সোমবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

মু্হম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-৬

হাদিসের হদিস

এই পর্বে আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় হল হাদিস। হাদিসগুলি যে ঐতিহাসিক আলোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বহীন সে বিষয়ে বহু আগে থেকেই নিয়ে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে স্কলাররা একমত। মুসলিম স্কলাররা সাধারণত প্রচলিত ষটি হাদিস সংকলনকে সসীহ বা অথেনটিক হিসাবে গ্রহন করেন, এগুলী হল- ইমাম বুখারীর (৮১০-৮৭০)সহী বুখারী, মুসলিম ইবনে আল-হা্জ্জাজের (৮২১-৮৮৭) সহী মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ (৮১৮-৮৮৯), সুনানে ইবনে মাজাহ (৮২৪-৮৮৭) তিরমিসির (৮২৪-৮৯২) জামি , ইবনে নাসাই (৮২৯-৯১৫) এর আস-সুনান আস সুঘ্রা। অবশ্য এর বাইরেও বহু সংখ্যক হাদিস সংকলন রয়েছে। স্পস্টতই দেখা যাচ্ছে যে সহী হাদিস সংকলকরা সবাই প্রায় মুহম্মদের কথিত সময়কালের দু শতক পরের মানুষ। ইসলামিক সূত্র প্রথম হাদিস সংকলক হিসাবে মালিক ইবনে আনাস (৭১৭-৭৯৫) নাম উল্লেখ করে, যার সংকলিত মুয়েত্তা এখনও ইসলামী আইনের-কানুনের প্রামান্য গ্রন্থ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর (৭৫৪-৭৭৫) এর আমলে সংকলিত এই মুয়েত্তা মুহম্মদের কথিত মৃত্যুর অন্তত চোদ্দ দশক পরে রচিত হয়েছিল। এর অর্থ হাদিসগুলি এর আগে কোন  লিখিত আকারে প্রচলিত ছিল না, মানুষের মুখে মুখে হয়ত বা প্রচলিত ছিল। যে কোন ঐতিহাসিক ঘটনা পৌরাণিক রূপ পরিগ্রহ করার পক্ষে দেড় শতাদ্বী যথেষ্ট ভাল সময়। ফলে মুহম্মদ যদি ঐতিহাসিক চরিত্র হয়েও থাকেন, দেড় শতাব্দী পরে লোকমুখে প্রচারিত গল্পের মাধ্যমে পৌরাণিক নবী হিসাবে পরিগণিত হতে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি। এই গাল-গল্পগুলিই পরবর্তীকালে হাদিস হিসাবে স্থান পেয়েছে।

হাদিস গবেষনা প্রসঙ্গে যার নাম না করলেই চলে না তিনি হলেন হাঙ্গেরীয়ান স্কলার ইগনাচ গোল্ডজিহের (22 June 1850 – 13 November 1921)। তার ধ্রুপদী গবেষনার উপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী গবেষকরা ইসলামী বিবরণের বিপরীতে ভিন্নভাবে ভাবতে পেরেছেন। আগ্রহী ব্যক্তিরা গোল্ডজিহেরের Muslim Studies  গ্রন্থটি পড়ে দেখবেন। এবার মূল কথায় আসি হাদিসগুলি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসাবে ঐতিহাসিকদের কাছে গ্রহনযোগ্য না হলেও ১৬০ কোটি মুসলিম এগুলীতে বিশ্বাস করেন। এত মানুষের বিশ্বাসের শক্তি বিরাট; তাই আমাদেরও হাদিস নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে। এত বিপুল সংখ্যক হাদিস রয়েছে, আর এই হাদিসের মধ্যে পরস্পরবিরোধী হাদিসের সংখ্যা এত বেশী যে আলেম-উলেমারাও হাদিস নিয়ে সমস্যায় পরে যান। এই কারণে মুসলিম পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় প্রায় সমস্ত বিতর্কিত ও অস্বস্তিকর হাদিসকে জাল ও জইফ হাদিস হিাসবে বাতিল করার চেষ্টা হয়েছে। চলেন এবার হাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ভাতের গল্প না করে হাত ঢুকিয়ে দু-চারটে ভাত টিপে দেখি। যেমন ধরেন:
মুহম্মদ কি আল্লাহকে দেখেছেন?-
১.উত্তর না
(সহী বুখারী, তাওহীদ অধ্যায়, হাদিস ৭০৩১)
“আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তোমাকে বলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় রবকে দেখেছেন, সে মিথ্যা বলল। কেননা আল্লাহ্ বলছেন, চক্ষু তাঁকে দেখতে পায় না। আর যে ব্যক্তি তোমাকে বলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েব জানেন, সেও মিথ্যা বলল। কেননা আল্লাহ্ বলেন, গায়িব জানেন একমাত্র আল্লাহ্। [৩২৩৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৮৬৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৮৬৬)”
২.-উত্তর হ্যাঁ
(সহী মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, হাদিস নং ৩২৪)
আবূ বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ (রহঃ) ..... আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে "নিশ্চয়ই তিনি (মুহম্মদ) তাকে (আল্লাকে) আরেকবার দেখেছিলেন"-

চলেন এরকম আরো একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজি: মু্হম্মদ উযুতে কতবার করে ধুতেন?
উত্তর- একবার “মুহম্মত ইবনে ইউসুফ(র)..... ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী এক উযুতে একবার করে ধুতেন”- (সহী বুখারী, উযু অধ্যায়, হাদিস ১৫৯)
উত্তর- দুবার “আবদুল্লাহ্ ইব্ন যায়দ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ‘নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উযূতে দু’বার করে ধুয়েছেন।“ (সহী বুখারী, উযু অধ্যায় হাদিস  (ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ) ১৬০)
উত্তর- তিনবার “হুমরান (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি ‘উসমান ইবনু আফ্ফান (রাযি.)-কে দেখেছেন যে, তিনি পানির পাত্র আনিয়ে উভয় হাতের তালুতে তিনবার ঢেলে তা ধুয়ে নিলেন। অতঃপর ডান হাত পাত্রের মধ্যে ঢুকালেন। তারপর কুলি করলেন ও নাকে পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করলেন। তারপর তাঁর মুখমন্ডল তিনবার ধুয়ে এবং দু’হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। অতঃপর মাথা মাসেহ করলেন। অতঃপর দুই পা টাখনু পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। পরে বললেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি আমার মত এ রকম উযূ করবে, অতঃপর দু’রাক‘আত সালাত আদায় করবে, যাতে দুনিয়ার কোন খেয়াল করবে না, তার পূর্বের গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (সহী বুখারী, উযু অধ্যায় হাদিস  (ইসলামী ফাউন্ডেশন) ১৬১)
এ হল মহাসমুদ্রের বিন্দু পরিমান নমুনা মাত্র।আর কেউ যদি শিয়া বিবরনের সঙ্গে সুন্নী বিবরণ মিলিয়ে দেখতে পারে তিনি বৈপরীত্যের পরিমান দেখে চমৎকৃত হয়ে যাবেন, তবে তার জন্য তার সুন্নী হাদিস সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকা প্রয়োজন। গবেষনুচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য  শিয়া সাইটের লিঙ্ক দিলাম - https://www.al-islam.org .

যে কোন রুচিশীল ভদ্রলোক যদি হাদিস পড়তে থাকেন, কিছুদূর গিয়েই ধাক্কা খাবেন। একটি হাদিসে দেখা যায় নবীজির দাসি উম আয়মান ভূলবশত নবীজির প্রস্রাব খেয়ে ফেলার পর নবীজিকে জানালে তিনি তাকে আস্বস্ত করেন:
Tabarani said: Hussain bin Is’haq al-Tustari informed us, who was informed by Uthman bin Abi Shaybah, who was informed by Shababah bin Sawwar, who was informed by Abu Malik al-Nakha’i who narrated from Aswad bin Qays, who narrated from Nubayh al-Anazi, who narrated from Umm Ayman, who said: ‘‘One night the Prophet got up and went to a side to urinate in the bowl. During the night, I rose and was thirsty so I drank whatever was in it and I did not even realize what it was. In the morning, He said, ‘Oh Umm Ayman! Throw away whatever is in the bowl’. I replied, ‘I drank what was in the bowl’. He thereafter smiled as such that His teeth appeared and said, ‘Beware! You will never have stomach pain’’.
(Tabarani Kabir 20740, Mustadrak al-Hakim 6912, Dalail al-Nubuwwah li-Isfahani 355)

আর একটি হাদিসে দেখা যায় মুহম্মদ তার পৌত্র হাসান ও হুসেনের লিঙ্গে চুমু খাচ্ছেন। (দ্রষ্টব্য- মাজমা আল জাওয়াইদ, ২৯৯/৯)। এরকম কুরুচিকর বর্ণনাসম্বলিত হাদিস গন্ডায় গন্ডায় পাওয়া যায়। রুচিশীল পাঠকদের আর ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে চাই না। একজন পৌরাণিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বাস্তব-অবাস্তব যত রকমের কল্পনা সম্ভব সবই স্থান পেয়েছে হাদিস গ্রন্থে। এখন এইপর্যন্ত্য আসার পরে প্রশ্ন আসতে বাধ্য এইরকম উদ্ধট হাদিসসমূহ ধর্মগ্রন্থ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেল কি করে- আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।

ইসলামী ধর্মতত্বে হাদিসের প্রথম কাজ হল কোরান ব্যাখ্যা করা। শনে নজুল নামক উপাদান হাদিসেই পাওয়া যায়, যার থেকে কোন পরিস্থিতিতে কোন আয়াত নাজিল হয়েছিল তা জানা যায়। কোরান অতিমাত্রায় দুর্বোধ্য, এলোমেলো একটি গ্রন্থ, তাফসিরের সাহায্য ছাড়া কোরান বুঝে পড়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। হাদিস যে বিবরণ দিচ্ছে তা যে সত্য তা আমরা বুঝব কি করে- প্রকৃতপক্ষে হাদিসের বর্ণনা ঐতিহাসিকভাবে যাচাই করার কোনই উপায় নেই। এর পরে কোরান আলোচনার সময় আমরা দেখব প্রকৃতপক্ষে ইসলামী স্কলাররা অনেক সময়ই বিভ্রান্ত হয়েছেন। কোরানের বহু সুরারই অনেক বেশী যৌক্তিক ব্যাখ্যা হাজির করা যদি আমরা ইসলামী বিবরণের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করি। ইসলামের প্রথম চার খলিফা কোন হাদিস সংকলন করেন নি। ইসলামী সূত্র আমাদের জানায় যে খলিফা উমর খলিফা যাবতীয় হাদিসসংকলন পুড়িয়ে ফেলেছিলেন; কারন তার মনে হয়েছিল হাদিস কোরানের প্রতিযোগী হয়ে যেতে পারে। তা হলে পরবর্তী মুসলিমরা এত এত হাদিস পেলেন কোথা থেকে?

আগের পর্বে আমরা দেখেছি আবদ-আল মালিকের(৬৮৫-৭০৫) রাজত্বকালের আগে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলি চালু হয়নি। উমাইয়া খলিফা আবদ-আল মালিক যার কথা আগের পর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনাকারী বিদ্রোহীদের আল্লা ও নবীর সুন্নাহ মানতে আহ্বান করেছিলেন।(1) যেখানে পূর্ববর্তী খলিফা মুয়াবিয়া উমরের সুন্নাহের উল্লেখ করেছেন (আল-ইয়াকুবী ২:২৬৪)।  এর থেকে মনে হতে পারে যে আবদ-আল মালিকের আমলে হাদিস প্রচারিত হয়ে গিয়েছিল এবং সেই সময়  নবীর সুন্নাহ রাষ্ট্রের আইন হিসাবে সংকলিত ও প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু দেখা যায় উমাইয়া শাসনের বিদ্রোহীরাও নবীর সুন্নতের প্রসঙ্গ তুলে নিজেদের অবস্থান কে শক্ত করছে। প্যাট্রিশিয়া ক্রোন এবং মার্টিন হিন্ডস সিদ্ধান্ত করেছেন যে পুরো সপ্তম শতাব্দী জুড়ে নবীজির সুন্নৎ শব্দবন্ধের কোনই অর্থ ছিল না। কেউ নবীর সুন্নৎ পালন করে এ কথার অর্থ সাধারণভাবে বোঝাত সেই ব্যক্তি খুব ভাল লোক, নির্দিষ্ট করে কিছুই বোঝাত না(Crone and Hinds, God’s Caliph)।কিন্তু এইভাবে বেশীদিন চলতে পারে না। অতি দ্রুত খিলাফৎকে সংহত করার প্রয়োজনে নবীর সুন্নাহ বলতে কি বোঝায় তা নির্দিষ্ট করার প্রয়োজন দেখা দিল, কারণ স্বঘোষিতভাবেই খিলাফৎ হল নবীর উত্তরাধিকারী। এই পদ্ধতিতে সমসাময়িক আরবের পৌরাণিক ধারণা, রীতি-নীতি, আচার-আচরণ আর্থ-সামায়িক পরিস্থিতিজনিত বাধ্যবাধকতা সবই হাদিস হিসাবে স্হায়ীভাবে ধর্মের অংশ হয়ে গেছে।

