সোমবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

মু্হম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-৬

হাদিসের হদিস

এই পর্বে আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় হল হাদিস। হাদিসগুলি যে ঐতিহাসিক আলোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বহীন সে বিষয়ে বহু আগে থেকেই নিয়ে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে স্কলাররা একমত। মুসলিম স্কলাররা সাধারণত প্রচলিত ষটি হাদিস সংকলনকে সসীহ বা অথেনটিক হিসাবে গ্রহন করেন, এগুলী হল- ইমাম বুখারীর (৮১০-৮৭০)সহী বুখারী, মুসলিম ইবনে আল-হা্জ্জাজের (৮২১-৮৮৭) সহী মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ (৮১৮-৮৮৯), সুনানে ইবনে মাজাহ (৮২৪-৮৮৭) তিরমিসির (৮২৪-৮৯২) জামি , ইবনে নাসাই (৮২৯-৯১৫) এর আস-সুনান আস সুঘ্রা। অবশ্য এর বাইরেও বহু সংখ্যক হাদিস সংকলন রয়েছে। স্পস্টতই দেখা যাচ্ছে যে সহী হাদিস সংকলকরা সবাই প্রায় মুহম্মদের কথিত সময়কালের দু শতক পরের মানুষ। ইসলামিক সূত্র প্রথম হাদিস সংকলক হিসাবে মালিক ইবনে আনাস (৭১৭-৭৯৫) নাম উল্লেখ করে, যার সংকলিত মুয়েত্তা এখনও ইসলামী আইনের-কানুনের প্রামান্য গ্রন্থ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর (৭৫৪-৭৭৫) এর আমলে সংকলিত এই মুয়েত্তা মুহম্মদের কথিত মৃত্যুর অন্তত চোদ্দ দশক পরে রচিত হয়েছিল। এর অর্থ হাদিসগুলি এর আগে কোন  লিখিত আকারে প্রচলিত ছিল না, মানুষের মুখে মুখে হয়ত বা প্রচলিত ছিল। যে কোন ঐতিহাসিক ঘটনা পৌরাণিক রূপ পরিগ্রহ করার পক্ষে দেড় শতাদ্বী যথেষ্ট ভাল সময়। ফলে মুহম্মদ যদি ঐতিহাসিক চরিত্র হয়েও থাকেন, দেড় শতাব্দী পরে লোকমুখে প্রচারিত গল্পের মাধ্যমে পৌরাণিক নবী হিসাবে পরিগণিত হতে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি। এই গাল-গল্পগুলিই পরবর্তীকালে হাদিস হিসাবে স্থান পেয়েছে।

হাদিস গবেষনা প্রসঙ্গে যার নাম না করলেই চলে না তিনি হলেন হাঙ্গেরীয়ান স্কলার ইগনাচ গোল্ডজিহের (22 June 1850 – 13 November 1921)। তার ধ্রুপদী গবেষনার উপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী গবেষকরা ইসলামী বিবরণের বিপরীতে ভিন্নভাবে ভাবতে পেরেছেন। আগ্রহী ব্যক্তিরা গোল্ডজিহেরের Muslim Studies  গ্রন্থটি পড়ে দেখবেন। এবার মূল কথায় আসি হাদিসগুলি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসাবে ঐতিহাসিকদের কাছে গ্রহনযোগ্য না হলেও ১৬০ কোটি মুসলিম এগুলীতে বিশ্বাস করেন। এত মানুষের বিশ্বাসের শক্তি বিরাট; তাই আমাদেরও হাদিস নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে। এত বিপুল সংখ্যক হাদিস রয়েছে, আর এই হাদিসের মধ্যে পরস্পরবিরোধী হাদিসের সংখ্যা এত বেশী যে আলেম-উলেমারাও হাদিস নিয়ে সমস্যায় পরে যান। এই কারণে মুসলিম পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় প্রায় সমস্ত বিতর্কিত ও অস্বস্তিকর হাদিসকে জাল ও জইফ হাদিস হিাসবে বাতিল করার চেষ্টা হয়েছে। চলেন এবার হাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ভাতের গল্প না করে হাত ঢুকিয়ে দু-চারটে ভাত টিপে দেখি। যেমন ধরেন:
মুহম্মদ কি আল্লাহকে দেখেছেন?-
১.উত্তর না
(সহী বুখারী, তাওহীদ অধ্যায়, হাদিস ৭০৩১)
“আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তোমাকে বলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় রবকে দেখেছেন, সে মিথ্যা বলল। কেননা আল্লাহ্ বলছেন, চক্ষু তাঁকে দেখতে পায় না। আর যে ব্যক্তি তোমাকে বলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েব জানেন, সেও মিথ্যা বলল। কেননা আল্লাহ্ বলেন, গায়িব জানেন একমাত্র আল্লাহ্। [৩২৩৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৮৬৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৮৬৬)”
২.-উত্তর হ্যাঁ
(সহী মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, হাদিস নং ৩২৪)
আবূ বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ (রহঃ) ..... আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে "নিশ্চয়ই তিনি (মুহম্মদ) তাকে (আল্লাকে) আরেকবার দেখেছিলেন"-

