম্পূর্ন], হে আল্লাহ, আপনার রাসুল ও বান্দা মরিয়ম পুত্র ঈসাকে অনুগ্রহ করুন (অব্যয়ের চিহ্ন, পরবর্তী ভাষ্যকে সূচীত করে) তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক যেদিন তিনি জন্মলাভ করেছিলেন যেদিন তার মৃত্যু হয় এবং যেদিন তিনি পুনরুত্থিত হবেন [সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৩ সম্পূর্ন; শুধুমাত্র সর্বনাম পদগুলি উত্তম পুরুষ থেকে প্রথম পুরুষে পরিবর্তিত হয়েছে।] এই মারইয়ামের পুত্র ঈসা। সত্যকথা, যে সম্পর্কে লোকেরা বিতর্ক করে। আল্লাহ এমন নন যে, সন্তান গ্রহণ করবেন, তিনি পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, তিনি যখন কোন কাজ করা সিদ্ধান্ত করেন, তখন একথাই বলেনঃ হও এবং তা হয়ে যায়। [সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৪-৩৫ সম্পূর্ন] নিশ্চয় আল্লাহ আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তার এবাদত কর। এটা সরল পথ।[সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৬, সুরার শুরুতে একটি সংযোযক অব্যয় ‘এবং’ বাদ দেওয়া হয়েছে] আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম। এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ, যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি কুফরী করে তাদের জানা উচিত যে, নিশ্চিতরূপে আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত দ্রুত। [সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮-১৯ সম্পূর্ন]
যে বিষযটি চোখে না পড়েই পারে না তা হল এলোমেলোভাবে বিভিন্ন আয়াতের অংশ লিপিতে উঠে এসেছে। কোরান থেকে যদি সরাসরি লিপিকৃত করা হত তাহলে আমরা একই জায়গায় একটি সম্পূর্ন সুরা বা তার অংশবিশেষ পেতাম। ব্র্যাকেটের মধ্যের অংশগুলি মূল কোরানের সাথে এই লিপির পার্থক্য ও ঘনিষ্ঠতা বোঝাবার জন্য দেওয়া হয়েছে। কোরানের আয়াত বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে আমরা আজকে যে আকারে কোরানকে পাই তার সাথে বহু ছোটোখাটো পার্থক্য রয়েছে। হয়ত তুচ্ছ পার্থক্য এতে অর্থের পরিবর্তন ঘটছে না, কিন্তু মনে রাখা দরকার একজন মুসলিমের কাছে কোরান আল্লাহর বাণী। তাই একজন ধার্মিক মুসলিম জেনেশুনে কোরানের আয়াত পরিবর্তিত করছে এটা অচিন্তনীয়। সুতরাং মনে হয় ওই সময় পর্যন্ত্য কোরান (অন্তত আজকের আকারে) প্রচলিত ছিল না। কোরান চালু থাকলে কখনই আয়াতগুলি পরিবর্তিত আকারে আমরা পেতাম না। তবে কি এই লিপি থেকেই পরবর্তীকালে কোরানের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলি সংকলিত হয়। এই সম্ভাবনাটি যথেষ্ট বিচারযোগ্য বটে তবে গবেষক এসটেল হোয়েলান এই যুক্তির অসাড়তা দেখিয়েছেন। যদি কোরানের অংশবিশেষ এই শিলালিপি থেকে গৃহীত হয়ে থাকে তবে সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলি একেবারে এই লিপির আকারেই পাওয়ার কথা। সবচেয়ে বড় কথা হল-“আধিপত্য তাহারই এবং প্রশংসা তাহারই, তিনি জীবনদান করেন ও তিনি মৃত্যু ঘটান এবং তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান”- সেক্ষেত্রে এই লেখটির একটি অংশ এক সুরায় এবং অপর অংশ অন্য সুরায় ঢোকাবার কোনই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এটা অত্যন্ত অবিশ্বাস্য যে একই জায়গা থেকে নেওয়া এই বাক্যটিকে ভেঙে প্রথম অংশকে সুরা তাগাবুনে ঢোকানো হল আর পরেরটিকে সুরা হাদিদে ঢোকানো হল। এরপর আমাদের হাতে আর একটিমাত্র বিকল্প থাকে তা হল, কোরান এবং Dome of the Rock লিপি দুটিই কোন পূর্ববর্তী উৎস থেকে এসেছে; যেটির এখন আর কোন অস্তিত্ত নেই। উৎসাহী পাঠকদের কিছুটা নিরাশ করেই বিষযটি আপাতত স্থগিত রাখলাম, পরে কোরান আলোচনার সময়ে আবার এই প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাবে। এখন Dome of the Rock লিপির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টের দিকে নজর দেব।