হাদিসকে গ্রহনযোগ্য করার জন্য এর সাথে সনদ অর্থ্যাৎ মুহম্মদের সমসাময়িক কাল থেকে হাদিস সংকলনের সময় পর্যন্ত বর্ণনাকারীদের নাম পরপর এর সাথে যুক্ত করা হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামিক স্কলারদের কাছে এই সনদই হল হাদিসের সত্যতা নির্ণয়ের একমাত্র মাপকাঠি। এখানে দুটি বিষয় বিবেচনা করার প্রয়োজন- প্রথমত, যদি জাল হাদিস বানানো সম্ভব হতে পারে তাহলে জাল সনদ বানানো আরো বেশী সম্ভব। বাস্তবে এটি প্রথমটির থেকে অনেক সোজা। দ্বিতীয়ত, বহুক্ষেত্রে একি হাদিসের অনেক রকম সনদ পাওয়া গেছে। এমন হাদিসও পাওয়া যায় যার প্রায় ৭০০ রকম সনদ আছে২। সনদ যে জাল করা হত এটি তার বড় প্রমান। তারপরেও যদি এক মূ্হুর্তের জন্য মেনে নেই যে হাদিসের সনদে উল্লিখিত সাহাবী ও পরবর্তী বর্ণনাকারীরা কেউ কাল্পনিক নন, তারা আসলেই তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হাদিসগুলি পৌঁছে দিতেন, এটা আদপেই বিশ্বাস যোগ্য নয় যে এইভাবে কোন লিখিত নথি ছাড়াই এত বিপুল পরিমান তথ্য দুই শতাব্দী ধরে কোন বিকৃতি ছাড়াই টিকে ছিল। অনেকে হয়ত এ প্রসঙ্গে প্রাচীন আরবদের কিংবদন্তীসুলভ স্মৃতিশক্তির কথা তুলবেন। এর উত্তরে বলা যায় এটা কোন নির্দিষ্ট মানুষের স্মরণশক্তির সমস্যা নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হাদিস প্রচলিত হতে থেকেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পালটেছে, নতুন নতুন প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, সর্বোপরি যারা হাদিস বর্ণনা করছেন তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও রাজনৈতিক আনুগত্য হাদিস সংকলনে কোন প্রভাব ফেলেনি এটা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। পরের পর্বে আমরা যখন হাদিস সংকলনের ঐতিহাসিক বিশ্লেসন করব তখন বিষয়টি আরো পরিস্কার হয়ে যাবে। আর আরবদের অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি মিথ ছাড়া কিছু না। ইসলামী বিবরণ থেকেই এটা অনায়াসে দেখানো যায়।
দেখা যায় মুহম্মদ নিজেই কোরানের আয়াত ভূলে যেতেন, যার উপর কিনা কোরান নাজিল হয়েছিল-
“আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা ও আবূ কুরায়ব (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) সুত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে এক ব্যাক্তিকে কুরআন তিলাওয়াত করে শুনালেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন! সে আমাকে অমুক অমুক আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যা অমুক সূরা থেকে আমি বাদ দিয়েলাম” (সহী মুসলিম, অধ্যায় ৭, হাদিস নং ১৭১০)




1. Ref. Patricia Crone and Martin Hinds: God’s Caliph: Religious Authority in the First Centuries of Islam.
2. বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কৃত বুখারী হাদিসের প্রথম খন্ডের ভূমিকা থেকে নেওয়া হয়েছে।


রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-৫

আদি ইসলামের কেন্দ্রীয় চরিত্র কে ছিলেন?

ইসলামের উদ্ভব যে আরব সাম্রাজ্যের বিস্তারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আমরা আগের পর্বেই সে বিষয়ে ঈঙ্গিত পেয়েছি। এই পর্বে আমরা সূচনাকালীন ইসলাম নিয়ে আলোচনা করব। সপ্তম শতাব্দীর আরব বিজেতারা যে কোরানের অনুপ্ররণা ও কথিত মুহম্মদের আদর্শকে ধারণ করে দুর্দমনীয় গতিতে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলল, আশ্চর্যের বিষয় সেই মুহম্মদ আর কোরানকেই সংশ্লিষ্ট সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাদের পাওয়া যায় তার বহু পরে লেখা এবং বিবরণীতে একমাত্র তার বহু পরে লেখা বিবরণীতে। এমন নয় যে সমসাময়িক প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনের অভাব আছে। আরব বিজেতাদের সবচেয়ে পুরানো যেসব মুদ্রা পাওয়া গেছে তাতে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ (bism  Allah অর্থাৎ আল্লাহর নামে) খোদিত রয়েছে। আল্লাহ হল ঈশ্বরের আরবী প্রতিশব্দ মাত্র। ইহুদী ও খৃষ্টান আরববাসীরাও তাদের ঈশ্বরকে আল্লাহ নামে ডেকে থাকে। অনান্য যেসব মুদ্রা পাওয়া গেছে তাতে ‘বিসমিল্লাহ রাব্বি’- অর্থাৎ আমার প্রভু আল্লার নামে, ‘রাব্বি আল্লাহ’- আমার প্রভু আল্লাহ, ‘বিসমিল্লাহ আল-মালিক’- মহাসম্রাট আল্লাহর নামে ইত্যাদী লেখা পাওয়া যায়। যদি আমরা এইসময়ের একটিও মুদ্রা পেতাম যেখানে ‘মুহম্মদ রাসুলাল্লাহ’ অর্থাৎ মু্হম্মদ আল্লার রাসুল- খোদিত  আছে, সেক্ষেত্রে আমরা অন্তত আংশিকভাবে (পুরোপুরি না হওয়ার কারণ পরে আলোচিত হবে) সাম্রাজ্যের ইসলামিক চরিত্র নিয়ে নিশ্চিত হতে পারতাম, কিন্তু সেইরকম একটিও পাওয়া যায় না।

৬৪৭-৬৫৮ এর মধ্যে মধ্যে ছাপানো একটি মুদ্রায় অবশ্য Muhammad  লিপিকৃত রয়েছে। কিন্তু এর উল্টো পিঠে মুশলিম শাসকের প্রতিকৃতি দেখা যায়। এই রকম বেশ কিছু মুদ্রা এর পর থেকে পাওয়া যেতে শুরু করে। ছবি বা মূর্তির ব্যাপারে ইসলামের প্রবল সংবেদনশীলতার কথা মনে রেখে এইসমস্ত লিপিকে মুসলিম শাসনের প্রমান হিসাবে মেনে নেওয়া শক্ত। বরং এটাই প্রতীয়মান হয় যে ওইসময় ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলি আদপেই প্রচলিত হয়নি। আদি ইসলামে মুহম্মদ বলতে প্রকৃতপক্ষে ইসলামের তথাকথিত নবীকে বোঝাত না, মুহম্মদ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘নিযুক্ত, প্রশংসিত জন’ বোঝাত। এইসমস্ত মুদ্রাগুলিতে প্রকৃতপক্ষে খলিফাকে ঈশ্বর দ্বারা নিযুক্ত/প্রশংসিত ব্যক্তি হিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, বেশ ভাল সংখ্যক মুদ্রায়   খলিফার একহাতে একটি ক্রুশ দেখা যায়।


মুয়াবিয়ার আমলের আর একটি লিপি পাওয়া গেছে প্যালেষ্টাইনের গাদারায়। এটি ৬৬২ খৃষ্টাব্দে একটি স্নানাগারের উপরে উৎকীর্ণ হয়েছিল। লিপিটি শুরু হচ্ছে একটি ক্রুশের চিহ্ন দিয়ে। মনে রাখা দরকার এটি ছিল সরকারি স্নানাগার, খলিফার নির্দেশেই লিপিটি উৎকীর্ণ হয়েছিল। তার প্রমান আমরা লিপিতেই পাই- এখানে  মুয়াবিয়াকে আল্লার দাস, রক্ষকদের নেতা ইত্যাদী অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে। মুয়াবিয়ার উত্তরসূরী প্রথম ইয়াজিদের(৬৮০-৬৮৩) মুদ্রাতেও একইভাবে খলিফার ক্রুশবহনকারী প্রতিমূর্তি পাওয়া যায়।

আমরা সবাই জানি ক্রুশ হল খৃষ্টান ধর্মের প্রতিকচিহ্ন। তবে কি আদি ইসলামিক খলিফারা নিজেদের খৃষ্টান শাসক বলে মনে করতেন? যদিও উমাইয়া খলিফারা  ধর্মীয় শিথিলতার জন্য ঈশ্বরহীন খলিফা নামে আখ্যায়িত হয়েছেন (বহু পরে রচিত ইসলামিক সূত্র আমাদের সেইরকমই জানায়); ধর্মের বিষয়ে শিথিলতা দেখানো এক বিষয় আর পুরোপুরি আলাদা ধর্মের প্রতিকচিহ্ন ধারণ করা সম্পূর্ন অন্য বিষয়। পাঠকরা নিশ্চই প্রশ্ন করবেন- যে তাহলে কখন নতুন ধর্ম ইসলামের উদ্ধব ঘটল, ইতিহাস আমাদের এই বিষয়ে কি বলে? প্রকৃতপক্ষে আবদ আল মালিকের (৬৮৫-৭০৫) রাজত্বকালের আগে কোনরকম জোরালো প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায় না যা খাঁটি ইসলামিক বলে গণ্য হতে পারে। আবদ আল মালিকের রাজত্বকালে নির্মিত Dome of the Rock মসজিদে (জেরুজালেমে অবস্থিত কুব্বাত আল-সাখরা)প্রাপ্ত লিপিই হল ইসলামিক ধর্মতত্বের প্রথম ঐতিহাসিক ঘোষনা। ৬৯১ সালে কৃত এই শিলালিপিটিতে কোরানের আয়াত খোদাই করা হয়েছে। মসজিদের  একটি অষ্টাভূজ তোরণের ভিতরের অংশে এই লেখটি উৎকীর্ণ আছে-

“পরম করুনাময় আল্লাহর নামে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ এক, তার কোন সঙ্গী নেই [কিছু অতিরিক্ত বক্তব্যের সাথে শাহাদার প্রথম অংশ] আধিপত্য তাহারই এবং প্রশংসা তাহারই, তিনি জীবনদান করেন ও তিনি মৃত্যু ঘটান এবং তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান  [সুরা তাগাবুনের ১ নং আয়াত ও সুরা হাদিদের ২নং আয়াতের কিছু অংশ মিশ্রিত] মুহম্মদ আল্লার বান্দা ও তার রাসুল [একটু পরিবর্তিতভাবে শাহাদার শেষ অংশ] আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাহার ফিরিসতারাও নবীকে অনুগ্রহ করেন, হে মুনিনগন, তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও [সুরা আহযাবের ৫৬ নং আয়াত সম্পূর্ন] আল্লাহর অনুগ্রহ তার উপর এবং তার উপরে শান্তি বর্ষিত হোক ও আল্লাহর করুণা থাকুক তার উপর [কোরানের অংশ নয়] হে আহলে-কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর শানে নিতান্ত সত্য ছাড়া কোন কথা বলো না। নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং রূহ-তাঁরই কাছ থেকে আগত। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রসূলগণকে মান্য কর। একথা বলো না যে,  তিন,  থাম; তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তান-সন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমান সমূহ ও যমীনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। মসীহ আল্লাহর বান্দা হবেন, তাতে তার কোন লজ্জাবোধ নেই এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাদেরও না। বস্তুতঃ যারা আল্লাহর দাসত্বে লজ্জাবোধ করবে এবং অহংকার করবে, তিনি তাদের সবাইকে নিজের কাছে সমবেত করবেন।[সুরা নিসা আয়াত ১৭১-৭২ সম্পূর্ন], হে আল্লাহ, আপনার রাসুল ও বান্দা মরিয়ম পুত্র ঈসাকে অনুগ্রহ করুন (অব্যয়ের চিহ্ন, পরবর্তী ভাষ্যকে সূচীত করে) তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক যেদিন তিনি জন্মলাভ করেছিলেন যেদিন তার মৃত্যু হয় এবং যেদিন তিনি পুনরুত্থিত হবেন [সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৩ সম্পূর্ন; শুধুমাত্র সর্বনাম পদগুলি উত্তম পুরুষ থেকে প্রথম পুরুষে পরিবর্তিত হয়েছে।] এই মারইয়ামের পুত্র ঈসা। সত্যকথা, যে সম্পর্কে লোকেরা বিতর্ক করে। আল্লাহ এমন নন যে, সন্তান গ্রহণ করবেন, তিনি পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, তিনি যখন কোন কাজ করা সিদ্ধান্ত করেন, তখন একথাই বলেনঃ হও এবং তা হয়ে যায়। [সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৪-৩৫ সম্পূর্ন] নিশ্চয় আল্লাহ আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তার এবাদত কর। এটা সরল পথ।[সুরা মরিয়ম, আয়াত ৩৬, সুরার শুরুতে একটি সংযোযক অব্যয় ‘এবং’ বাদ দেওয়া হয়েছে] আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম। এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ, যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি কুফরী করে তাদের জানা উচিত যে, নিশ্চিতরূপে আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত দ্রুত। [সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮-১৯ সম্পূর্ন]

যে বিষযটি চোখে না পড়েই পারে না তা হল এলোমেলোভাবে বিভিন্ন আয়াতের অংশ লিপিতে উঠে এসেছে। কোরান থেকে যদি সরাসরি লিপিকৃত করা হত তাহলে আমরা একই জায়গায় একটি সম্পূর্ন সুরা বা তার অংশবিশেষ পেতাম। ব্র্যাকেটের মধ্যের অংশগুলি মূল কোরানের সাথে এই লিপির পার্থক্য ও ঘনিষ্ঠতা বোঝাবার জন্য দেওয়া হয়েছে। কোরানের আয়াত বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে আমরা আজকে যে আকারে কোরানকে পাই তার সাথে বহু ছোটোখাটো পার্থক্য রয়েছে। হয়ত তুচ্ছ পার্থক্য এতে অর্থের পরিবর্তন ঘটছে না, কিন্তু মনে রাখা দরকার একজন মুসলিমের কাছে কোরান আল্লাহর বাণী। তাই একজন ধার্মিক মুসলিম জেনেশুনে কোরানের আয়াত পরিবর্তিত করছে এটা অচিন্তনীয়। সুতরাং মনে হয় ওই সময় পর্যন্ত্য কোরান (অন্তত আজকের আকারে) প্রচলিত ছিল না। কোরান চালু থাকলে কখনই আয়াতগুলি পরিবর্তিত আকারে আমরা পেতাম না। তবে কি এই লিপি থেকেই পরবর্তীকালে কোরানের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলি সংকলিত হয়। এই সম্ভাবনাটি যথেষ্ট বিচারযোগ্য বটে তবে গবেষক এসটেল হোয়েলান এই যুক্তির অসাড়তা দেখিয়েছেন। যদি কোরানের অংশবিশেষ এই শিলালিপি থেকে গৃহীত হয়ে থাকে তবে সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলি একেবারে এই লিপির আকারেই পাওয়ার কথা। সবচেয়ে বড় কথা হল-“আধিপত্য তাহারই এবং প্রশংসা তাহারই, তিনি জীবনদান করেন ও তিনি মৃত্যু ঘটান এবং তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান”- সেক্ষেত্রে এই লেখটির একটি অংশ এক সুরায় এবং অপর অংশ অন্য সুরায় ঢোকাবার কোনই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এটা অত্যন্ত অবিশ্বাস্য যে একই জায়গা থেকে নেওয়া এই বাক্যটিকে ভেঙে প্রথম অংশকে সুরা তাগাবুনে ঢোকানো হল আর পরেরটিকে সুরা হাদিদে ঢোকানো হল। এরপর আমাদের হাতে আর একটিমাত্র বিকল্প থাকে তা হল, কোরান এবং Dome of the Rock লিপি দুটিই কোন পূর্ববর্তী উৎস থেকে এসেছে; যেটির এখন আর কোন অস্তিত্ত নেই। উৎসাহী পাঠকদের কিছুটা নিরাশ করেই বিষযটি আপাতত স্থগিত রাখলাম, পরে কোরান আলোচনার সময়ে আবার এই প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাবে। এখন Dome of the Rock লিপির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টের দিকে নজর দেব।

মোট উৎকীর্ণ লিপির সামান্য অংশই তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও বারবার পড়লে দেখতে পাবেন যে Dome of the Rock লিপি আল্লাহর গুনকীর্তন ছাড়া মূলত বলতে চাইছে যে ঈসা নবী অর্থাৎ যীশু খৃষ্ট ঈশ্বর নন, তিনি ঈশ্বরের পুত্রও নন; তিনি আল্লাহর বান্দা ও সুসংবাদ দানকারী মাত্র। দেখলে মনে হবে যেন কোরানের ঈসা নবী সংক্রান্ত বক্তব্যগুলিই বেছে বেছে তুলে আনা হয়েছে। ঈসা নবীকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কি কারণ? পূর্বেই বলা হয়েছে মু্হম্মদ শব্দের আবিধানিক অর্থ হল নিযুক্ত/প্রশংসিত ব্যক্তি, যেটা প্রকৃতপক্ষে একটা উপাধি। আল-মুহম্মদ হল সঠিকভাবে আরবীতে প্রশংসিত ব্যক্তি। ক্রিস্তোফ লুক্সেমবার্গ নামে এক ভাষাবিদ দেখিয়েছেন আরবী নির্দেশক পদ ‘আল’ বাদ দিয়ে শুধু ‘মুহম্মদ’ শব্দটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। এতে করে “মুহম্মদ আল্লার বান্দা ও তার রাসুল” বাক্যটির অনেক বেশী যৌক্তিক অর্থ হয় -“(সকল) প্রশংসা আল্লার বান্দা ও রাসুলের”। তার মতে গোড়ায় মুহম্মদ শব্দটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য হিসাবেই ব্যবহার হত, পরবর্তীকালে কোরানের কয়েকটি আয়াতের উপর ভিত্তি করে এটি ব্যক্তিনাম হিসাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

তা নাহয় বোঝা গেল, কিন্তু আল্লাহর রসুল বা বার্তাবহনকারী কে? Dome of the Rock লিপি পরিস্কার উত্তর দিচ্ছে “নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল”। তবে কি ঈসা বা যীশু খৃষ্টই ছিলেন আদি ইসলামের কেন্দ্রীয় চরিত্র? চলুন এবার ইসলামিক সূত্রই অনুসন্ধান করি, না হলে মুনিন ভাইয়েরা গোঁসা করতে পারেন। মুহম্মদের প্রথম জীবনীকার ইবনে ইশাক লক্ষ্য করেছেন বাইবেলে ‘Munahhemana’ শব্দটি আছে যার অর্থ ‘The Comforter’(খৃস্টধর্মের হোলি ট্রিনিটির তিন অংশের এক অংশ)। ইবনে ইশাক বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার পর আমাদের জানাচ্ছেন “মুনাহেমানা, ঈশ্বর তাকে অনুগ্রহ ও রক্ষা করুন, সিরিয়াক ভাষায় হলেন মুহম্মদ; গ্রীক ভাষায় হলেন প্যারাক্লিট” সিরাত রসুল উল্লাহের ইংরাজী অনুবাদক Alfred Guillaume দেখিয়েছেন যে মুনাহেমানা এই শব্দটি দ্বারা প্রাচ্যের খৃষ্টীয় সাহিত্যে আদতে যীসু খৃস্টকে বোঝানো হত। অর্থাৎ মুনাহেমানা বা মুহম্মদ এই উপাধীটির আদি গ্রাহক ছিলেন যীশু খৃষ্ট। চুপি চুপি বলে রাখি খোদ কোরানেই ঈসার উল্লেখ আছে ২৫ বার, মুহম্মদ শব্দটি এসেছে মাত্র ৪ বার।

“হে আহলে-কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর শানে নিতান্ত সত্য ছাড়া কোন কথা বলো না। নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং রূহ-তাঁরই কাছ থেকে আগত। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রসূলগণকে মান্য কর। একথা বলো না যে,  তিন,  থাম; তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তান-সন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমান সমূহ ও যমীনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট”

তবে মনে রাখা দরকার খৃষ্টধর্মের শাথা হিসাবে আদি ইসলামের সূচনা হলেও এর সাথে রোমান ক্যাথলিসিজমের প্রবল বৈপরীত্য রয়েছে। বারবার যীশুর ঐশ্বরিকতা অস্বীকার করার প্রচেষ্টাতেই এটা পরিস্কার। উপরের লিপির অংশটি (যেটি একটি কোরানের আয়াতও বটে) ঈশ্বর তিন নন, ঈশ্বর এক ইত্যাদী বলে খৃষ্টধর্মের হোলি ট্রিনিটির ধারণাকে সরাসরি নাকচ করছে।







শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১৬

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মু্হম্মদ, পর্ব-৪

              ইতিহাসে ইসলামের অঙ্কুর ও ইসলামী ইতিহাসের সমস্যা

ইসলামী বিবরণের ঐতিহাসিকতা সন্দেহজনক হলেও, ইসলামের সাথে যুক্ত একটি বিষয় রয়েছে ইতিহাসে যার অস্তিত্ব সন্দেহাতীত। সেটা হল হিজরী সন। ৬২২ খৃষ্টাব্দে এই সনের সূচনা হয়, একে মুহম্মদের কথিত হিজরতের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। ৬২২ সালের কি বিশেষ কোন তাৎপর্য রয়েছে? এই বিষয়টি নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরেই ভাবছি। ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে যা পেলাম তা যথেষ্টই কৌতুহল সৃষ্টি করে। আসলে ইসলামের উত্থানের কারণ ও তাৎর্য বুঝতে গিয়ে ঐতিহাসিকরা সবসময়েই ধর্মীয় দিকের উপর জোর দিয়েছেন, সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অবহেলা করেছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাইজানটাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্য পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ চালিয়ে উভয়েই দুর্বল হয়ে পরে। ফলস্বরুপ, তার ঠিক পরেই মুসলিম আগ্রাসনকে আর তারা প্রতিরোধ করতে পারেনি। অধিকাংশ আধুনিক ঐতিহাসিক বিষয়টিকে ঠিক এইভাবে দেখেছেন। কিন্তু আমরা এরকম বায়বীয় বর্ননায় সন্তুষ্ট থাকব না। প্রকৃতঅর্থেই ওইসময় কি ঘটছিল ভালভাবে খতিয়ে দেখব। আমি ঐতিহাসিক ঘটনা যেমনভাবে ঘটে ছিল বা যেমনভাবে ঘটে থাকা থাকা সম্ভব ছিল ঠিক তেমনভাবেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এতে কোন কোন পাঠকের কাছে এই পর্বটি একটু অগোছালো মনে হতে পারে।

সাত শতাব্দী ধরে রোমান ও পারসিকদের মধ্যে যুদ্ধ চললেও তা চরম সীমায় পৌঁছোয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে (বাইজানটাইন-সাসানীয় যুদ্ধ ৬০২-৬২৮)। এই যুদ্ধের প্রথম দিকে সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খোসরৌ প্রচুর সাফল্য পেলেও যুদ্ধের শেষ হয় তার চরম পরাজয়ে। ৬০৯ খৃষ্টাব্দে সাসানীয়রা আর্মেনিয়া ও উত্তর মেসোপটেমিয়া বিধ্বস্ত করে গুরুত্বপূর্ণ রোমান নগরী এদেসা দখল করে নেয়। ৬১০ খৃস্টাব্দের মধ্যে পুরো আর্মেনিয়া তাদের হাতে চলে আসে। ৬১৩ খৃষ্টাব্দে দামাস্কাস, আপামিয়া ও এমেসা দখল করে সাসানীয় বাহিনী জেরুসালেমে ঢুকে ধংসযজ্ঞ চালায়। জানা যায় যে এই যুদ্ধে ইহুদীরা সাসানীয় বাহিনীকে সাহায্য করছিল। ৬১৫ তে তারা আনাতোলিয়ার রাজধানী আঙ্কারায় পৌছে যায়। ৬২১ সালে তারা মিশর দখল করে নেয়। ৬২২-২৩ খৃস্টাব্দের মধ্যে পূর্ব এজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলি তাদের হস্তগত হয়। ইতিমধ্যে খোসরৌর আহ্বানে সারা দিয়ে অৱার ও স্লাভরা উত্তর দিক থেকে বাইজানটাইন রাজধানী কনষ্টানটিনোপলের উপর আক্রমন চালাতে থাকে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এত শোচনীয় হয়ে ওঠে যে সম্রাট হিরাক্লিয়াস রাজধানী কার্থেজে সরিয়ে নেবার কথা ভাবতে শুরু করেন। 

এইখানেই ৬২২ সালের গুরুত্ব আমরা দেখতে পাই। প্রকৃতপক্ষে ধংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাওয়া বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের কাছে এটা ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর বছর। 
বাইজানটাইন সাম্রাজ্য রক্ষার যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে ধর্মযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল, প্রত্যেক খৃষ্টানকে ধর্মযুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহীত করা হয় ।সম্রাট তার নিজের পুত্র হেরাক্লিয়াস কনস্টানটাইন ও ধর্মগুরু সারজিয়াসের উপর রাজধানী রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে এশিয়া মাইনরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। হিরাক্লিয়াস যীশুর প্রতিক্রৃতি সামনে রেখে নিজে এই যুদ্ধের নেতৃ্ত্ব দেন। ঐতিহাসিক ওয়ালটার কেগীর মতে, হিরাক্লয়াসের সৈন্যসংখ্যা খুব সম্ভবত ২০,০০০ - ২৪,০০০ এর মধ্যে ছিল, খুব বেশী হলেও তা ৪০,০০০ এর বেশী হবে না।পারসীক বাহিনীকে পরাজিত করে প্রথমেই তিনি রোমান শৌর্য-বীর্যের প্রতিক আনাতোলিয়ার সিজারিয়া শহরটি দখল করেন। এরপর তিনি পারসীক অধিকৃত আর্মেনিয়ার উদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতে থাকেন। ইতিমধ্যে তিনি দ্বীগুন শক্তিশালী এক সাসানীয় বাহিনীর সম্মুখে পরেন। হিরাক্লিয়াসের বাইজানটাইন সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন কল্পনাই থেকে যেত যদি না এই সময়ে আরব উপজাতিদের এক বড় বাহিনী হিরাক্লিয়াসের সাহায্যে এগিয়ে না আসত। আরবদের সাহায্যেই হিরাক্লিয়াস পারসিক বাহিনীকে ধংস করেন। এরপর আরব ও হিরাক্লিয়াসের যৌথ বাহিনী রোমানদের হৃত এলাকা পুনরুদ্ধার করে এবং শেসপর্যন্ত্য ৬২৭ খৃষ্টাব্দে নিনেভের যুদ্ধে সাসানীয় শক্তির চরম বিপর্যয় ঘটে।

আমরা এইখানে ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালে আমাদের কাহিনীর নায়ক আরবদের নেপথ্য ভূমিকায় উঁকি মারতে দেখি। উত্তর আরবে এইসময় ছিল ঘাসানিদ নামে আরবদের এক উপজাতি জোট। তারা ছিল খৃষ্টান ধর্মের অনুসারী এবং বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের সাথে শক্তিশালী মিত্রতার বাঁধনে আবদ্ধ। আরো ভিতরে মধ্য আরবের মরু অঞ্চলে সম্ভবত কোনরুপ শিথিল ধরনের খৃষ্টান ধর্ম প্রচলিত ছিল (বিতর্কিত বিষয়, আমার ব্যক্তিগত মত এটি)। আরবরা কেন বাইজানটাইন-সাসানীয় যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল; কারণ এটা ছিল পুরো খৃষ্টান বিশ্বের ধর্মযুদ্ধ।  মোদ্দা কথা হল বহুল প্রচলিত বিশ্বাস যে ইসলাম পূর্ব যুগের আরবরা ছিল মুশরিক বা প্যাগান তার বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই। ইবনে ইশাকের বিবরণেই বহুবার আরবি খৃষ্টানদের উল্লেখ আছে। আমরা আগেই দেখেছি, বাইজানটাইন শক্তির চরম বিপদের দিনে আরবরা সাহায্যে এগিয়ে আসে। রোমান সেনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাসানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ চালায়। বহু স্কলার মনে করেন যে অাদি ইসলাম ছিল খৃষ্টধর্মের একটি শাখা অথবা ঘুরিয়ে বলা যায় খৃষ্টধর্মের একটি শাখা হিসাবেই ইসলামের অঙ্কুরোদগম হয়েছিল।(প্রথম পর্বের ক্রশবহনকারী মুসলিম খলিফা মুয়াবিয়াকে মনে আছে নিশ্চই!)। আমরা পরের পর্বেই এই বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হতে পারব। অতএব, এটাই বেশী সম্ভব যে আরবি খৃষ্টানদের মধ্য থেকেই ইসলামের উদ্ধব হয়েছিল, মূর্তিপূজক সর্বশ্বরবাদীদের মধ্য থেকে নয়।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত্য পারস্য জয় সংক্রান্ত ইসলামী বিবরণ প্রায় বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া হত। কিন্তু বর্তমানে অধ্যাপিকা Parvaneh Pourshariati তার অত্যন্ত বিশ্লেষনধর্মী আলোচনায় দেখিয়েছেন আরবরা ৬২৮-৬৩২ খৃষ্টাব্দের মধ্যেই পারস্য আক্রমন করে, ইসলামী বিবরণে যেমন রয়েছে সেরকম ৬৩৬ খৃষ্টাব্দে নয়। পুরো সাসানীয় সাম্রাজ্য দখল করতে স্বাভাবিকভাবেই প্রায় দুদশক লেগে গিয়েছিল কারণ প্রথমত, সাম্রাজ্যের বিশাল আয়তন; দ্বিতীয়ত ভূপ্রকৃতিগত কারণেই সাসানীয় সাম্রাজ্য দখল করা ছিল সময়সাপেক্ষ। সাম্রাজ্যের মধ্য অংশে ছিল বিশাল ইরানের মরুভূমি। সাসানীয় সামাজ্যের সবচেয়ে বড় প্রদেশ ছিল খোরাসান (বর্তমান আফগানিস্থান)। দুর্গম পাহাড়ী পথ অতিক্রম করে এখানে আক্রমন চালানো ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তবে কি আরবদের যুদ্ধপ্রচেষ্টা ৬২২ খৃষ্টাব্দেই সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সহযোগী হিসাবে শুরু হয়েছিল? এরপরে বাইজানটাইন সম্রাট নিজ দেশে ফিরে গেলে তারা স্বাধীনভাবে ৬২৮ খৃষ্টাব্দ থেকে দুর্বল সাসানীয় সাম্রাজ্যের উপর আক্রমন চালায়। এইভাবে সাসানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ইরাক দখলের মাধ্যমে তাদের জয়যাত্রা শুরু হয় যা পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে চলতে থাকবে। ৬২২ খৃষ্টাব্দের এই তাৎপর্যের কারণেই আরবরা এই সাল থেকে একটি অব্দ বা সন চালু করে থাকতে পারে। এইভাবেই সৃষ্টি হয় হিজরী সন; পরবর্তীকালে ইসলামের জন্মের পর যাকে মুহম্মদের কল্পিত হিজরতের সাথে জুড়ে দেওযা হয়েছে।আরবের মরু অঞ্চলে ওইসময় যে কিছু ঘটছিল তার কোন প্রমানই নেই। ইসলামী বিবরণ অনুযায়ী মুহম্মদ যদি প্রকৃতই ৬৫-১০০টি যুদ্ধ করে থাকতেন তবে তার কিছু না কিছু চিহ্ন অবশ্যই থাকার কথা। এমন নয় যে সমকালীন ঐতিহাসিক বিবরণে আরবের উল্লেখ নেই। কিন্তু কোথাও মুহম্মদ এমনকি ইসলামের নামগন্ধ নেই। আরব সাম্রাজ্য বহুদূর বিস্তৃত হওযার পরই হঠাৎ করেই যেন ইসলাম ও মুহম্মদ আবির্ভূত হয়।

রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস সম্পর্কে একটি হাদিস পাওয়া যায় যেটি আমার কাছে অত্যন্ত ঈঙ্গিতবাহী বলে মনে হয়েছে।

(সহী বুখারী, ওহীর সূচনা অধ্যায়, হাদিস নং ৬, অনেক বড় হাদিস; শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক অংশ দেওয়া হল।)
......তারপর হিরাকল তাদের বললেন, ‘ইনি (রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ) এ উম্মতের বাদশাহ। তিনি আবির্ভূত হয়েছেন।’ এরপর হিরাকল রোমে তাঁর বন্ধুর কাছে লিখলেন। তিনি জ্ঞানে তাঁর সমকক্ষ ছিলেন। পরে হিরাকল হিমস চলে গেলেন। হিমসে থাকতেই তাঁর কাছে তাঁর বন্ধুর চিঠি এলো, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আবির্ভাব এবং তিনিই যে প্রকৃত নবী, এ ব্যাপারে হিরাকলের মতকে সমর্থন করছিল। তাপর হিরাকল তাঁর হিমসের প্রাসাদে রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং প্রাসাদের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দলেন। দরজা বন্ধ করা হলো। তারপর তিনি সামনে এসে বললেন, ‘হে রোমবাসী! তোমরা কি কল্যাণ, হিদায়ত এবং তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চাও? তাহলে এই নবীর রায়’আত গ্রহণ কর।’ এ কথা শুনে তারা জংলী গাধার মত ঊর্ধ্বশ্বাসে দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু তারা তা বন্ধ অবস্থায় পেল। হিরাকল যখন তাদের অনীহা লক্ষ্য করলেন এবং তাদের ঈমান থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন বললেন, ‘ওদের আমার কাছে ফিরিয়ে আন।’ তিনি বললেন, ‘আমি একটু আগে যে কথা বলেছি, তা দিয়ে তোমরা তোমাদের দীনের উপর কতটুকু অটল, কেবল তার পরীক্ষা করেছিলাম। এখন আমি তা দেখে নিলাম।’ একথা শুনে তারা তাঁকে সিজদা করল এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলো। এই ছিল হিরাকল এর শেষ অবস্থা।

উপরোক্ত হাদিসে বাইজানটাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে একজন ইসলাম অনুরাগী ব্যক্তি হিসাবে দেখা যাচ্ছে। আবার আমারা ইতিহাস থেকে জানতে পারি যে হিরাক্লিয়াসের নেতৃত্বেই আরবরা তাদের যুদ্ধযাত্রা শুরু করে। দুয়ে দুয়ে চার করতে পারলেন কি?

শনিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৬

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-৩

অমুসলিম উৎসে ইসলাম ও মুহম্মদের উল্লেখ

টেকনিক্যাল আলোচনায় ঢোকার আগে প্রথমেই বলে নিতে চাই প্রাচীন আরবী লিপির পাঠোদ্ধারের কোন পদ্ধতিই একেবারে বিতর্কমূক্ত নয়। এটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা গবেষকদের কোন দোষ নয়। কারণপ্রথমত- আরবী বর্ণমালায় স্বরধ্বনিগুলির জন্য নির্দিষ্ট কোন বর্ণ নেই। ব্যঞ্জনবর্নগুলির উপরে নিচে নানারকম চিহ্নের সাহায্যে স্বরধ্বনিগুলির উচ্চারণ বোঝানো হয়।(আরবী বর্ণমালার প্রথম বর্ণ হল আলেফযা অবস্থানগতভাবে রোমান বর্ণমালার ‘a’ এর সমতুল্য। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সব ধরণের দীর্ঘস্বরের ব্যবহার বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়।)  শুধু আরবী লিপি নয় সিরিয়াকহিব্রুআরামায়িকফিনিশিয় সমস্ত সেমিটিক ভাষাশ্রয়ী লিপিগুলিতেই এই বিশেষ প্যাটার্ন দেখা যায়। দ্বিতীয়তশুধু তাই নয় অনেকগুলি আরবী বর্ণই দেখতে প্রায় একই রকম যেমন উদাহরণস্বরূপ আরবী বর্নমালার পঞ্চম বর্ন ‘জিম’ [ج], ষষ্ঠ বর্ণ ‘হা’ [ ح], সপ্তম বর্ণ ‘খা’ [خদেখতে অনেকটা একি রকম। এদের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে শুধু একটি ফুটকিতে। প্রাচিন লিপিতে অনেক সময়ই এইসমস্ত চিহ্নগুলি না থাকায় বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে পার্থক্য করা দুস্কর হয়ে পরে। কোন প্রাচীন আরবী বিবরনেই এইসব চিহ্ন পাওয়া যায় না। এমনকি প্রাচীন কোরানের যে সমস্ত পুথি পাওয়া গেছে সেখানেও এই সমস্ত চিহ্নগুলি অনুপস্থিত। এর বিরাট তাৎপর্য আমরা কোরান সংক্রান্ত আলোচনার সময় দেখব।

নিশ্চয়ই নীরস ভাষাতাত্বিক আলোচনায় হাঁফিয়ে উঠেছেন। চলেনইতিহাসের জটিল শূড়িপথ ধরে ইসলামের অনুসন্ধানে ফিরে যাই।তবে একটি বিষয়ে প্রথমেই পাঠকদের কাছ থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে চাই তা হল এখানে সর্বক্ষেত্রেই ঐতিহাসিক বিবরণগুলির আমি মূলানুগ ভাবানুবাদ করেছি। ঐতিহাসিক গবেষকদের মতো পূর্নাঙ্গ আক্ষরিক অনুবাদ করার মতো সময় ও রিসোর্স দুটোর কোনটাই নেই আর তার প্রয়োজনও নেই। ভাষাতাত্বিক আলোচনার ক্ষেত্রে আমি রোমান হরফ ব্যবহার করব কারণ বাংলা হরফ দিয়ে অনেক সুক্ষ পার্থক্য বোঝানো সম্ভব হবে না।

সপ্তম শতাব্দীর একটি সিরিয়াক ম্যানুস্ক্রিপ্টে মুহম্মদের উল্লেখ আছে বলে মনে করা হয়েছে।

এজি ৯৪৫৮নং ইনডিকশনশুক্রবার ৪ ফেব্রুয়ারী [অর্থাৎ ৬৩৪ খৃষ্টাব্দ/ ১২ হিজরীজ্বিলকদ মাস]নবম প্রহরে প্যালেষ্টাইনের গাজার ১২ মাইল পূর্বে রোমানদের সাথে মহম্মদের আরবদের (সিরিয়াক-tayyāyē d-hmt) একটি যুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। রোমানরা পালিয়ে যায়প্যাট্রিশিয়ান YRDN (সিরিয়াক BRYRDN) কে ফেলেযাকে আরবরা হত্যা করে। প্রায় ৪০০০ প্যালেষ্টাইনি অসহায় গ্রামবাসীক্রিশ্চিয়ানইহুদী ও সামারিটাননিহত হয়েছে। আরবরা পুরো এলাকায় ধংসযজ্ঞ চালিয়েছে


সিরিয়াক tayyāyē শব্দের আদত অর্থ যাযাবরপরবর্তী নথিতে এই শব্দটি দ্বারা বিজয়ী আরবদের বোঝানো হয়েছে। তাই থেকে এক ঐতিহাসিক রবার্ট.জি.হলান্ড tayyāyē d-hmt –এর অনুবাদ করেছেন মুহম্মদের আরবরা। পাঠক লক্ষ করুন নামবাচক শব্দের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ব্যঞ্জনধ্বনিগুলি লিপিকৃত করা হচ্ছে। কিন্তু আসল সমস্যা হল-সিরিয়াক লিপি ‘t’ আর ‘d’ এর মধ্যে পার্থক্য করে। সেখানে মুহম্মদ শব্দটি ‘hmd’ এই আকারে পাবার কথা। যদি আমরা মেনেও নি এখানে tayyāyē d-hmt –এর সঠিক অনুবাদ ‘মুহম্মদের আরবরা’, তাহলেও এর থেকে মুহম্মদ সম্মর্কে কিছুই জানা যায় না।


৬৩৪ থেকে ৬৪০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে লেখা ডকট্রিনা জাকবি নামে আর একটি দলিল আমাদের কিছু তথ্য দেয়-
যখন ক্যানডিদেতাস [রোমান রাজকীয় রক্ষীবাহিনীর এক সদস্য] সারাসেনীয়দের দ্বারা হত হল তখন আমি ছিলাম সিজারিয়াতে এবং তারপর নৌকায় চড়ে রওনা দিলাম সায়কামিনার উদ্দশ্যে। লোকে বলছিল ক্যানডিদেতাস মারা গেছে আর আমরা ইহুদীরা অত্যন্ত খুশী হলাম। তারা আরো বলছিল একজন ধর্মপ্রচারক আবির্ভূত হয়েছেনতিনি আসছেন সারাসেনীয়দের সঙ্গেএবং আগমন ঘোষনা করেছেন অভিষিক্তজনেরখৃষ্ট- যার আসার কথা ছিল
সায়কামিনায় আসার পর আমার সাথে একজন ধর্মজ্ঞানী বৃদ্ধ মানুষের দেখা হল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “ সারাসেনীয়দের মধ্যে যে নবী আবির্ভূত হয়েছেন তার বিষয়ে তুমি কিছু জানাতে পার?” সে কাতর স্বরে বলল “ সে হল ভূয়াকারণ ধর্মপ্রচারকরা তলোয়ার হাতে আসেন না। আজকে চারদিকে যে বিশৃঙ্খলা চলছে তাতে আমি আতঙ্কিত যেপ্রথম খৃষ্ট খৃষ্টানরা যার আরাধনা করে তিনি ঈশ্বর দ্বারা প্রেরিত হয়েছিলামকিন্তু তার পরিবর্তে আমরা এখন এক খৃষ্টবিরোধীকে গ্রহন করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি।...........
.....অতএব আমিআব্রাহামখোঁজ করলাম এবং শুনলাম তাদের থেকে যারা তাকে দেখেছে যে এই তথাকথিত নবীর কোনই সত্যতা নেইশুধুই মানুষের রক্তপাত। সে আরো বলে যে তার হাতে রয়েছে স্বর্গের চাবিযা একেবারে অবিশ্বাস্য

মনোজোগী পাঠকরা নিশ্চই লক্ষ্য করেছেন এই বিবরণের সমস্যা কোথায়এই বিবরণে বর্ণিত নবী তখনও অর্থ্যাৎ ৬৩৪-৬৪০ খৃষ্টাব্দেও আরবদের মধ্যে সক্রিয়যেখানে ইসলামী বিবরণে বর্ণিত নবী মুহম্মদ কয়েক বছর আগেই মারা গিয়েছেন। এখানে ইসলাম বা কোরানের কোন উল্লেখ নেইএমনকি আক্রমনকারীদের মুসলিম বলেও অভিহিত করা হয়নিবলা হয়েছে সারাসেনীয়। অনান্য বহু সমসাময়িক দলিল পাওয়া গেছে কোনটিতেই ইসলামমুহম্মদ ও কোরানের কোনই উল্লেখ পাওয়া যায় না। কোরানের অনুপ্রেরণা বুকে নিয়েনবীর আদর্শকে সামনে রেখে যে দুঃধ্বর্শ মুসলিম বাহিনী আরবের মরুভূমি থেকে বেড়িয়ে এসে সারা মধ্যপ্রাচ্য জয় করে নেয়সাসানীয় সাম্রাজ্য তাদের হাতে বিধ্বস্ত হয় আর বাইজানটাইন সাম্রাজ্যকে এক বিরাট অংশ হারাতে হয়- আশ্চর্যের ব্যাপার সেই কোরান আর নবী মুহম্মদেরকেই ঐতিহাসিক দলিলে খুঁজে পাওয়া যায় না। মুমিন ভাইয়েরা নিশ্চয়ই বলবেন ইহুদী-নাসারা কাফেররা তাদের নবী আর কোরানের গুরুত্ব বুঝতে পারেনিতাই তাদের বিবরণে এর উল্লেখ পাওয়া যাবে না। কিন্তু আমি এক্ষুনি দেখাব যে সমকালীন ইসলামিক উৎসেও মুহম্মদ বা কোরানের কোন নামগন্ধ নেই।


খলিফা মুয়াবিয়ার আমলে ৬৭৭ বা ৬৭৮ খৃষ্টাব্দে নির্মিত একটি বাঁধে খোদিত আছে
-“ এই বাঁধ ঈশ্বরের দাস মুয়াবিয়ার, (অধীনস্ত)
বিশ্বাসীজনের সেনাপতি। আবদুল্লাহ বিন সাখর নির্মান করেছেন
ঈশ্বরের আদেশানুসারে ৫৮ সনে।
আল্লা! আপনার এই দাস মুয়াবিয়াকে মার্জনা করুন
বিশ্বাসীজনের সেনাপতিতার স্থান অনুমোদন করুন ও তাকে সাহায্য করুন এবং
বিশ্বাসীরা
তার অবস্থানে খুশী হোকলেখেন আমর বিন হাব্বাব/জনাব

মুয়াবিয়াকে বিশ্বাসীদের সেনাপতি বলা হয়েছে কিন্তু তার বিশ্বাস সম্পর্কে কিছুই জানা সম্ভব হয় না। একইভাবে ৬৮৮ খৃষ্টাব্দের এক লিপি যেটা মিশরের ফুসতাতে একটি সেতুর উপর পাওয়া গেছেতাতে বলা হচ্ছে-
এটাই সেই খিলান যা আমীরআবদ আল-আজিজ বিন মারওয়ানের আদেশে নির্মিত হয়েছে। আল্লা! তার সর্বকর্মে আশীর্বাদ করুনতার কর্তৃত্ব অনুমোদন করুন যেমনভাবে আপনি চান এবং তার ও তার পরিবারকে সর্বসুখী করুন। সাদ আবু উসমান নির্মান করেছেন এবং আবদ আর-রহমান লিখেছেন ৬৯ সনের সফর মাসে

এখানেও একইভাবে না মুহম্মদনা ইসলাম না কোরান। যেটা আমাদের সবচেয়ে বিস্মৃত করে সেটা হল ইসলামী প্রথা অনুসারে বিসমিল্লাহ-এর অনুপস্থিতি। ইসলামী প্রথায় যে কোন রচনার শুরুতে বিশমিল্লাহির রাহমানীর রহিম বা (পরম করুনাময় আল্লার নাম নিয়ে শুরু করছি) লেখা হয়ে থাকে। অথচ সপ্তম শতাদ্বীর একদম শেষভাগের আগে পর্যন্ত এ সম্পর্কে কেউ কিছু জানত বলে তো মনে হয় না। পরবর্তীকালে আমরা দেখব শাহাদা বা ইসলামে বিশ্বাসের ঘোষনা আবদ আল মালিকের শাসনকালের আগে চালু হয়নি।

আরেকবার মনে করিয়ে দিচ্ছি যেসব ইসলামী উৎসগুলি থেকে ইসলামের ইতিহাস জানা যায় সেগুলী বহু পরে রচিত। সমকালীন উৎস থেকে বিষয়গুলির সত্যতা প্রতিপাদনের চেষ্টা করলেই আমরা অবাক হয়ে দেখি যে সমকালীন উৎস আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দিচ্ছে। সমকালীন কোন বিস্তারিত ইসলামীক বিবরণ না থাকায় আমাদের নির্ভর করতে হয় অমুসলিম উৎসের উপর। অমুসলিম দলিল যেখানেই মুহম্মদইসলাম বা কোরানের উল্লেখ করেছে সেখানে কোন ক্ষেত্রেই প্রায় মুসলিম বিবরণের সাথে মেলে না। প্রথম যে অমুসলিম বিবরণ পাওয়া যায় যেখানে নিশ্চিতভাবে মুহম্মদের উল্লেখ আছে তা হল বিশপ সেবিওসের বিবরণ-
তারা যাত্রা শুরু করল মরুভূমির মধ্য দিয়ে এবং চলে এল আরবেইসমায়েলের পুত্রদের মধ্যেতারা তাদের সাহায্য প্রার্থনা করলএবং তাদেরকে ব্যাখ্যা করল যে তারা বাইবেল অনুসারে তাদের [আরবদের] আত্বীয়। যদিও তারা [ইসমেলাইটরা] এই আত্বীয়তা স্বীকার করতে প্রস্তুত তবুও তারা [ইহুদীরা] কখনই জনগনকে প্রত্যয়দানে সক্ষম হল নাকারণ তাদের ধর্মসম্প্রদায় ছিল পৃথক।
এই সময় সেখানে ছিলেন মহমেত নামে এক ইসমেলাইটএকজন বণিকতিনি নিজেকে তাদের সামনে উপস্থিত করলেন ঈশ্বরের আদেশপ্রাপ্তসত্যের পথচারীএক ধর্মগুরু হিসাবে তাদের আব্রাহামের ঈশ্বরকে জানতে শেখালেনকারণ তিনি জানতেন ও ভালভাবে মোসেসের কাহিনীর সাথে পরিচিত ছিলেন। যেহেতু স্বর্গ থেকে আদেশ এসেছেতাই তারা সবাই সেই মানুষের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হলএকি আইনের অধীনে এবং মিথ্যা ধর্মাচরণকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ফিরে গেল জীবিত ঈশ্বরের কাছে যিনি নিজেকে আব্রাহামের কাছে প্রকাশ করেছিলেন। মহমেত তাদেরকে নিষেধ করলেন মৃত পশুর মাংস খেতেমদ্যপান করতেমিথ্যা কথা বলতে ও ব্যাভিচার করতে। তিনি আরো বলেন “ঈশ্বর এই ভূমি আব্রাহামকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং বংশপরম্পরায় চিরকালে জন্যযিনি সেই প্রতিশ্রুতি অনুসারে চলেছেন কেননা তিনি ইসরায়েলকে ভালবাসতেন। এখন তোমরাইসরায়েলের পুত্ররাঈশ্বর তোমাদের দ্বারাই আব্রাহাম ও তার বংশধরদের দেওয়া সেই প্রতিশ্রতি পূর্ণ করবেন। এস এবং অধিকার কর সেই দেশ যা ঈশ্বর তোমাদের পিতা আব্রাহামকে দিয়েছিলেনকেউই তোমাদের প্রতিরোধ কলতে পারবে না কারণ ঈশ্বর আছেন তোমাদের সাথে


এর পরে আছে আরব ও ইহুদীদের মিলিত অভিযানের বিবরণ যার সাথে ইতিহাসের কোনই সম্পর্ক নেই। শুধু তাই নয় লেখক বহু স্থানের উল্লেখ করেছেন যেগুলীর উৎস হল বাইবেলের জেনেসিস। লেখক মনে হয় গোটা বিষয়টিকে পৌরাণিক চরিত্র দিতেই বেশী আগ্রহী ছিলেন বাস্তব ঘটনাবলী বর্ণনা করার চেয়ে। যদি আমরা মেনে নি এই বিবরণ বিকৃতভাবে হলেও কিছুটা ঐতিহাসিক সত্য উপস্থাপনা করেসেক্ষেত্রে আমরা ইসলামের আদি যুগের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র পাই যা এমনকি খোদ কোরানের সাথেই সংঘাতপূর্ণ- ‘অবশ্য মুমিনদের প্রতি শত্রুতায় ইয়াহুদী আর মুশরিকদেরই তুমি সর্বাধিক উগ্র দেখিবে’ (সুরা মায়েদা,  ৮২)। মুহম্মদের নির্দেশে মদিনার ইহুদীদের উপর অত্যাচার ও বিতারনের বিশদ বর্ণনা জানেন না এমন লোক বাংলা ব্লগ দুনিয়ায় পাওয়া যাবে না। শুধু তাই নয় কোরান যেখানে ইহুদীদের সর্বাপেক্ষা বড় শত্রু বলে অভিহিত করছে , সেখানে সমকালীন খৃষ্টান নথির এই বর্ণনা পুরো ইসলামী ইতিহাসের সত্যতা সম্পর্কেই প্রশ্ন তুলে দেয়।


বিশপ সেবিওস পরে উল্লেখ করেছেনমুয়াবিয়াতৎকালীন সিরিয়ার শাসনকর্তা এবং পরবর্তী খলিফা৬৫১ খৃষ্টাব্দে বাইজানটাইন সম্রাটকে একটি চিঠি পাঠান। তাতে তিনি সম্রাটকে খৃষ্টধর্ম ত্যাগ করে আব্রাহামের ঈশ্বরকে গ্রহন করতে বলেছেন
“ যদি শান্তিতে বাস করতে চাও... নিজের মিথ্যা ধর্ম ত্যাগ কর যে ধর্মে তুমি ছোটো থেকে প্রতিপালিত হয়েছ। ত্যাগ কর ওই যীশুকে এবং চলে এস মহান ঈশ্বর যার আমি ইবাদত করিআমাদের পিতা আব্রাহামের ঈশ্বরের কাছে।...... যদি না কর তবে যে যীশুযাকে তুমি খৃষ্ট বলে ডাকযে নিজেকেই বাঁচাতে পারেনি ইহুদীদের হাত থেকেসে তোমাকে আমার হাত থেকে কিভাবে বাঁচাবে


কোরান অনুসারে যীশু বা ঈশা নবীর মৃত্যু হয়নি- “....ইহা নিশ্চিত যে তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই (সুরা আল নিসাআয়াত ১৫৭) বরং আল্লাহ তাহাকে তাহার নিকট তুলিয়া লইয়াছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালীপ্রজ্ঞাময় (সুরা আল নিসাআয়াত ১৫৮) এখানে আবার আমরা দুই বিবরণের অসঙ্গতি ও বৈপরীত্যের সম্মুখীন হই। দ্বিতীয়তদ্বিতীয়ত বিশপ সেবিওসের এই চিঠিতে ইসলামের কেন্দীয় চরিত্র মুহম্মদের কোন উল্লেখ নেইতবে কি আদি ইসলামে মুহম্মদ কেন্দ্রীয় অবস্থানে ছিলেন নাকে বলতে পারে!
x

সোমবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৬

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-২

        
               ইসলামী ইতিহাসের আরবী  ভিত্তি ও উপরিকাঠামো

বাংলা ব্লগ দুনিয়ায় ইসলামের প্রানপুরুষ মুহম্মদকে নিয়ে শয়ে শয়ে লেখা আছে, কিন্তু তার সবটাই মুহম্মদ সংক্রান্ত ইসলামী বিরবণ কে মেনে নিয়ে, যার ঐতিহসিক সত্যতা কোন ভাবেই প্রতিপাদন করা সম্ভব নয়। এমনকি নাস্তিক ব্লগাররা ইসলাম ও মুহম্মদ নিয়ে প্রচুর প্রবন্ধ লিখলেও তার কোনটিতেই ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের চেষ্টা হয়নি এমনকি এ সংক্রান্ত বিশাল গবেষনা সম্পর্কে তারা অবগত আছেন বলেও তাদের লেখা দেখে মনে হয়না। একমাত্র মুক্তমনা ব্লগে কয়েক বছর আগে বিপ্লব পাল তার একটি প্রবন্ধে বিষয়টাকে বুড়ি ছুয়ে গিয়েছিলেন; এ ছাড়া আর কোন লেখা আমার চোখে পড়েনি। বিপ্লব পালের আর্টিকেলটি পড়ার পর থেকেই আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে থাকি এ সংক্রান্ত গবেষনালব্ধ তথ্যগুলি বিশদভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভব করি। ইষ্টিশন ব্লগে নিয়মিতভাবে এই সিরিজটি প্রকাশ করছি। যারা আরো ভালভাবে জানতে চাইবেন তারা সরাসরি  ইবনে ওয়ারাকের Origines of Koran  এবং রবার্ট স্পেনসারের Did Muhammad Exist বইদুটি দেখতে পারেন।

প্রকৃতপক্ষে সোভিয়েত প্রাচ্যবিদরা বিংশ শতাদ্বীর ৩০ এর দশক থেকেই ইসলামিক বিবরনের ঐতিহাসিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় সোভিয়েত ঐতিহাসিক ক্লিমোভিচ ইসলামকে একটি আন্দোলন হিসাবে দেখেছেন যা আদিতে ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। মুহম্মদ এই আন্দোলনের নেতৃত্বে এসে একে একটি ধর্মীয় চরিত্র দেন। একি সাথে আন্দোলন তার প্রগতিশীল ও দরদী চরিত্র হারায়। তার মতে মক্কা ছিল প্রধান বানিজ্যকেন্দ্র, মক্কার বাসিন্দারা ছিলেন প্রায় সকলেই ব্যবসায়ী। অথচ  বানিজ্যের প্রধান উৎস ছিল কাবার তীর্থযাত্রীগন, আর কাবার দখল ছিল কিছু ধনী কুরাইস পরিবারের হাতে। এই অল্পসংখ্যক ধনী কুরাইস পরিবারের বিরুদ্ধে দরিদ্রতর শ্রেনীর শ্রেনীসংগ্রাম হিসাবে ইসলাম জন্ম নেয়। আধুনিক ভাষাতাত্বিক গবেষনার আলোকে ক্লিমোভিচের এই বিশ্লেষন আদৌও গ্রহনযোগ্য নয়। কারণ আমাদের মক্কা থেকে ইসলামের উদ্ধব তত্বে সংশয় প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ আছে । শুধু তাই নয় প্যাট্রিসিয়া ক্রোন দেখিয়েছেন বানিজ্যকেন্দ্র হিসাবে মক্কার উল্লেখ সমকালীন (মুসলিম এবং অমুসলিম) কোন উৎসেই পাওয়া যায় না (Meccan trade: Patricia Crone)এটা হল এককথায় অবিশ্বাস্য ঘটনা কারণ বলা হয়েছে পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর দক্ষিনের সব বানিজ্যপথগুলি মক্কায় এসে মিলিত হত।মক্কার মাধ্যমেই ভারতের বিলাসদ্রব্য আরবের বনিকদের মাধ্যমে বাইজানটাইন সাম্রাজ্যে ঢুকত। ঐতিহাসিক ওয়াট বলেছেন- “by the end of sixth century A.D , (the Quraysh) had gained control of most of the trade from the Yemen to the Syria”কিন্তু দেখা যায় মুহম্মদের কথিত জন্মের ৫ বছর আগে ৫৬৫ খৃষ্টাব্দে লেখা ষষ্ঠ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক Procopius of Caesarea তার বিবরণে মক্কার কোন উল্লেখ করেননি। (মুসলিম ঐতিহাসিকরা অনেকসময় টলেমির বিবরনে প্রাপ্ত মাকোরাবা নামে একটি স্থানের উল্লেখ দেখিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন এটাই ইসলামের নবীর জন্মভূমি মক্কা।)বানিজ্যকেন্দ্র হঠাৎ করে গড়ে ওঠে না। কিন্তু সমসাময়িক গ্রিক, রোমান, আরামায়িক, সিরিয়ান কোন বিবরনেই মক্কার উল্লেখ নেই।

পৃথিবীর ম্যাপে মক্কার ভৌগলিক অবস্থান লক্ষ্য করেছেন, সবদিক থেকে সমস্ত বানিজ্যপথগুলো মক্কায় এসে মিলছে এর থেকে কষ্টকল্পনা আর কি হতে পারে। কি ভাবছেন! কাহিনী আরো বাকি আছে। একাদশ শতাব্দীর মুসলিম ঐতিহাসিক আল আজরাকি (১০৭০ সাল) ইসলামপূর্ব আরবের তীর্থস্থান যেমন মিনা, আরাফা, উকাজ, মাজান্না ইত্যাদীর নাম করেছেন কিন্তু মক্কার নাম নিতেই ভূলে গিয়েছেন। দ্বিতীয়বার ভাবনার পরে পরিশিষ্ট অংশে মক্কার স্থান হয়েছে। প্যাট্রিসিয়া ক্রোন এটাও দেখিয়েছেন উপজাতি অধ্যুষিত আরবে সমস্ত তীর্থস্থান অবস্থিত ছিল ফাঁকা মরুভূমিতে যেখানে কোন পক্ষেরই কর্তৃত্ব থাকত না, মক্কার মতো কোন শহরে নয়।(Meccan Trade: Patricia Crone)কোরানের আল্লা অবশ্য মক্কাকে একেবারে ভূলে যাননি, তিনি শুধু একবার মক্কার উল্লেখ করেছেন –
“ তিনি মক্কা উপত্যকায় উহাদের হস্ত তোমাদের হইতে এবং তোমাদের হস্ত উহাদের হইতে নিবারিত করিয়াছেন, উহাদের উপর তোমাদের বিজয়ী করার পর, তোমরা যাহা কিছু কর আল্লাহ তাহা দেখেন”[সুরা ফাতহ, আয়াত ২৪] (সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ কতৃক কোরানের বাংলা অনুবাদ থেকে গৃহীত)।

কিন্তু এ থেকে কিছুই বোঝার উপায় নেই।

মক্কা ও মদিনায় পুরাতাত্বিক খননকার্য চালাতে পারলে হয়ত এই রহস্যের সমাধান পাওয়া যেতে পারত। গবেষনার ফলাফল ইসলামের বিরুদ্ধে যেতে পারে এই আশংকায় সৌদি ও অনান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলি নিরপেক্ষ দলকে কোনরকম অনুসন্ধানের সুযোগই দেয় না। অতএব আমাদের পরোক্ষ উপাদানের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন উপায় নেই।
আসুন খানিকক্ষনের জন্য ইসলামী বিবরনের উপর আস্থা রাখি। নিচে ইসলামী ইতিহাসের একটি ক্রমবিবরণী দিয়ে দিলাম। যারা বিশদে ইসলামী ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় জানেন, তারা স্বচ্ছন্দে এই অংশটি বাদ দিয়ে যেতে পারেন:

৫৭০ খৃষ্টাব্দ: মুহম্মদের জন্ম

৬১০ খৃষ্টাব্দ: মু্ম্মদের নবয়ুৎ প্রাপ্তি

৬২২ খৃষ্টাব্দ: হিজরা বা মহম্মদ ও তার অনুগামীদের মদিনায় আশ্রয়লাভ

৬২৪ খৃষ্টাব্দ: বদর যুদ্ধ

৬২৫ খৃষ্টাব্দ: উহুদ যুদ্ধ

৬২৭ খৃষ্টাব্দ: খন্দক যুদ্ধ

৬২৮ খৃষ্টাব্দ:হুদাইবিয়ার সন্ধি

৬৩০ খৃষ্টাব্দ:মহম্মদের মক্কা বিজয়

৬৩২ খৃষ্টাব্দ: মহম্মদের মৃত্যু, খলিফায়ে রাসেদিনের শুরু

৬৩২-৩৩ খৃষ্টাব্দ: রিদ্দার যুদ্ধ, মুহম্মদের মৃত্যু সংবাদে ইসলামত্যাগ করে মূর্তাদ হবার ধুম পরে যায়। খলিফা আবু বকর এই বিদ্রোহীদের দমন করেন।

৬৩৩ খৃষ্টাব্দ: ইয়ামানার যুদ্ধ, সিরিয়ার ধর্মপ্রচারক মুসায়লামার অনুগামীদের বিরুদ্ধে মুসলিমরা যুদ্ধযাত্রা করে। মুসায়লামার জনপ্রিয়তা সম্ভবত মুহম্মদের থেকে কম ছিল না। যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৬৩৩ খৃষ্টাব্দ: আরবদের ইরাক আক্রমন

৬৩৪-৬৪৪ খৃষ্টাব্দ: খলিফা উমরের আমল

৬৩৬-৩৭ খৃষ্টাব্দ: আরবদের সিরিয়া ও প্যালেষ্টাইন জয়

৬৩৯ খৃষ্টাব্দ:    আরবদের আর্মেনিয়া ও মিশর জয়

৬৪৪ খৃষ্টাব্দ:    আরবদের পারস্য দখল

৬৪৪-৬৫৬ খৃষ্টাব্দ: খলিফা উসমানের আমল

৬৫৩ খৃষ্টাব্দ: উসমান কোরান সংকলিত করেন

৬৫০-৬০ খৃষ্টাব্দ: আরবরা উত্তর আফ্রিকা জয় করল

৬৫৪ খৃষ্টাব্দ: আরবদের সাইপ্রাস ও রোডস দখল


৬৫৬-৬৬১ খৃষ্টাব্দ: খলিফা আলির আমল
৬৬১ খৃষ্টাব্দ: আলির মৃত্যু, খলিফায়ে রাসেদিনের সমাপ্তি

৬৬১-৬৮০ খৃষ্টাব্দ: উমাইয়া শাসনের সূত্রপাত, মুআবিয়ার আমল

৬৭৪ খৃষ্টাব্দ খৃষ্টাব্দ: আরবদের কনস্ট্যানটিনোপল অবরোধ

৬৮০-৮৩ খৃষ্টাব্দ: প্রথম ইয়াজিদের শাসন

৬৮৫-৭০৫ খৃষ্টাব্দ: আবদ আল মালিকের শাসন। কিছু ইসলামী সূত্র অনুসারে তিনি কোরান সংকলিত করেন

৬৯১ খৃষ্টাব্দ: Dome of the Rock লিপি। প্রথমবারের মত কোরানের আয়াত উৎকির্ণ হল।

৬৯০ খৃষ্টাব্দ: ইসলামী সূত্র অনুসারে ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কোরান সংকলিত করেন। কোরানের অনান্য সংস্করণ পান সেগুলো পুড়িয়ে ফেলেন। সূত্রমতে তিনি কোরান পরিবর্তনও করেন

৭০৫-১৫ খৃষ্টাব্দ: প্রথম আল ওয়ালিদের শাসন।

৭১১-১৩: মহম্মদ বিন কাসেমের ভারত অভিযান। আরবদের সিন্ধু জয়

৭১১-১৮ খৃষ্টাব্দ: মুসলিমদের স্পেন জয়

৭৩২ খৃষ্টাব্দ:    ত্যুরের যুদ্ধে চার্লস মার্টেল মুসলিমদের অগ্রগতি রোধ করলেন।

৭৫০ খৃষ্টাব্দ:    আব্বাসীয় বিপ্লব, উমাইয়া শাসনের অবসান

৭৫০-৬০ খৃষ্টাব্দ: ইবনে ইশাক প্রথম সিরাত গ্রন্থ লিখলেন

৮৩০-৬০ খৃষ্টাব্দ: ষটি প্রধান হাদিস এই সময়ের মধ্যে লেখা হয়
                                        



               


রবিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৬

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-১

                    
                            ইতিহাসের পথে ইসলামের অনুসন্ধান

২০০৮ সাল- নভেম্বর মাস, জার্মানীর মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক ধর্মতত্বের অধ্যাপক মুহম্মদ স্বেন কালিচ তার দীর্ঘদিনের গবেষনার ফল ঘোষনা করলেন। তিনি একদম পরিস্কারভাবে দুটো বিষয় তুলে ধরেন, প্রথমত- ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা মুহম্মদের সম্ভবত কোন অস্তিত্ব ছিল না। দ্বিতীয়ত, যদি ইসলামের ইতিহাসে কোন মুহম্মদ যদি থেকেও থাকে তার সাথে ইসলামিক বিবরণের মুহম্মদের কোনই সম্পর্ক নেই। বস্তুত ইসলমিক বিবরণের সবটাই প্রায় গল্পকথা মাত্র যা অনেক পরে রচিত হয়েছে। ইসলামিক বিবরণে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এমন ঐতিহাসিকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এক্ষেত্রে কালিচ মোটেও একা নন আর তিনিই প্রথম এই দাবী করলেন বিষয়টা এরকমও নয়। আসলে কালিচের এই ঘোষনার তাৎপর্য হল প্রথমত তিনি ছিলেন মুসলিম (জার্মানীর প্রথম ইসলামিক ধর্মতত্বের অধ্যাপক ছিলেন। ২০১০ সালে তিনি ইসলাম পরিত্যাগ করেন) আর দ্বিতীয়ত তার আগে কেউই এত দৃঢ়ভাবে মুহম্মদের অস্তিত্ব নাকচ করতে পারেনি।

এখন প্রশ্ন হল এই ঘোষনার ভিত্তি কি? আল্লার রাসুলের কর্মকান্ডের কি কোন ঐতিহাসিক প্রমান আছে, কোন শিলালিপি পাওয়া গেছে যা তার অস্তিত্ব প্রমান করে? সমকালীন অমুসলীম উৎস কি নবীর কর্মকান্ডের নিশ্চিত প্রমান দেয়?

উত্তর হচ্ছে না, কিস্যু নেই। ধর্মীয় সাহিত্যকে এত নিশ্চিতভাবে ইতিহাস হিসাবে গ্রহন করা চলতে পারে না যার মধ্যে আবার অসংখ্য পরস্পরবিরোধী ও অসংলগ্ন তথ্য রয়েছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের ১৬০ কোটি মানুষ এত দৃঢ়ভাবে ইসলামিক সূত্রে আস্থাশীল যে তাদের বিশ্বাসের জোর দেখে অনেক গবেষক পর্যন্ত্য প্রভাবিত হয়েছেন। ফলস্বরুপ কোরান ও অনান্য ইসলামিক সূত্রের অনুসন্ধান কোন নির্মোহ সংশয়ী দৃষ্টি নিয়ে করা হয়নি। যারাই এ বিষয়ে নিয়ে গভীর চর্চা করেছেন তারাই এ বিষয়ে ক্রিটিকাল দৃষ্টিভঙ্গীর অভাবের কথা লিখেছেন। গবেষক আর্থার জেফারি ১৯৩৭ সালে দেখেছিলেন-critical investigation of the text of Quran is a study which is still in its infancy”. পঞ্চাশ বছরেরও বেশী বাদে ১৯৯০ সালেও আমরা সেই একই কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই- I have often come encountered individuals who came to the study of Islam with a background in the historical study of Hebrew Bible or early Cristianity, who express surprise at the lack of critical thought that appears in introductory textbook on Islam. The notion that ‘Islam was born in the clear light of History’ is still seems to be assumed by a great many writers of such texts. (Andrew Rippin,1990)


  এতদসত্বেও বলতেই হবে যে বহু ঐতিহাসিক বিভিন্ন সময়ে ইসলামিক বিবরণের ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করেছেন এবং বিভিন্ন ইসলামিক উৎসের মধ্যেকার বৈপরীত্য খুঁজে বার করেছেন এবং সর্বশেষে ইসলামিক বিবরণের সাথে অমুসলিম উৎসের পার্থক্য দেখিয়েছেন। এইভাবে তারা প্রতিষ্ঠা করেছেন যাকে অ্যাকাডেমিক পরিভাষায় বলা হয় Revisionist School of Islamic Studiesজন ওয়ানসব্রাউ, গান্টার লুলিং, ক্রি্স্তোফ লুক্সেেমবার্গ, মাইকেল কুক, পাট্রিসিয়া ক্রোন এই সমস্ত গবেষকদের যে বিশাল গবেষনা রয়েছে তার উপর দাঁড়িয়ে আমরা অতি সহজেই হাদিস ও সিরাত কে ঐতিহাসিক প্রমান্য গ্রন্থ হিসাবে অস্বীকার করতে পারি। কারণ দেখা যায়-

১.মু্হম্মদের সমকালীন অর্থ্যাৎ সপ্তম শতাদ্বীর প্রথম চার দশকের কোন লেখায় মুহম্মদের কোন উল্লেখ নেই। শুধু তাই নয় ইসলাম বা মুসলিম শব্দটি আছে এমন কোন লেখা পাওয়া যায়নি। ৬৩৪ খ্রীস্টাব্দে রচিত একটি প্রায় ধূসর হয়ে যাওয়া ছোট চিরকুট আকারের বিবরণে মুহম্মদের নাম আছে বলে মনে করা হয়। এই বিষয়ে আমি পরে আসছি। প্রকৃতপক্ষে ওই চিরকুট থেকে কিছুই প্রমান করা যায়না। প্রথম বারের মত নিশ্চিতভাবে মুহম্মদের উল্লেখ পাওয়া যায় আর্মেনীয় খৃষ্টান বিশপ সেবিওসের বিবরণে।এটি ৬৭০ সালের দিকে রচিত হয়েছিল, মহম্মদের কথিত কর্মকান্ডের অন্তত ৩০-৪০ বছর বাদে।

২. এমনকি এই বিবরণেও মুহম্মদের অনুগামীদের মুসলিম বলা হয়নি বলা হয়েছে ইসমেলাইটএর আগের সব লেখাতেই আরবদের দ্বারা বিজিত মানুষরা তাদের সারাসেন, ইসমেলাইট, হাজারীয় ইত্যাদী হিসাবে চিহ্ণিত করেছে, মুসলিম হিসাবে নয়।

৩. কোরানে মুহম্মদের উল্লেখ আছে মাত্র চার বার। যেখানে মোসেস বা মুসা নবী ১৩৬ বার উল্লিখিত হয়েছেএমনকি ফেরাউনের উল্লেখ আছে ৭৬বার। যে সমস্ত সুরায় মুহম্মদের নাম আছে সেখানেও প্রসঙ্গ পরিস্কার নয়। এইসব জায়গায় অনায়াসে Mu-ammad শব্দের আভিধানিক অর্থ নিযুক্ত বা প্রসংশিত ব্যক্তি অনায়াসে লাগানো যেতে পারে।

৪. সিরা বা মুহম্মদের জীবনীগ্রন্থগুলি হল ইসলামিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রথম সিরাত গ্রন্থটি লেখেন ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৭) মুহম্মদের মৃত্যুর ১০০-১২৫ বছর পরেএই বইটি ঘোষিতভাবেই পরবর্তী সব মুসলিম ঐতিহাসিকদের সোর্স হিসাবে ব্যাবহৃত হয়েছে। হাদিসগুলি লেখা শুরু মুহম্মদের কথিত মৃত্যুর অন্তত দুশ বছর পরে।

৫. ৬-৭ প্রজন্ম পরে লেখা হাদিসগুলিকে কোন আধুনিক ঐতিহাসিকই ঐতিহাসিক বিবরণ হিসাবে স্বীকার করেন নি। সহজ বুদ্ধিতেই বোঝা যায় এধরনের বিবরণ সম্পূর্ণভাবে প্রচলিত মিথের উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য। মুসলিম স্কলাররাও অনেকেই জাল হাদিসের অস্তিত্ব মেনে নিয়েছেন। আমরা প্রতিনিয়ত দেখে থাকি মুনিন ভাইয়েরা কোন হাদিস নিয়ে অস্বস্তিতে পড়লেই সেটা তখুনি জাল হাদিস হয়ে যায়।

৬. দেখা যায় পরবর্তী ঐতিহাসিক আল ওয়াকিদি (৭৪৫-৮২২) অনেক বিষয়েই ইবনে ইশাকের থেকে বেশী জানেন। যেমন যেসব অভিযানে যুদ্ধ হয়নি- কেন, কি কারণে তার বিস্তারিত বর্ননা দিয়েছেন ওয়াকিদি- যেখানে ইবনে ইশাক শুধু উল্লেখ করেছেন। আল তাবারীর ইতিহাসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ভাল করে লক্ষ্য করলে পুরোটাকেই বানানো গল্পের একটা ট্রাডিশন ছাড়া কিছুই মনে হয়না।

৭.একাধিক হাদিস পাওয়া যায় যেখানে দেখা যাচ্ছে ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কোরান সংকলিত করছেন যেটা তার অন্তত ৪০ বছর আগেই উসমানের আমলে হয়ে যাওয়ার কথা। অন্য হাদিস অনুসারে মসজিদে কোরান তিলাওয়াত প্রথাও তিনিই চালু করেন।

ইসলামিক ইতিহাসের এরকম অসংখ্য অসংলগ্ন, পরস্পরবিরোধীতার উল্লেখ করা যেতে পারে যার জন্য যুক্তিবাদী মানুষের পক্ষে ইসলামিক ইতিহাসে আস্থা রাখা শক্ত। আপাতত ইসলামের পঞ্চম খলিফা মুআবিয়ার আমলে ছাপা মুদ্রার ছবি দিলাম; যেখানে দেখা যাচ্ছে মুসলিম শাসক একটি ক্রুস বহন করছেন। অপর পিঠে সম্ভবত মহম্মদের নাম রয়েছে।




কি বলেন মুনিন ভাইয়েরা, পুরোপুরি কুফরি!

বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৬

স্তালিনবিরোধী অপপ্রচারের জবাবে

দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি আমাদের প্রিয় মুনিন ভাইয়েরা কথায় কথায় নাস্তিকদের অত্যাচারের বিবরণ হিসাবে ষ্ট্যালিন, মাওকে টেনে আনেন।অথচ স্ট্যালিন মাও সম্পর্কে তাদের জ্ঞান সমাজতন্ত্র বিরোধী বাজারী প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মুক্তমনারাও এই ধরনের বক্তব্যের সাধারণত বিরোধীতা করেন না। কারণটা সহজেই বোঝা যায়। ইন্টারনেটে গেলেই ষ্ট্যালিন জমানার গনহত্যা নিয়ে শত শত আর্টিকেল পাওয়া যাবে- বহু স্বঘোষিত স্কলার পাওয়া যাবে যারা নিয়মিতভাবে স্ট্যালিন নিয়ে গবেষনা করে থাকেন (এর মধ্যে নামকরা লোকও আছে)। তাদের গবেষনার ফলাফলস্বরূপ স্ট্যালিনের অত্যাচারের শিকার মানুষের সংখ্যা ৭ মিলিয়ন থেকে ৫৪ মিলিয়নের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। সংখ্যাতত্বটি এতই অদ্ভুত যে বিরোধীতা করাও নিরর্থক। সার্বিক সামরিক আগ্রসন ছাড়া এত মানুষকে হত্যা করা সম্ভবই নয় (কোন একক দলের পক্ষে) রাশিয়ার জনসংখ্যা ও বাৎসরিক জনসংখ্যার পরিবর্তন নিচে দেওয়া হল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে:
Year 
Average population
Live births
Deaths
Natural change
1927
94,596,000
4,688,000
2,705,000
1,983,000
1928
96,654,000
4,723,000
2,589,000
2,134,000
1929
98,644,000
4,633,000
2,819,000
1,814,000
1930
100,419,000
4,413,000
2,738,000
1,675,000
1931
101,948,000
4,412,000
3,090,000
1,322,000
1932
103,136,000
4,058,000
3,077,000
981,000
1933
102,706,000
3,313,000
5,239,000
-1,926,000
1934
102,922,000
2,923,000
2,659,000
264,000
1935
102,684,000
3,577,000
2,421,000
1,156,000
1936
103,904,000
3,899,000
2,719,000
1,180,000
1937
105,358,000
4,377,000
2,760,000
1,617,000
1938
107,044,000
4,379,000
2,739,000
1,640,000
1939
108,785,000
4,329,000
2,600,000
1,729,000
1940
110,333,000
3,814,000
2,561,000
1,253,000

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের ফ্যাসিষ্ট বাহিনীর দ্বারা সোভিয়েট ইউনিয়ন প্রবলভাবে আক্রান্ত হয় অনুমান করা হয় এই যুদ্ধে সোভিয়েটের মোট জনসংখ্যার ১৬% অর্থ্যাৎ ২ কোটি ৭০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর:
Year
Total population
Live births
Deaths
Natural change
1946
98,028,000
2,546,000
1,210,000
1,336,000
1947
98,834,000
2,715,000
1,680,000
1,035,000
1948
99,706,000
2,516,000
1,310,000
1,206,000
1949
101,160,000
3,089,000
1,187,000
1,902,000
1950
102,833,000
2,859,000
1,180,000
1,679,000
1951
104,439,000
2,938,000
1,210,000
1,728,000
1952
106,164,000
2,928,000
1,138,000
1,790,000
1953
107,828,000
2,822,000
1,118,000
1,704,000
(সূত্র উইকিপিডিয়া)
উপরের তালিকার দেখা যায় স্ট্যালিন জমানার প্রতিটি বছরেই জনসংখ্যার হার ছিল উর্ধমূখী (একমাত্র ১৯৩২ সাল ছাড়া ওই বছর সোভিয়েট ইউনিয়ন জুড়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়।স্ট্যালিন বিরোধীরা এক্ষেত্রেও স্ট্যালিনের হাত দেখতে পান। তাদের মতে স্ট্যালিন নিজেই এই দুর্ভিক্ষ ঘটিয়েছিলেন)
এখন প্রশ্ন হল স্ট্যালিন তাহলে ৫ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করলেন কখন? জনসংখ্যা তো সেই পরিমানে কমে যাওয়ার কথাও। ১৯২৭-১৮৫৩ এর মধ্যে জনসংখ্যা সব সময়েই ৯ কোটি থেকে ১১ কোটির মধ্যে ছিল। একথার অর্থ হল স্ট্যালিন তার দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ হত্যা করেছিলেন। এটা যে কতবড় অসম্ভব কোন চিন্তাশীল মানুষকে আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেইকয়েক লক্ষ মানুসকে হত্যা করার পরই বাকীরা হয় অন্য দেশে পালিয়ে যাবে না হয় সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী গড়ে তুলে যুদ্ধ শুরু করবে। এটাকে কোন পদক্ষেপ করেই আটকানো সম্ভব নয়, কারণ বাঁচবার আকাংখ্যা মানুষের সবচেয়ে বড় আকাংখ্যা। শুধু তাই নয় দেশের অর্ধেক মানুষকে হত্যা করেও এত জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা সম্ভবপর কি? যারা স্ট্যালিন বিদ্বেষী তারা দ্বিতীয়বার ভেবে দেখুন।
যাই হোক মূল প্রশ্নে চলে আসি। স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ গ্রেট পার্জ (১৯৩৬-৩৮) বা বৃহৎ শুদ্ধিকরন। বলা হয়ে থাকে স্ট্যালিন নাকি তার বিরোধী সন্দেহে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছেন, লক্ষ লক্ষ মানুষের উপর নির্যাতন চালিয়েছেন, বহু মানুসকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠিয়েছেন ব্লা ব্লা ব্লা.....। আলোচনার এই পর্বে উৎস হিসাবে আমি বেছে নিয়েছি মার্কিন সাংবাদিক আনা লুই স্ট্রঙের ‘দি স্ট্যালিন এরা’ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে অধিষ্ঠিত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জে.ই.ডেভিসের (মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুসভেল্টের ব্যক্তিগত বন্ধূ) ‘মিশন টু মস্কো’।আনা লুই স্ট্রং ছিলেন একজন মার্কিন সাংবাদিক, তাকে স্ট্যালিনের আমলে ১৯৪৯ সালে গ্রেপ্তার করা হয়, মুক্তি পান স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর। ততদিনে ক্রশ্চেভ স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ এনে বাজার গরম করে দিয়েছেন। ফলে আশা করব এই সময়ে লেখা তার এই বিবরণে আমার স্ট্যালিনবিরোধী বন্ধুরা সন্দেহ প্রকাশ করবেন না।
সোভিয়েট রাষ্ট্র পত্তনের প্রথম দিন থেকেই বৈদেশিক ও অন্তর্দেশীয় ষড়যন্ত্র (বলা ভাল বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্ত অন্তর্দেশীয় ষড়যন্ত্র) তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। পূর্বতন জার সেনাবাহিনীর জেনারেল ম্যানরহাইম ফিনল্যান্ড দখল করে নেন এবং সেখান থেকে রাশিয়ার উপর হামলা চালান। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স বাল্টিক সাগরের উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে সৈন্যসমাবেশ করে। দূর প্রাচ্যে জাপান কামচাটকা ও সাখালিন দ্বীপের উপর তাদের নিয়ন্ত্রন বজায় রাখে বহুদিন পর্যন্ত্য। শিশু সোভিয়েত রাষ্টের উপর শেষবার আক্রমন ঘটে ফরাসী সাহায্যপ্রাপ্ত পোলদের দ্বারা। ১৯২২ সালের আগে ব্লাডিভোস্টক থেকে জাপানীদের তারানো যায়নি। যুদ্ধ যখন শেষ হল রুশ সাম্রাজ্যের অংশবিশেষ পোলান্ডের সাথে যুক্ত হয়েছে, ফিনল্যান্ডে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে, এস্তেনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, বেরাসাবিয়া রুমানিয়া দখল করে নিয়েছে, সাখালিন উপদ্বীপের অর্ধাংশ জাপান অধিকার করে বসে আছে- রুশ সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট অঞ্চলের উপর সোভিয়েতের শাসন চলছে। ব্রিটিশ ও ফরাসী সাম্রাজ্যবাদীরা সৈন্য প্রত্যাহারের পরেও দেশের অভ্যন্তরে যে দলকেই বিক্ষুব্ধ পাওয়া গেছে তাকেই ব্যবহার করে সোভিয়েত শাসনকে উৎখাতের চেষ্টা করেছে। দেশ ছিল যুদ্ধে ফতুর- জীবনযাত্রার মান ১৯১৭ সালের থেকেও নিচু ১৯২০-২১ সালে পরপর দুর্ভিক্ষে চাষীরা চাষের মূল যন্ত্র গবাদী পশুগুলিকে খেয়ে শেষ করেছিল লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি তখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে- কৃষিতে যৌথখামার গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে অপরদিকে ভারী শিল্পগুলিকেও গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। লেনিন চালু করেছিলেন নিউ ইকনমিক পলিসি; এর মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী উৎপাদনকে সাময়িকভাবে স্বীকার করা হল। কারণ দেশের লোক না খেয়ে আছে, সমাজতান্ত্রিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সময় লাগবে। দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরল কিন্তু গুপ্তঘাতকের গুলিতে লেনিনের জীবনে যবনিকা নেমে এল। ১৯২৭ সাল নাগাদ উৎপাদন ১৯১৭ সালের স্তরে এল। এরপর অতি দ্রুত কৃষিতে যৌথখামার গড়ে তোলায় চমকপ্রদ অধ্যায়, ১৯৩০ সালের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অর্থনীতিকে দিল নতুন দিগন্ত। ১৯৩৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৭ সালের তিনগুন উৎপাদন করল। অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধির সাথে সাথে অন্তর্দেশীয় চক্রান্তকারীদের প্রতি ক্রমাগতই নরম মনোভার নেওয়া হতে লাগল। (এই পর্বের সোভিয়েতবিরোধী চক্রান্তের বিবরন এই পরিসরে আলোচনা করা গেলনা।)
পরিস্থিতি পালটে গেল ১৯৩৪ সালে লেনিনগ্রাদ (বর্তমানে সেন্ট পিটার্সবার্গ) পার্টির সম্পাদক সের্গেই কিরভের আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা থেকে।কিরভ ছিলেন স্ট্যালিনের বন্ধু তার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী। হত্যাকারী ছিল দীর্ঘদিনের কমিউনিষ্টপার্টির কার্ড দেখিয়েই সে  দপ্তরে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল। বোঝা গেল এর সাথে উচ্চতম পর্যায়ের যোগাযোগ আছে। শেশপর্যন্ত্য দেখা যায় এটি একটি সামগ্রিক চক্রান্তের অংশ আর এর সাথে পলিটব্যুরো সদস্য জিনেভিয়েভ আর কামেনেভ জড়িত (জিনেভিয়েভ আর কামেনেভ ইতিবূর্বেও বার বার সমাজতন্ত্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। লেনিন মৃত্যুর পূর্বে এই দুজন সম্পর্কে সাবধান করে দিয়ে গেছিলেন)।আরো অনুসন্ধান চালানো হয় এবং শেশপর্যন্ত্য দেখা যায় চক্রান্তের মূল বার্লিন এবং টোকিওতে রয়েছে এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রের এমন কোন শাখা নেই যেখানে চক্রান্তকারীরা জায়গা করতে পারেনি। চক্রান্তকারীদের মূল লক্ষ্য সমস্ত প্রথম সারির কমিউনিষ্ট নেতাদের হত্যা করে ক্ষমতা দখল এবং এই মর্মে তারা বিদেশী শক্তির সাথে চুক্তিবদ্ধ। পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য বুখারিন ও রায়কভ গ্রেপ্তার হলেন, আর এক সদস্য টমস্কি গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় আত্বহত্যা করেন। সেনাবাহিনীকেও যুক্ত দেখা গেল। সেনা বাহিনীর রাজনৈতিক বিভাগের অধিকর্তা মার্শাল গামারনিক আত্বহত্যা করলেন। সামরিক অধিনায়ক মার্শাল তুকাচেভস্কি সহ আরো ৭ জন সামরিক অধিকর্তার গোপন সামরিক আদালতে বিচার হয়। মাত্র কিছুদিন আগেই তুকাচেভস্কি ছিলেন প্রতিরক্ষা দপ্তরের উপমন্ত্রী। বিচার শেষে ঘোষনা করা হয় যে আসামীরা হিটলারের সাথে যোগাযোগের কথা স্বীকার করেছেন। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন যে হিটলারকে ইউক্রেন দখল করতে সাহায্য করবেন। চেকস্লোভাকিয়া গোয়েন্দা দপ্তর সূত্রে এর সমর্থনও পাওয়া যায় (সূত্র: স্ট্যালিন যুগ)। রুশরা সবচেয়ে বেশী চমকে উঠল যখন সোভিয়েত গুপ্তচর সংস্থা অগপু (পরবর্তীকালে কেজিবি) প্রধান ইয়াগোদা নিজে জালে ধরা পড়লেন। আনা লুই স্ট্রং লিখেছেন “তাকে যখন দেশদ্রোহী বলে প্রানদন্ড দেওয়া হল, রাজনৈতিক পুলিসের বহু কর্মচারীকে যখন নির্দোষ নাগরিকদের গ্রেপ্তার এবং স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্যে অন্যায় উপায় অবলম্বনের দায়ে জেলে ভরা হল...... কে দোষী? কে নির্দোষ? কে কাকে গ্রেপ্তার করছে?” আনা লুই স্ট্রং লেখেন “আমি যেসব মামলার কথা নিজে জানি তা থেকে এই মতেরই সমর্থন পাওয়া যায় যে প্রায়ই ভূল লোককে, বিশৃঙ্খলা আনবার উদ্দেশেই যেন বাছাই করে গ্রেপ্তার করা হত”
মনে রাখতে হবে প্রধান তিনটি মস্কো মামলার প্রকাশ্যে বিচার হয়েছিল হাজার হাজার বিদেশী কূটনীতিক ও সাংবাদিকের শ্যেনদৃষ্টির সামনে। বিদেশের কাগজে লেখা হল সাজানো বিচার। আসুন দেখে নেওয়া যাক মামলার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য কি- “ দিনের দিনের পর দিন আদালতে বসে, এই কাহিনী আমি ক্রমে বেড়িয়ে আসতে দেখেছি। আসামিরা মুখর ছিলেন; তাদের উপর কোন রকম উৎপীড়ন হওয়ার চিহ্ন নেই। কামেনেভ বললেন- ১৯৩২ সাল নাগাদ দেখা যে জনসাধারণ স্তালিনের নীতি গ্রহন করেছে, রাজনৈতিক পন্থায় আর স্তালিনকে উৎখাত করা সম্ভব নয়; উৎখাত করতে হবে ব্যক্তিগত আতঙ্কের দ্বারা। জিনেভিয়েভ বললেন যে তিনি বহু লোকের উপর হুকুম করতে এতই অভ্যস্ত পড়েছিলেন যে তা না করতে পারায় তার পক্ষে জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল। এন. লুরিয়ে নামে একজন দাবী করল যে সে হিটলারের প্রতিনিধি ফ্রাঙ্ক ভাইৎজের পরিচালনায় কাজ করেছে।... আসামি রাইন গোল্ড তার সহ আসামি কামেনেভের বিরুদ্ধে চীৎকার করে জানাল- ওর অত ভালো মানুষ সেজে আর কাজ নেই। মৃতদেহের পাহাড় ভেঙেও ও ক্ষমতা দখল করতে ছুটত” (আনা লুই স্ট্ং: স্ট্যালিন যুগ)
“ আসামিদের স্বীকারোক্তি যে বিশ্বাসযোগ্য তার বহুরকম লক্ষন আমার মধ্যে রেখাপাত করেছে। যদি ধরে নিতে হয় পুরো বিচার প্রক্রিয়াটাই সাজানো তাহলে এর পিছনে শেকসপীয়ার সদৃস সৃষ্টিপ্রতিভা এবং বেলাস্কোর মত মঞ্চায়নের প্রতিভাকেও কল্পনা করে নিতে হবে” (জে.ই.ডেভিস: মিশন টু মস্কো)
এতক্ষনে আলোচনায় আমরা দেখতে পেলাম এইরূপ পরিস্থিতিতে কোন জাতির পক্ষেই মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করা সম্ভব হত না। চতুর্দিকে যেখানে ষড়যন্ত্রকারীদের লোক সেখানে বাছবিচার করার বিশেষ অবকাশ থাকে না। বেশ বোঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা স্বেচ্ছাচারী স্ট্যালিনের শত্রুনিধনের মত অত সহজ ব্যাপার নয়। এর পিছনে বহু দলের কার্যকলাপ এসে মিলেছিল। অগণিত লোককে অতর্কিতভাবে ধরে প্রাচ্যের কয়েদী শিবিরে পাঠানো হয়েছিল; হাজার হাজার লোককে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে বিংশতিতম পার্টি কংগ্রেসে ক্রশ্চেভ যে রিপোর্ট দেন তাতে দেখা যায় ১৯৩৪ সালের পার্টি কংগ্রেসের মোট ১৯৬৬ জন প্রতিনিধির মধ্যে ১১০৮ জনকে পরে গ্রেপ্তার করা হয়, ওই কংগ্রেস যে ১৩৪ জনকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচন করে তাদের মধ্যে ৯৮ জনকে গুলি করে মারা হয়। এর থেকে পরিস্কার এর জন্য শুধুমাত্র স্ট্যালিন দায়ী নন। কারণ ১৯৩৪ সালের কংগ্রেস (এই কংগ্রেসকে জয়ের কংগ্রেস বলা হয়) তো তাদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল যারা বরাবর স্ট্যালিনের পন্থায় চলছিল তাদের নিয়ে। তাদেরকে তিনি শেষ করতে চাইবেন কেন।বরং এটা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে বিশ্বাসঘাতক চক্রীদের দ্বারা জাতির শ্রেষ্ঠ মানুষদের খতম করবার প্রচেষ্টা হিসাবে। গুপ্তচর সংস্থার প্রধান যেখানে ষড়যন্ত্রীদের একজন সেখানে এই অনুমানটাই শক্ত ভিত্তি পায়।
মুনিন বান্দাদের কথা নাহয় বোঝা যায় কিন্ত যখন দেখি যারা নিজেদের মুক্তমনা বলে দাবী করেন তারাও স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে পশ্চিমী দেশগুলি প্রচারিত অপপ্রচারই আওড়ে চলেছেন, শুধু তাই নয় বিষয়টির গভীরে ঢোকার কোন প্রয়োজনই মনে করেছেন না; তখনই এই বিষয়ে লেখার সিদ্ধান্ত নি। পরবর্তী পর্বে মস্কো মামলার বিশদ বিবরণ তুলে ধরার ইচ্ছা আছে।আশা করব প্রকৃত মুক্তমনারা সবদিক খুঁটিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।