চলেন এরকম আরো একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজি: মু্হম্মদ উযুতে কতবার করে ধুতেন?
উত্তর- একবার “মুহম্মত ইবনে ইউসুফ(র)..... ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী এক উযুতে একবার করে ধুতেন”- (সহী বুখারী, উযু অধ্যায়, হাদিস ১৫৯)
উত্তর- দুবার “আবদুল্লাহ্ ইব্ন যায়দ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ‘নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উযূতে দু’বার করে ধুয়েছেন।“ (সহী বুখারী, উযু অধ্যায় হাদিস  (ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ) ১৬০)
উত্তর- তিনবার “হুমরান (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি ‘উসমান ইবনু আফ্ফান (রাযি.)-কে দেখেছেন যে, তিনি পানির পাত্র আনিয়ে উভয় হাতের তালুতে তিনবার ঢেলে তা ধুয়ে নিলেন। অতঃপর ডান হাত পাত্রের মধ্যে ঢুকালেন। তারপর কুলি করলেন ও নাকে পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করলেন। তারপর তাঁর মুখমন্ডল তিনবার ধুয়ে এবং দু’হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। অতঃপর মাথা মাসেহ করলেন। অতঃপর দুই পা টাখনু পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। পরে বললেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি আমার মত এ রকম উযূ করবে, অতঃপর দু’রাক‘আত সালাত আদায় করবে, যাতে দুনিয়ার কোন খেয়াল করবে না, তার পূর্বের গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (সহী বুখারী, উযু অধ্যায় হাদিস  (ইসলামী ফাউন্ডেশন) ১৬১)
এ হল মহাসমুদ্রের বিন্দু পরিমান নমুনা মাত্র।আর কেউ যদি শিয়া বিবরনের সঙ্গে সুন্নী বিবরণ মিলিয়ে দেখতে পারে তিনি বৈপরীত্যের পরিমান দেখে চমৎকৃত হয়ে যাবেন, তবে তার জন্য তার সুন্নী হাদিস সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকা প্রয়োজন। গবেষনুচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য  শিয়া সাইটের লিঙ্ক দিলাম - https://www.al-islam.org .

যে কোন রুচিশীল ভদ্রলোক যদি হাদিস পড়তে থাকেন, কিছুদূর গিয়েই ধাক্কা খাবেন। একটি হাদিসে দেখা যায় নবীজির দাসি উম আয়মান ভূলবশত নবীজির প্রস্রাব খেয়ে ফেলার পর নবীজিকে জানালে তিনি তাকে আস্বস্ত করেন:
Tabarani said: Hussain bin Is’haq al-Tustari informed us, who was informed by Uthman bin Abi Shaybah, who was informed by Shababah bin Sawwar, who was informed by Abu Malik al-Nakha’i who narrated from Aswad bin Qays, who narrated from Nubayh al-Anazi, who narrated from Umm Ayman, who said: ‘‘One night the Prophet got up and went to a side to urinate in the bowl. During the night, I rose and was thirsty so I drank whatever was in it and I did not even realize what it was. In the morning, He said, ‘Oh Umm Ayman! Throw away whatever is in the bowl’. I replied, ‘I drank what was in the bowl’. He thereafter smiled as such that His teeth appeared and said, ‘Beware! You will never have stomach pain’’.
(Tabarani Kabir 20740, Mustadrak al-Hakim 6912, Dalail al-Nubuwwah li-Isfahani 355)

আর একটি হাদিসে দেখা যায় মুহম্মদ তার পৌত্র হাসান ও হুসেনের লিঙ্গে চুমু খাচ্ছেন। (দ্রষ্টব্য- মাজমা আল জাওয়াইদ, ২৯৯/৯)। এরকম কুরুচিকর বর্ণনাসম্বলিত হাদিস গন্ডায় গন্ডায় পাওয়া যায়। রুচিশীল পাঠকদের আর ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে চাই না। একজন পৌরাণিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বাস্তব-অবাস্তব যত রকমের কল্পনা সম্ভব সবই স্থান পেয়েছে হাদিস গ্রন্থে। এখন এইপর্যন্ত্য আসার পরে প্রশ্ন আসতে বাধ্য এইরকম উদ্ধট হাদিসসমূহ ধর্মগ্রন্থ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেল কি করে- আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।

ইসলামী ধর্মতত্বে হাদিসের প্রথম কাজ হল কোরান ব্যাখ্যা করা। শনে নজুল নামক উপাদান হাদিসেই পাওয়া যায়, যার থেকে কোন পরিস্থিতিতে কোন আয়াত নাজিল হয়েছিল তা জানা যায়। কোরান অতিমাত্রায় দুর্বোধ্য, এলোমেলো একটি গ্রন্থ, তাফসিরের সাহায্য ছাড়া কোরান বুঝে পড়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। হাদিস যে বিবরণ দিচ্ছে তা যে সত্য তা আমরা বুঝব কি করে- প্রকৃতপক্ষে হাদিসের বর্ণনা ঐতিহাসিকভাবে যাচাই করার কোনই উপায় নেই। এর পরে কোরান আলোচনার সময় আমরা দেখব প্রকৃতপক্ষে ইসলামী স্কলাররা অনেক সময়ই বিভ্রান্ত হয়েছেন। কোরানের বহু সুরারই অনেক বেশী যৌক্তিক ব্যাখ্যা হাজির করা যদি আমরা ইসলামী বিবরণের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করি। ইসলামের প্রথম চার খলিফা কোন হাদিস সংকলন করেন নি। ইসলামী সূত্র আমাদের জানায় যে খলিফা উমর খলিফা যাবতীয় হাদিসসংকলন পুড়িয়ে ফেলেছিলেন; কারন তার মনে হয়েছিল হাদিস কোরানের প্রতিযোগী হয়ে যেতে পারে। তা হলে পরবর্তী মুসলিমরা এত এত হাদিস পেলেন কোথা থেকে?

আগের পর্বে আমরা দেখেছি আবদ-আল মালিকের(৬৮৫-৭০৫) রাজত্বকালের আগে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলি চালু হয়নি। উমাইয়া খলিফা আবদ-আল মালিক যার কথা আগের পর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনাকারী বিদ্রোহীদের আল্লা ও নবীর সুন্নাহ মানতে আহ্বান করেছিলেন।(1) যেখানে পূর্ববর্তী খলিফা মুয়াবিয়া উমরের সুন্নাহের উল্লেখ করেছেন (আল-ইয়াকুবী ২:২৬৪)।  এর থেকে মনে হতে পারে যে আবদ-আল মালিকের আমলে হাদিস প্রচারিত হয়ে গিয়েছিল এবং সেই সময়  নবীর সুন্নাহ রাষ্ট্রের আইন হিসাবে সংকলিত ও প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু দেখা যায় উমাইয়া শাসনের বিদ্রোহীরাও নবীর সুন্নতের প্রসঙ্গ তুলে নিজেদের অবস্থান কে শক্ত করছে। প্যাট্রিশিয়া ক্রোন এবং মার্টিন হিন্ডস সিদ্ধান্ত করেছেন যে পুরো সপ্তম শতাব্দী জুড়ে নবীজির সুন্নৎ শব্দবন্ধের কোনই অর্থ ছিল না। কেউ নবীর সুন্নৎ পালন করে এ কথার অর্থ সাধারণভাবে বোঝাত সেই ব্যক্তি খুব ভাল লোক, নির্দিষ্ট করে কিছুই বোঝাত না(Crone and Hinds, God’s Caliph)।কিন্তু এইভাবে বেশীদিন চলতে পারে না। অতি দ্রুত খিলাফৎকে সংহত করার প্রয়োজনে নবীর সুন্নাহ বলতে কি বোঝায় তা নির্দিষ্ট করার প্রয়োজন দেখা দিল, কারণ স্বঘোষিতভাবেই খিলাফৎ হল নবীর উত্তরাধিকারী। এই পদ্ধতিতে সমসাময়িক আরবের পৌরাণিক ধারণা, রীতি-নীতি, আচার-আচরণ আর্থ-সামায়িক পরিস্থিতিজনিত বাধ্যবাধকতা সবই হাদিস হিসাবে স্হায়ীভাবে ধর্মের অংশ হয়ে গেছে।

হাদিসকে গ্রহনযোগ্য করার জন্য এর সাথে সনদ অর্থ্যাৎ মুহম্মদের সমসাময়িক কাল থেকে হাদিস সংকলনের সময় পর্যন্ত বর্ণনাকারীদের নাম পরপর এর সাথে যুক্ত করা হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামিক স্কলারদের কাছে এই সনদই হল হাদিসের সত্যতা নির্ণয়ের একমাত্র মাপকাঠি। এখানে দুটি বিষয় বিবেচনা করার প্রয়োজন- প্রথমত, যদি জাল হাদিস বানানো সম্ভব হতে পারে তাহলে জাল সনদ বানানো আরো বেশী সম্ভব। বাস্তবে এটি প্রথমটির থেকে অনেক সোজা। দ্বিতীয়ত, বহুক্ষেত্রে একি হাদিসের অনেক রকম সনদ পাওয়া গেছে। এমন হাদিসও পাওয়া যায় যার প্রায় ৭০০ রকম সনদ আছে২। সনদ যে জাল করা হত এটি তার বড় প্রমান। তারপরেও যদি এক মূ্হুর্তের জন্য মেনে নেই যে হাদিসের সনদে উল্লিখিত সাহাবী ও পরবর্তী বর্ণনাকারীরা কেউ কাল্পনিক নন, তারা আসলেই তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হাদিসগুলি পৌঁছে দিতেন, এটা আদপেই বিশ্বাস যোগ্য নয় যে এইভাবে কোন লিখিত নথি ছাড়াই এত বিপুল পরিমান তথ্য দুই শতাব্দী ধরে কোন বিকৃতি ছাড়াই টিকে ছিল। অনেকে হয়ত এ প্রসঙ্গে প্রাচীন আরবদের কিংবদন্তীসুলভ স্মৃতিশক্তির কথা তুলবেন। এর উত্তরে বলা যায় এটা কোন নির্দিষ্ট মানুষের স্মরণশক্তির সমস্যা নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হাদিস প্রচলিত হতে থেকেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পালটেছে, নতুন নতুন প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, সর্বোপরি যারা হাদিস বর্ণনা করছেন তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও রাজনৈতিক আনুগত্য হাদিস সংকলনে কোন প্রভাব ফেলেনি এটা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। পরের পর্বে আমরা যখন হাদিস সংকলনের ঐতিহাসিক বিশ্লেসন করব তখন বিষয়টি আরো পরিস্কার হয়ে যাবে। আর আরবদের অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি মিথ ছাড়া কিছু না। ইসলামী বিবরণ থেকেই এটা অনায়াসে দেখানো যায়।
দেখা যায় মুহম্মদ নিজেই কোরানের আয়াত ভূলে যেতেন, যার উপর কিনা কোরান নাজিল হয়েছিল-
“আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা ও আবূ কুরায়ব (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) সুত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে এক ব্যাক্তিকে কুরআন তিলাওয়াত করে শুনালেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন! সে আমাকে অমুক অমুক আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যা অমুক সূরা থেকে আমি বাদ দিয়েলাম” (সহী মুসলিম, অধ্যায় ৭, হাদিস নং ১৭১০)




1. Ref. Patricia Crone and Martin Hinds: God’s Caliph: Religious Authority in the First Centuries of Islam.
2. বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কৃত বুখারী হাদিসের প্রথম খন্ডের ভূমিকা থেকে নেওয়া হয়েছে।


রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-৫

আদি ইসলামের কেন্দ্রীয় চরিত্র কে ছিলেন?

ইসলামের উদ্ভব যে আরব সাম্রাজ্যের বিস্তারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আমরা আগের পর্বেই সে বিষয়ে ঈঙ্গিত পেয়েছি। এই পর্বে আমরা সূচনাকালীন ইসলাম নিয়ে আলোচনা করব। সপ্তম শতাব্দীর আরব বিজেতারা যে কোরানের অনুপ্ররণা ও কথিত মুহম্মদের আদর্শকে ধারণ করে দুর্দমনীয় গতিতে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলল, আশ্চর্যের বিষয় সেই মুহম্মদ আর কোরানকেই সংশ্লিষ্ট সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাদের পাওয়া যায় তার বহু পরে লেখা এবং বিবরণীতে একমাত্র তার বহু পরে লেখা বিবরণীতে। এমন নয় যে সমসাময়িক প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনের অভাব আছে। আরব বিজেতাদের সবচেয়ে পুরানো যেসব মুদ্রা পাওয়া গেছে তাতে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ (bism  Allah অর্থাৎ আল্লাহর নামে) খোদিত রয়েছে। আল্লাহ হল ঈশ্বরের আরবী প্রতিশব্দ মাত্র। ইহুদী ও খৃষ্টান আরববাসীরাও তাদের ঈশ্বরকে আল্লাহ নামে ডেকে থাকে। অনান্য যেসব মুদ্রা পাওয়া গেছে তাতে ‘বিসমিল্লাহ রাব্বি’- অর্থাৎ আমার প্রভু আল্লার নামে, ‘রাব্বি আল্লাহ’- আমার প্রভু আল্লাহ, ‘বিসমিল্লাহ আল-মালিক’- মহাসম্রাট আল্লাহর নামে ইত্যাদী লেখা পাওয়া যায়। যদি আমরা এইসময়ের একটিও মুদ্রা পেতাম যেখানে ‘মুহম্মদ রাসুলাল্লাহ’ অর্থাৎ মু্হম্মদ আল্লার রাসুল- খোদিত  আছে, সেক্ষেত্রে আমরা অন্তত আংশিকভাবে (পুরোপুরি না হওয়ার কারণ পরে আলোচিত হবে) সাম্রাজ্যের ইসলামিক চরিত্র নিয়ে নিশ্চিত হতে পারতাম, কিন্তু সেইরকম একটিও পাওয়া যায় না।

৬৪৭-৬৫৮ এর মধ্যে মধ্যে ছাপানো একটি মুদ্রায় অবশ্য Muhammad  লিপিকৃত রয়েছে। কিন্তু এর উল্টো পিঠে মুশলিম শাসকের প্রতিকৃতি দেখা যায়। এই রকম বেশ কিছু মুদ্রা এর পর থেকে পাওয়া যেতে শুরু করে। ছবি বা মূর্তির ব্যাপারে ইসলামের প্রবল সংবেদনশীলতার কথা মনে রেখে এইসমস্ত লিপিকে মুসলিম শাসনের প্রমান হিসাবে মেনে নেওয়া শক্ত। বরং এটাই প্রতীয়মান হয় যে ওইসময় ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলি আদপেই প্রচলিত হয়নি। আদি ইসলামে মুহম্মদ বলতে প্রকৃতপক্ষে ইসলামের তথাকথিত নবীকে বোঝাত না, মুহম্মদ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘নিযুক্ত, প্রশংসিত জন’ বোঝাত। এইসমস্ত মুদ্রাগুলিতে প্রকৃতপক্ষে খলিফাকে ঈশ্বর দ্বারা নিযুক্ত/প্রশংসিত ব্যক্তি হিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, বেশ ভাল সংখ্যক মুদ্রায়   খলিফার একহাতে একটি ক্রুশ দেখা যায়।


মুয়াবিয়ার আমলের আর একটি লিপি পাওয়া গেছে প্যালেষ্টাইনের গাদারায়। এটি ৬৬২ খৃষ্টাব্দে একটি স্নানাগারের উপরে উৎকীর্ণ হয়েছিল। লিপিটি শুরু হচ্ছে একটি ক্রুশের চিহ্ন দিয়ে। মনে রাখা দরকার এটি ছিল সরকারি স্নানাগার, খলিফার নির্দেশেই লিপিটি উৎকীর্ণ হয়েছিল। তার প্রমান আমরা লিপিতেই পাই- এখানে  মুয়াবিয়াকে আল্লার দাস, রক্ষকদের নেতা ইত্যাদী অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে। মুয়াবিয়ার উত্তরসূরী প্রথম ইয়াজিদের(৬৮০-৬৮৩) মুদ্রাতেও একইভাবে খলিফার ক্রুশবহনকারী প্রতিমূর্তি পাওয়া যায়।

আমরা সবাই জানি ক্রুশ হল খৃষ্টান ধর্মের প্রতিকচিহ্ন। তবে কি আদি ইসলামিক খলিফারা নিজেদের খৃষ্টান শাসক বলে মনে করতেন? যদিও উমাইয়া খলিফারা  ধর্মীয় শিথিলতার জন্য ঈশ্বরহীন খলিফা নামে আখ্যায়িত হয়েছেন (বহু পরে রচিত ইসলামিক সূত্র আমাদের সেইরকমই জানায়); ধর্মের বিষয়ে শিথিলতা দেখানো এক বিষয় আর পুরোপুরি আলাদা ধর্মের প্রতিকচিহ্ন ধারণ করা সম্পূর্ন অন্য বিষয়। পাঠকরা নিশ্চই প্রশ্ন করবেন- যে তাহলে কখন নতুন ধর্ম ইসলামের উদ্ধব ঘটল, ইতিহাস আমাদের এই বিষয়ে কি বলে? প্রকৃতপক্ষে আবদ আল মালিকের (৬৮৫-৭০৫) রাজত্বকালের আগে কোনরকম জোরালো প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায় না যা খাঁটি ইসলামিক বলে গণ্য হতে পারে। আবদ আল মালিকের রাজত্বকালে নির্মিত Dome of the Rock মসজিদে (জেরুজালেমে অবস্থিত কুব্বাত আল-সাখরা)প্রাপ্ত লিপিই হল ইসলামিক ধর্মতত্বের প্রথম ঐতিহাসিক ঘোষনা। ৬৯১ সালে কৃত এই শিলালিপিটিতে কোরানের আয়াত খোদাই করা হয়েছে। মসজিদের  একটি অষ্টাভূজ তোরণের ভিতরের অংশে এই লেখটি উৎকীর্ণ আছে-

“পরম করুনাময় আল্লাহর নামে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ এক, তার কোন সঙ্গী নেই [কিছু অতিরিক্ত বক্তব্যের সাথে শাহাদার প্রথম অংশ] আধিপত্য তাহারই এবং প্রশংসা তাহারই, তিনি জীবনদান করেন ও তিনি মৃত্যু ঘটান এবং তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান  [সুরা তাগাবুনের ১ নং আয়াত ও সুরা হাদিদের ২নং আয়াতের কিছু অংশ মিশ্রিত] মুহম্মদ আল্লার বান্দা ও তার রাসুল [একটু পরিবর্তিতভাবে শাহাদার শেষ অংশ] আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাহার ফিরিসতারাও নবীকে অনুগ্রহ করেন, হে মুনিনগন, তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও [সুরা আহযাবের ৫৬ নং আয়াত সম্পূর্ন] আল্লাহর অনুগ্রহ তার উপর এবং তার উপরে শান্তি বর্ষিত হোক ও আল্লাহর করুণা থাকুক তার উপর [কোরানের অংশ নয়] হে আহলে-কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর শানে নিতান্ত সত্য ছাড়া কোন কথা বলো না। নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং রূহ-তাঁরই কাছ থেকে আগত। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রসূলগণকে মান্য কর। একথা বলো না যে,  তিন,  থাম; তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তান-সন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমান সমূহ ও যমীনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। মসীহ আল্লাহর বান্দা হবেন, তাতে তার কোন লজ্জাবোধ নেই এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাদেরও না। বস্তুতঃ যারা আল্লাহর দাসত্বে লজ্জাবোধ করবে এবং অহংকার করবে, তিনি তাদের সবাইকে নিজের কাছে সমবেত করবেন।[সুরা নিসা আয়াত ১৭১-৭২ সম্পূর্ন], হে আল্লাহ, আপনার রাসুল ও বান্দা মরিয়ম পুত্র ঈসাকে অনুগ্রহ করুন (অব্যয়ের চিহ্ন, পরবর্তী ভাষ্যকে সূচীত করে) তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক যেদিন তিনি জন্মলাভ করেছিলেন যেদিন তার মৃত্যু হয় এবং যেদিন তিনি পুনরুত্থিত হবেন [সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৩ সম্পূর্ন; শুধুমাত্র সর্বনাম পদগুলি উত্তম পুরুষ থেকে প্রথম পুরুষে পরিবর্তিত হয়েছে।] এই মারইয়ামের পুত্র ঈসা। সত্যকথা, যে সম্পর্কে লোকেরা বিতর্ক করে। আল্লাহ এমন নন যে, সন্তান গ্রহণ করবেন, তিনি পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, তিনি যখন কোন কাজ করা সিদ্ধান্ত করেন, তখন একথাই বলেনঃ হও এবং তা হয়ে যায়। [সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৪-৩৫ সম্পূর্ন] নিশ্চয় আল্লাহ আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তার এবাদত কর। এটা সরল পথ।[সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৬, সুরার শুরুতে একটি সংযোযক অব্যয় ‘এবং’ বাদ দেওয়া হয়েছে] আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম। এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ, যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি কুফরী করে তাদের জানা উচিত যে, নিশ্চিতরূপে আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত দ্রুত। [সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮-১৯ সম্পূর্ন]

যে বিষযটি চোখে না পড়েই পারে না তা হল এলোমেলোভাবে বিভিন্ন আয়াতের অংশ লিপিতে উঠে এসেছে। কোরান থেকে যদি সরাসরি লিপিকৃত করা হত তাহলে আমরা একই জায়গায় একটি সম্পূর্ন সুরা বা তার অংশবিশেষ পেতাম। ব্র্যাকেটের মধ্যের অংশগুলি মূল কোরানের সাথে এই লিপির পার্থক্য ও ঘনিষ্ঠতা বোঝাবার জন্য দেওয়া হয়েছে। কোরানের আয়াত বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে আমরা আজকে যে আকারে কোরানকে পাই তার সাথে বহু ছোটোখাটো পার্থক্য রয়েছে। হয়ত তুচ্ছ পার্থক্য এতে অর্থের পরিবর্তন ঘটছে না, কিন্তু মনে রাখা দরকার একজন মুসলিমের কাছে কোরান আল্লাহর বাণী। তাই একজন ধার্মিক মুসলিম জেনেশুনে কোরানের আয়াত পরিবর্তিত করছে এটা অচিন্তনীয়। সুতরাং মনে হয় ওই সময় পর্যন্ত্য কোরান (অন্তত আজকের আকারে) প্রচলিত ছিল না। কোরান চালু থাকলে কখনই আয়াতগুলি পরিবর্তিত আকারে আমরা পেতাম না। তবে কি এই লিপি থেকেই পরবর্তীকালে কোরানের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলি সংকলিত হয়। এই সম্ভাবনাটি যথেষ্ট বিচারযোগ্য বটে তবে গবেষক এসটেল হোয়েলান এই যুক্তির অসাড়তা দেখিয়েছেন। যদি কোরানের অংশবিশেষ এই শিলালিপি থেকে গৃহীত হয়ে থাকে তবে সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলি একেবারে এই লিপির আকারেই পাওয়ার কথা। সবচেয়ে বড় কথা হল-“আধিপত্য তাহারই এবং প্রশংসা তাহারই, তিনি জীবনদান করেন ও তিনি মৃত্যু ঘটান এবং তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান”- সেক্ষেত্রে এই লেখটির একটি অংশ এক সুরায় এবং অপর অংশ অন্য সুরায় ঢোকাবার কোনই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এটা অত্যন্ত অবিশ্বাস্য যে একই জায়গা থেকে নেওয়া এই বাক্যটিকে ভেঙে প্রথম অংশকে সুরা তাগাবুনে ঢোকানো হল আর পরেরটিকে সুরা হাদিদে ঢোকানো হল। এরপর আমাদের হাতে আর একটিমাত্র বিকল্প থাকে তা হল, কোরান এবং Dome of the Rock লিপি দুটিই কোন পূর্ববর্তী উৎস থেকে এসেছে; যেটির এখন আর কোন অস্তিত্ত নেই। উৎসাহী পাঠকদের কিছুটা নিরাশ করেই বিষযটি আপাতত স্থগিত রাখলাম, পরে কোরান আলোচনার সময়ে আবার এই প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাবে। এখন Dome of the Rock লিপির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টের দিকে নজর দেব।

মোট উৎকীর্ণ লিপির সামান্য অংশই তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও বারবার পড়লে দেখতে পাবেন যে Dome of the Rock লিপি আল্লাহর গুনকীর্তন ছাড়া মূলত বলতে চাইছে যে ঈসা নবী অর্থাৎ যীশু খৃষ্ট ঈশ্বর নন, তিনি ঈশ্বরের পুত্রও নন; তিনি আল্লাহর বান্দা ও সুসংবাদ দানকারী মাত্র। দেখলে মনে হবে যেন কোরানের ঈসা নবী সংক্রান্ত বক্তব্যগুলিই বেছে বেছে তুলে আনা হয়েছে। ঈসা নবীকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কি কারণ? পূর্বেই বলা হয়েছে মু্হম্মদ শব্দের আবিধানিক অর্থ হল নিযুক্ত/প্রশংসিত ব্যক্তি, যেটা প্রকৃতপক্ষে একটা উপাধি। আল-মুহম্মদ হল সঠিকভাবে আরবীতে প্রশংসিত ব্যক্তি। ক্রিস্তোফ লুক্সেমবার্গ নামে এক ভাষাবিদ দেখিয়েছেন আরবী নির্দেশক পদ ‘আল’ বাদ দিয়ে শুধু ‘মুহম্মদ’ শব্দটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। এতে করে “মুহম্মদ আল্লার বান্দা ও তার রাসুল” বাক্যটির অনেক বেশী যৌক্তিক অর্থ হয় -“(সকল) প্রশংসা আল্লার বান্দা ও রাসুলের”। তার মতে গোড়ায় মুহম্মদ শব্দটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য হিসাবেই ব্যবহার হত, পরবর্তীকালে কোরানের কয়েকটি আয়াতের উপর ভিত্তি করে এটি ব্যক্তিনাম হিসাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

তা নাহয় বোঝা গেল, কিন্তু আল্লাহর রসুল বা বার্তাবহনকারী কে? Dome of the Rock লিপি পরিস্কার উত্তর দিচ্ছে “নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল”। তবে কি ঈসা বা যীশু খৃষ্টই ছিলেন আদি ইসলামের কেন্দ্রীয় চরিত্র? চলুন এবার ইসলামিক সূত্রই অনুসন্ধান করি, না হলে মুনিন ভাইয়েরা গোঁসা করতে পারেন। মুহম্মদের প্রথম জীবনীকার ইবনে ইশাক লক্ষ্য করেছেন বাইবেলে ‘Munahhemana’ শব্দটি আছে যার অর্থ ‘The Comforter’(খৃস্টধর্মের হোলি ট্রিনিটির তিন অংশের এক অংশ)। ইবনে ইশাক বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার পর আমাদের জানাচ্ছেন “মুনাহেমানা, ঈশ্বর তাকে অনুগ্রহ ও রক্ষা করুন, সিরিয়াক ভাষায় হলেন মুহম্মদ; গ্রীক ভাষায় হলেন প্যারাক্লিট” সিরাত রসুল উল্লাহের ইংরাজী অনুবাদক Alfred Guillaume দেখিয়েছেন যে মুনাহেমানা এই শব্দটি দ্বারা প্রাচ্যের খৃষ্টীয় সাহিত্যে আদতে যীসু খৃস্টকে বোঝানো হত। অর্থাৎ মুনাহেমানা বা মুহম্মদ এই উপাধীটির আদি গ্রাহক ছিলেন যীশু খৃষ্ট। চুপি চুপি বলে রাখি খোদ কোরানেই ঈসার উল্লেখ আছে ২৫ বার, মুহম্মদ শব্দটি এসেছে মাত্র ৪ বার।

“হে আহলে-কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর শানে নিতান্ত সত্য ছাড়া কোন কথা বলো না। নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং রূহ-তাঁরই কাছ থেকে আগত। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রসূলগণকে মান্য কর। একথা বলো না যে,  তিন,  থাম; তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তান-সন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমান সমূহ ও যমীনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট”

তবে মনে রাখা দরকার খৃষ্টধর্মের শাথা হিসাবে আদি ইসলামের সূচনা হলেও এর সাথে রোমান ক্যাথলিসিজমের প্রবল বৈপরীত্য রয়েছে। বারবার যীশুর ঐশ্বরিকতা অস্বীকার করার প্রচেষ্টাতেই এটা পরিস্কার। উপরের লিপির অংশটি (যেটি একটি কোরানের আয়াতও বটে) ঈশ্বর তিন নন, ঈশ্বর এক ইত্যাদী বলে খৃষ্টধর্মের হোলি ট্রিনিটির ধারণাকে সরাসরি নাকচ করছে।







শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১৬

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মু্হম্মদ, পর্ব-৪

              ইতিহাসে ইসলামের অঙ্কুর ও ইসলামী ইতিহাসের সমস্যা

ইসলামী বিবরণের ঐতিহাসিকতা সন্দেহজনক হলেও, ইসলামের সাথে যুক্ত একটি বিষয় রয়েছে ইতিহাসে যার অস্তিত্ব সন্দেহাতীত। সেটা হল হিজরী সন। ৬২২ খৃষ্টাব্দে এই সনের সূচনা হয়, একে মুহম্মদের কথিত হিজরতের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। ৬২২ সালের কি বিশেষ কোন তাৎপর্য রয়েছে? এই বিষয়টি নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরেই ভাবছি। ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে যা পেলাম তা যথেষ্টই কৌতুহল সৃষ্টি করে। আসলে ইসলামের উত্থানের কারণ ও তাৎর্য বুঝতে গিয়ে ঐতিহাসিকরা সবসময়েই ধর্মীয় দিকের উপর জোর দিয়েছেন, সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অবহেলা করেছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাইজানটাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্য পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ চালিয়ে উভয়েই দুর্বল হয়ে পরে। ফলস্বরুপ, তার ঠিক পরেই মুসলিম আগ্রাসনকে আর তারা প্রতিরোধ করতে পারেনি। অধিকাংশ আধুনিক ঐতিহাসিক বিষয়টিকে ঠিক এইভাবে দেখেছেন। কিন্তু আমরা এরকম বায়বীয় বর্ননায় সন্তুষ্ট থাকব না। প্রকৃতঅর্থেই ওইসময় কি ঘটছিল ভালভাবে খতিয়ে দেখব। আমি ঐতিহাসিক ঘটনা যেমনভাবে ঘটে ছিল বা যেমনভাবে ঘটে থাকা থাকা সম্ভব ছিল ঠিক তেমনভাবেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এতে কোন কোন পাঠকের কাছে এই পর্বটি একটু অগোছালো মনে হতে পারে।

সাত শতাব্দী ধরে রোমান ও পারসিকদের মধ্যে যুদ্ধ চললেও তা চরম সীমায় পৌঁছোয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে (বাইজানটাইন-সাসানীয় যুদ্ধ ৬০২-৬২৮)। এই যুদ্ধের প্রথম দিকে সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খোসরৌ প্রচুর সাফল্য পেলেও যুদ্ধের শেষ হয় তার চরম পরাজয়ে। ৬০৯ খৃষ্টাব্দে সাসানীয়রা আর্মেনিয়া ও উত্তর মেসোপটেমিয়া বিধ্বস্ত করে গুরুত্বপূর্ণ রোমান নগরী এদেসা দখল করে নেয়। ৬১০ খৃস্টাব্দের মধ্যে পুরো আর্মেনিয়া তাদের হাতে চলে আসে। ৬১৩ খৃষ্টাব্দে দামাস্কাস, আপামিয়া ও এমেসা দখল করে সাসানীয় বাহিনী জেরুসালেমে ঢুকে ধংসযজ্ঞ চালায়। জানা যায় যে এই যুদ্ধে ইহুদীরা সাসানীয় বাহিনীকে সাহায্য করছিল। ৬১৫ তে তারা আনাতোলিয়ার রাজধানী আঙ্কারায় পৌছে যায়। ৬২১ সালে তারা মিশর দখল করে নেয়। ৬২২-২৩ খৃস্টাব্দের মধ্যে পূর্ব এজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলি তাদের হস্তগত হয়। ইতিমধ্যে খোসরৌর আহ্বানে সারা দিয়ে অৱার ও স্লাভরা উত্তর দিক থেকে বাইজানটাইন রাজধানী কনষ্টানটিনোপলের উপর আক্রমন চালাতে থাকে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এত শোচনীয় হয়ে ওঠে যে সম্রাট হিরাক্লিয়াস রাজধানী কার্থেজে সরিয়ে নেবার কথা ভাবতে শুরু করেন। 

এইখানেই ৬২২ সালের গুরুত্ব আমরা দেখতে পাই। প্রকৃতপক্ষে ধংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাওয়া বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের কাছে এটা ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর বছর। 
বাইজানটাইন সাম্রাজ্য রক্ষার যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে ধর্মযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল, প্রত্যেক খৃষ্টানকে ধর্মযুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহীত করা হয় ।সম্রাট তার নিজের পুত্র হেরাক্লিয়াস কনস্টানটাইন ও ধর্মগুরু সারজিয়াসের উপর রাজধানী রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে এশিয়া মাইনরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। হিরাক্লিয়াস যীশুর প্রতিক্রৃতি সামনে রেখে নিজে এই যুদ্ধের নেতৃ্ত্ব দেন। ঐতিহাসিক ওয়ালটার কেগীর মতে, হিরাক্লয়াসের সৈন্যসংখ্যা খুব সম্ভবত ২০,০০০ - ২৪,০০০ এর মধ্যে ছিল, খুব বেশী হলেও তা ৪০,০০০ এর বেশী হবে না।পারসীক বাহিনীকে পরাজিত করে প্রথমেই তিনি রোমান শৌর্য-বীর্যের প্রতিক আনাতোলিয়ার সিজারিয়া শহরটি দখল করেন। এরপর তিনি পারসীক অধিকৃত আর্মেনিয়ার উদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতে থাকেন। ইতিমধ্যে তিনি দ্বীগুন শক্তিশালী এক সাসানীয় বাহিনীর সম্মুখে পরেন। হিরাক্লিয়াসের বাইজানটাইন সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন কল্পনাই থেকে যেত যদি না এই সময়ে আরব উপজাতিদের এক বড় বাহিনী হিরাক্লিয়াসের সাহায্যে এগিয়ে না আসত। আরবদের সাহায্যেই হিরাক্লিয়াস পারসিক বাহিনীকে ধংস করেন। এরপর আরব ও হিরাক্লিয়াসের যৌথ বাহিনী রোমানদের হৃত এলাকা পুনরুদ্ধার করে এবং শেসপর্যন্ত্য ৬২৭ খৃষ্টাব্দে নিনেভের যুদ্ধে সাসানীয় শক্তির চরম বিপর্যয় ঘটে।

আমরা এইখানে ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালে আমাদের কাহিনীর নায়ক আরবদের নেপথ্য ভূমিকায় উঁকি মারতে দেখি। উত্তর আরবে এইসময় ছিল ঘাসানিদ নামে আরবদের এক উপজাতি জোট। তারা ছিল খৃষ্টান ধর্মের অনুসারী এবং বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের সাথে শক্তিশালী মিত্রতার বাঁধনে আবদ্ধ। আরো ভিতরে মধ্য আরবের মরু অঞ্চলে সম্ভবত কোনরুপ শিথিল ধরনের খৃষ্টান ধর্ম প্রচলিত ছিল (বিতর্কিত বিষয়, আমার ব্যক্তিগত মত এটি)। আরবরা কেন বাইজানটাইন-সাসানীয় যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল; কারণ এটা ছিল পুরো খৃষ্টান বিশ্বের ধর্মযুদ্ধ।  মোদ্দা কথা হল বহুল প্রচলিত বিশ্বাস যে ইসলাম পূর্ব যুগের আরবরা ছিল মুশরিক বা প্যাগান তার বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই। ইবনে ইশাকের বিবরণেই বহুবার আরবি খৃষ্টানদের উল্লেখ আছে। আমরা আগেই দেখেছি, বাইজানটাইন শক্তির চরম বিপদের দিনে আরবরা সাহায্যে এগিয়ে আসে। রোমান সেনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাসানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ চালায়। বহু স্কলার মনে করেন যে অাদি ইসলাম ছিল খৃষ্টধর্মের একটি শাখা অথবা ঘুরিয়ে বলা যায় খৃষ্টধর্মের একটি শাখা হিসাবেই ইসলামের অঙ্কুরোদগম হয়েছিল।(প্রথম পর্বের ক্রশবহনকারী মুসলিম খলিফা মুয়াবিয়াকে মনে আছে নিশ্চই!)। আমরা পরের পর্বেই এই বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হতে পারব। অতএব, এটাই বেশী সম্ভব যে আরবি খৃষ্টানদের মধ্য থেকেই ইসলামের উদ্ধব হয়েছিল, মূর্তিপূজক সর্বশ্বরবাদীদের মধ্য থেকে নয়।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত্য পারস্য জয় সংক্রান্ত ইসলামী বিবরণ প্রায় বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া হত। কিন্তু বর্তমানে অধ্যাপিকা Parvaneh Pourshariati তার অত্যন্ত বিশ্লেষনধর্মী আলোচনায় দেখিয়েছেন আরবরা ৬২৮-৬৩২ খৃষ্টাব্দের মধ্যেই পারস্য আক্রমন করে, ইসলামী বিবরণে যেমন রয়েছে সেরকম ৬৩৬ খৃষ্টাব্দে নয়। পুরো সাসানীয় সাম্রাজ্য দখল করতে স্বাভাবিকভাবেই প্রায় দুদশক লেগে গিয়েছিল কারণ প্রথমত, সাম্রাজ্যের বিশাল আয়তন; দ্বিতীয়ত ভূপ্রকৃতিগত কারণেই সাসানীয় সাম্রাজ্য দখল করা ছিল সময়সাপেক্ষ। সাম্রাজ্যের মধ্য অংশে ছিল বিশাল ইরানের মরুভূমি। সাসানীয় সামাজ্যের সবচেয়ে বড় প্রদেশ ছিল খোরাসান (বর্তমান আফগানিস্থান)। দুর্গম পাহাড়ী পথ অতিক্রম করে এখানে আক্রমন চালানো ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তবে কি আরবদের যুদ্ধপ্রচেষ্টা ৬২২ খৃষ্টাব্দেই সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সহযোগী হিসাবে শুরু হয়েছিল? এরপরে বাইজানটাইন সম্রাট নিজ দেশে ফিরে গেলে তারা স্বাধীনভাবে ৬২৮ খৃষ্টাব্দ থেকে দুর্বল সাসানীয় সাম্রাজ্যের উপর আক্রমন চালায়। এইভাবে সাসানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ইরাক দখলের মাধ্যমে তাদের জয়যাত্রা শুরু হয় যা পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে চলতে থাকবে। ৬২২ খৃষ্টাব্দের এই তাৎপর্যের কারণেই আরবরা এই সাল থেকে একটি অব্দ বা সন চালু করে থাকতে পারে। এইভাবেই সৃষ্টি হয় হিজরী সন; পরবর্তীকালে ইসলামের জন্মের পর যাকে মুহম্মদের কল্পিত হিজরতের সাথে জুড়ে দেওযা হয়েছে।আরবের মরু অঞ্চলে ওইসময় যে কিছু ঘটছিল তার কোন প্রমানই নেই। ইসলামী বিবরণ অনুযায়ী মুহম্মদ যদি প্রকৃতই ৬৫-১০০টি যুদ্ধ করে থাকতেন তবে তার কিছু না কিছু চিহ্ন অবশ্যই থাকার কথা। এমন নয় যে সমকালীন ঐতিহাসিক বিবরণে আরবের উল্লেখ নেই। কিন্তু কোথাও মুহম্মদ এমনকি ইসলামের নামগন্ধ নেই। আরব সাম্রাজ্য বহুদূর বিস্তৃত হওযার পরই হঠাৎ করেই যেন ইসলাম ও মুহম্মদ আবির্ভূত হয়।

রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস সম্পর্কে একটি হাদিস পাওয়া যায় যেটি আমার কাছে অত্যন্ত ঈঙ্গিতবাহী বলে মনে হয়েছে।

(সহী বুখারী, ওহীর সূচনা অধ্যায়, হাদিস নং ৬, অনেক বড় হাদিস; শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক অংশ দেওয়া হল।)
......তারপর হিরাকল তাদের বললেন, ‘ইনি (রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ) এ উম্মতের বাদশাহ। তিনি আবির্ভূত হয়েছেন।’ এরপর হিরাকল রোমে তাঁর বন্ধুর কাছে লিখলেন। তিনি জ্ঞানে তাঁর সমকক্ষ ছিলেন। পরে হিরাকল হিমস চলে গেলেন। হিমসে থাকতেই তাঁর কাছে তাঁর বন্ধুর চিঠি এলো, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আবির্ভাব এবং তিনিই যে প্রকৃত নবী, এ ব্যাপারে হিরাকলের মতকে সমর্থন করছিল। তাপর হিরাকল তাঁর হিমসের প্রাসাদে রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং প্রাসাদের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দলেন। দরজা বন্ধ করা হলো। তারপর তিনি সামনে এসে বললেন, ‘হে রোমবাসী! তোমরা কি কল্যাণ, হিদায়ত এবং তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চাও? তাহলে এই নবীর রায়’আত গ্রহণ কর।’ এ কথা শুনে তারা জংলী গাধার মত ঊর্ধ্বশ্বাসে দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু তারা তা বন্ধ অবস্থায় পেল। হিরাকল যখন তাদের অনীহা লক্ষ্য করলেন এবং তাদের ঈমান থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন বললেন, ‘ওদের আমার কাছে ফিরিয়ে আন।’ তিনি বললেন, ‘আমি একটু আগে যে কথা বলেছি, তা দিয়ে তোমরা তোমাদের দীনের উপর কতটুকু অটল, কেবল তার পরীক্ষা করেছিলাম। এখন আমি তা দেখে নিলাম।’ একথা শুনে তারা তাঁকে সিজদা করল এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলো। এই ছিল হিরাকল এর শেষ অবস্থা।

উপরোক্ত হাদিসে বাইজানটাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে একজন ইসলাম অনুরাগী ব্যক্তি হিসাবে দেখা যাচ্ছে। আবার আমারা ইতিহাস থেকে জানতে পারি যে হিরাক্লিয়াসের নেতৃত্বেই আরবরা তাদের যুদ্ধযাত্রা শুরু করে। দুয়ে দুয়ে চার করতে পারলেন কি?