মোট উৎকীর্ণ লিপির সামান্য অংশই তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও বারবার পড়লে দেখতে পাবেন যে Dome of the Rock লিপি আল্লাহর গুনকীর্তন ছাড়া মূলত বলতে চাইছে যে ঈসা নবী অর্থাৎ যীশু খৃষ্ট ঈশ্বর নন, তিনি ঈশ্বরের পুত্রও নন; তিনি আল্লাহর বান্দা ও সুসংবাদ দানকারী মাত্র। দেখলে মনে হবে যেন কোরানের ঈসা নবী সংক্রান্ত বক্তব্যগুলিই বেছে বেছে তুলে আনা হয়েছে। ঈসা নবীকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কি কারণ? পূর্বেই বলা হয়েছে মু্হম্মদ শব্দের আবিধানিক অর্থ হল নিযুক্ত/প্রশংসিত ব্যক্তি, যেটা প্রকৃতপক্ষে একটা উপাধি। আল-মুহম্মদ হল সঠিকভাবে আরবীতে প্রশংসিত ব্যক্তি। ক্রিস্তোফ লুক্সেমবার্গ নামে এক ভাষাবিদ দেখিয়েছেন আরবী নির্দেশক পদ ‘আল’ বাদ দিয়ে শুধু ‘মুহম্মদ’ শব্দটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। এতে করে “মুহম্মদ আল্লার বান্দা ও তার রাসুল” বাক্যটির অনেক বেশী যৌক্তিক অর্থ হয় -“(সকল) প্রশংসা আল্লার বান্দা ও রাসুলের”। তার মতে গোড়ায় মুহম্মদ শব্দটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য হিসাবেই ব্যবহার হত, পরবর্তীকালে কোরানের কয়েকটি আয়াতের উপর ভিত্তি করে এটি ব্যক্তিনাম হিসাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
তা নাহয় বোঝা গেল, কিন্তু আল্লাহর রসুল বা বার্তাবহনকারী কে? Dome of the Rock লিপি পরিস্কার উত্তর দিচ্ছে “নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল”। তবে কি ঈসা বা যীশু খৃষ্টই ছিলেন আদি ইসলামের কেন্দ্রীয় চরিত্র? চলুন এবার ইসলামিক সূত্রই অনুসন্ধান করি, না হলে মুনিন ভাইয়েরা গোঁসা করতে পারেন। মুহম্মদের প্রথম জীবনীকার ইবনে ইশাক লক্ষ্য করেছেন বাইবেলে ‘Munahhemana’ শব্দটি আছে যার অর্থ ‘The Comforter’(খৃস্টধর্মের হোলি ট্রিনিটির তিন অংশের এক অংশ)। ইবনে ইশাক বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার পর আমাদের জানাচ্ছেন “মুনাহেমানা, ঈশ্বর তাকে অনুগ্রহ ও রক্ষা করুন, সিরিয়াক ভাষায় হলেন মুহম্মদ; গ্রীক ভাষায় হলেন প্যারাক্লিট” সিরাত রসুল উল্লাহের ইংরাজী অনুবাদক Alfred Guillaume দেখিয়েছেন যে মুনাহেমানা এই শব্দটি দ্বারা প্রাচ্যের খৃষ্টীয় সাহিত্যে আদতে যীসু খৃস্টকে বোঝানো হত। অর্থাৎ মুনাহেমানা বা মুহম্মদ এই উপাধীটির আদি গ্রাহক ছিলেন যীশু খৃষ্ট। চুপি চুপি বলে রাখি খোদ কোরানেই ঈসার উল্লেখ আছে ২৫ বার, মুহম্মদ শব্দটি এসেছে মাত্র ৪ বার।
“হে আহলে-কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর শানে নিতান্ত সত্য ছাড়া কোন কথা বলো না। নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং রূহ-তাঁরই কাছ থেকে আগত। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রসূলগণকে মান্য কর। একথা বলো না যে, তিন, থাম; তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তান-সন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমান সমূহ ও যমীনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট”
তবে মনে রাখা দরকার খৃষ্টধর্মের শাথা হিসাবে আদি ইসলামের সূচনা হলেও এর সাথে রোমান ক্যাথলিসিজমের প্রবল বৈপরীত্য রয়েছে। বারবার যীশুর ঐশ্বরিকতা অস্বীকার করার প্রচেষ্টাতেই এটা পরিস্কার। উপরের লিপির অংশটি (যেটি একটি কোরানের আয়াতও বটে) ঈশ্বর তিন নন, ঈশ্বর এক ইত্যাদী বলে খৃষ্টধর্মের হোলি ট্রিনিটির ধারণাকে সরাসরি নাকচ করছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন