সোমবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-৯

কোরান সংকলন- এক লুক্কায়িত ইতিহাসের খোঁজে:

ব্যক্তিগত কারণবশত বেশ কিছুদিন লেখালিখির কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পাঠকদের কাছে প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নেব দীর্ঘ ছেদের জন্য। তৃতীয় পর্বে বিশপ সেবিওসের বিবরণ দিয়েছিলাম। ৬৭০ খৃষ্টাব্দের সেই বিবরণের সাথে প্রচলিত ইসলামিক কাহিনীর বিপুল পার্থক্য আমরা দেখেছি। তবে সেই বিবরণ থেকে ঐতিহাসিক তথ্য বিশেষ কিছুই জানা যায় না। সেবিওসের বিবরণে নবীর অনুসারীদের মুসলিম বলা হয়নি, বলা হয়েছে সারাসেনীয়। সর্বপ্রথম যে বিবরণে মু্হম্মদ অনুসারীদের মুসলিম বলা হয়েছে সেটি হল নিকিউর কপটিক বিশপ জনের ক্রনিকল, যা সম্ভবত ৬৯০ খৃষ্টাব্দে রচিত হয়েছিল।

এবং এখন বেশ কিছু মিশরীয় যারা কিনা ছিল ভূয়া খৃষ্টান, অর্থোডক্স বিশ্বাস আর জীবনদায়ী ব্যাপটিসম ত্যাগ করেছে; আলিঙ্গন করে নিয়েছে ঈশ্বরের শত্রু মুসলিমদের ধর্ম, আর গ্রহন করেছে পশুর ন্যায় ঘৃণিত মুহম্মদের মত; এবং তারা মূর্তিপূজকদের সাথে মিলে পাপে নিমজ্জিত হয়েছে, অস্ত্র তুলে নিয়েছে হাতে এবং যুদ্ধ করেছে খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে” [সূত্র- https://wikiislam.net/wiki/Historicity_of_Muhammad]

পাঠক- উপরের অনুচ্ছেদটি ভালভাবে পরুন। পড়ে মনে হচ্ছেনা কি- যে লেখক মুসলিমদের ক্রিশ্চিয়ানিটি থেকে অধঃপতিত একটি সম্প্রদায় হিসাবেই বিবেচনা করেন, কোন নতুন ধর্ম হিসাবে নয়। এই ক্রনিকলে মুসলিম শব্দের উল্লেখ থাকলেও একথা মনে করার কোন কারণ নেই যে ওই সময় এই শব্দটি প্রচলিত ছিল। মূল ক্রনিকলটি পাওয়া যায় না। আমাদের হাতে যেটা এসেছে সেটা হল ১৬০২ খৃষ্টাব্দে আরবী থেকে অনুদিত একটি সংস্করণ। এই আরবী নথিটি আবার মূল গ্রিক বা ওই ধরণের কোন ভাষা থেকে অনুদিত।সম্ভবত জন তৎকালীন সময়ে প্রচলিত অন্য কোন শব্দ ব্যাবহার করেছিলেন, পরবর্তী অনুবাদক সেটা পালটে মুসলিম করে দিয়েছেন। আমাদের এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হচ্চে কারণ তৃতীয় পর্বে আমরা দেখেছি সংশ্লিষ্ট সময়ের কোন ঐতিহাসিক দলিলেই মুসলিম শব্দটি নেই। এমনকি পঞ্চম পর্বের ‘ডোম অফ দ্য রক লিপি’তেও এটা পাওয়া যায় না।

এতগুলি পর্বের আলোচনায় সম্ভবত প্রমান হয়ে গেছে যে পুরো সপ্তম শতাব্দী জুড়ে ইসলামিক ধর্মততত্বের কোন অস্তিত্বই ছিল না। তাহলে কোন সময়ে ঘটেছিল পৃথক ধর্ম হিসাবে ইসলামের সূচনা? ৭৩০ খৃষ্টাব্দের খৃষ্টীয় ধর্মতাত্বিক জন অফ দামাস্কাস এই বিষয়ে আলোকপাত করতে পারেন কিনা দেখা যাক। জন অফ দামাস্কাস ধর্মদ্রোহিতা বা Heresy -এর বিবরণ হিসাবে লিখিত তার বইতে এক আজব নতুন ধর্মের উল্লেখ করেছেন, এই ধর্মের সাথে যুক্ত সম্প্রদায়কে তিনটি নামে চিহ্নিত করেছেন সারাসেন, হাজারীয় আর ইসমেলাইট। এই নির্দিষ্ট ধর্ম প্রসঙ্গে একটি অধ্যায়ও যুক্ত করেছেন তার বইতে। তিনি মামেদ নামে ভন্ড নবীর কথা উল্লেখ করেছেন যে নাকি- এক খৃষ্টীয় সন্যাসীর থেকে ওল্ড আর নিউ টেষ্টামেন্টের গল্পগুলো জেনে নিয়ে নিজের ধর্মদ্রোহী চিন্তাভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটায়। ধার্মিকতার ভান করে মানুষকে সংগঠিত করে আর তারপর স্বর্গীয় গ্রন্থের গুজব রটায় যে সেটা তার উপর অবতীর্ণ হয়েছে।

এরপর জন এই ধর্মের বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন যা মোটামুটি ভাবে ইসলামের সাথে মিলে যায়। তার লেখাতেই ইতিহাসে প্রথম বারের মত কাবার উল্লেখ পাওয়া যায়। জন কোরানের বিষয়বস্তু সম্পর্কেও জ্ঞাত ছিলেন। কোরানের চতুর্থ সুরা ‘সুরা নিশা’ সম্পর্কে তার বক্তব্য হল এইরকম-

এই মামেদ, যেমন আগে বলা হইয়াছে, বিস্তর অসার কাহিনী রচনা করিয়াছিল- তাদের প্রতিটিকে সে একটি নাম দ্বারা চিহ্নিত করিত যেমন কিনা নারী সংক্রান্ত অধ্যায় (অর্থ্যাৎ সুরা নিশা)।এতে সে স্পষ্টরুপে চার স্ত্রী ও সহস্র উপপত্নী গ্রহন করিতে বলিয়াছে, যদি তা সম্ভব হয়

বস্তুত, প্রকৃতই সুরা নিশায় চার স্ত্রী গ্রহন ও যৌনদাসী ব্যাবহারের বৈধতা দেওয়া হয়েছে (৪:৩ দ্রষ্টব্য)। জন সুরা বাকারারও উল্লেখ করেছেন- “গাভী সংক্রান্ত অধ্যায় (সুরা বাকারা), এবং আরো বহু নির্বোধ ও হাস্যকর বিষয়বস্তু যার সংখ্যাধিক্যের জন্য আমার ধারণা (আমার) উপেক্ষা (এই আলোচনায়) করা উচিত”। কোরানের যেসব জায়গায় ইসা অর্থ্যাৎ যীশু খৃষ্টের উল্লেখ আছে জন তার বিস্তারিত বর্নানা দিয়েছেন-

সে (অর্থ্যাৎ নবী মু্হম্মদ) বলিত যে খৃষ্ট ঈশ্বরের বানী ও তার রুহ (কোরান ৯:১৭১), সৃষ্ট (৩:৫৯) এবং তার বান্দা (৪:১৭২, ৯:৩০, ৪৩:৫৯), তার জন্ম মেরী হতে(৩:৪৫) যিনি মোসেস ও অ্যারোনের ভগিনী (১৯:২৪) কোন বীজ ছাড়াই (৩:৩৭, ১৯:২০, ২১:৯১, ৬৬:১২)। .... ঈশ্বর জিজ্ঞাসা করিলেন: যীশু; তুমি কি বলিতে যে আমি ঈশ্বরের পুত্র এবং ঈশ্বর। এবং (মুহম্মদের জবানীতে) তিনি উত্তর করিলেন দয়া করো, প্রভু, তুমি জান আমি এরূপ কিছুই বলি নাই (কোরান ৫:১১৬)”(১)

জন কোরানের আয়াত উল্লেখ করেন নি। তার বর্ণনার সাথে বর্তমান কোরানের বেশ কিছু অসাঞ্জস্য দেখা যায়। যেমন সুরা মায়েদার ১১৬ নং আয়াতে তে আল্লা যীশুকে জিজ্ঞাসা করেন নি যে সে নিজেকে ঈশ্বর বলে অভিহিত করেছে কিনা? বরং “আল্লাহ বললেনঃ হে ঈসা ইবনে মরিয়ম! তুমি কি লোকদেরকে বলে দিয়েছিলে যে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে ও আমার মাতাকে উপাস্য সাব্যস্ত কর?” আর যীশুর উত্তর “ঈসা বলবেন; আপনি পবিত্র! আমার জন্যে শোভা পায় না যে, আমি এমন কথা বলি, যা বলার কোন অধিকার আমার নেই। যদি আমি বলে থাকি, তবে আপনি অবশ্যই পরিজ্ঞাত; আপনি তো আমার মনের কথা ও জানেন এবং আমি জানি না যা আপনার মনে আছে। নিশ্চয় আপনিই অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞাত” (৫:১১৬)। 


এই অসঙ্গতি ছাড়াও কোরানের বহু সংশ্লিষ্ট আয়াত জনের বিবরণে স্থান পায়নি বিশেষ করে মু্হম্মদের আগমনসংক্রান্ত বিষয়ে যীশুর ভবিষ্যৎবাণী – “স্মরণ কর, যখন মরিয়ম-তনয় ঈসা (আঃ) বললঃ হে বনী ইসরাইল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রসূল, আমার পূর্ববর্তী তওরাতের আমি সত্যায়নকারী এবং আমি এমন একজন রসূলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আগমন করবেন। তাঁর নাম আহমদ। অতঃপর যখন সে স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বললঃ এ তো এক প্রকাশ্য যাদু”(৬১:৬)। একজন খৃষ্টীয় ধর্মতাত্বিক হিসাবে এই আয়াতটি তার আগ্রহের বিষয় হবার কথা ছিল কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এর কোন উল্লেখ তার লেখায় নেই। তিনি কোরান নামেরও উল্লেখ করেননি। বোঝা যায় বিশপ জনের হাতে কোন লিখিত কোরান ছিল না; তিনি সম্ভবত মৌখিক ট্রাডিশনের উপর নির্ভর করেছিলেন যা কোরান হিসাবে সংকলিত হয়ে থাকবে।তবে কি ৭৩০ অব্দ পর্যন্ত্য কোরান সংকলিত হয়নি? নাকি সেই কোরান বর্তমানে প্রচলিত কোরান থেকে আলাদা। দেখা যাক-

প্রথমবারের মত কোরানের উল্লেখ পাওয়া যায় ৭১০ খৃষ্টাব্দে। এক আরব অভিজাতের সঙ্গে বিতর্ক করতে গিয়ে এক খৃষ্টান পাদ্রী কোরানের নামোল্লেখ করেন। তার কথায় - “আমার ধারণা যে এমনকি তোমার জন্য প্রযোজ্য সমস্ত আইন ও নির্দেশাবলী যা মুহম্মদ তোমাকে শিখিয়েছে, সবকিছু কোরানে নেই। সে কিছু কোরান থেকে নিয়েছে, কিছু সুরা আল-বাকারা, কিছু গাইগি (gygy) এবং কিছু তোরাহ (twrh) থেকে”(২)

শেষপর্যন্ত্য আরব বিজয়ের প্রায় আট দশক পরে কোন ব্যক্তি প্রথম সরাসরি কোরানের উল্লেখ করলেন। এর থেকে বোঝা যায় এই সময়কালের মধ্যে কোরান (এবং মুহম্মদের গল্প) প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল। আবার এই উদ্ধৃতি থেকে এটাও প্রতিয়মান হয় এই খৃষ্টান যাযক যে কোরানের কথা জানতেন সুরা আল বাকারা (কোরানের দ্বিতীয় এবং সর্ববৃহৎ সুরা) তার অংশ ছিল না। এখানে দেখা যাচ্ছে তিনি সুরা বাকারাকে কোরান, গাইগি অর্থ্যাৎ গসপেল (ইসলামিক পরিভাষায় ইঞ্জিল) এবং তৌরাতের মতো আলাদা গ্রন্থ হিসাবে বিবেচনা করছেন। এটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূল বলে মনে হয় না। কারণ. সাধারণভাবে কেউ একটি পাঠ্যাংশকে সম্পূর্ন গ্রন্থের সাথে গুলিয়ে ফেলে না।

তাহলে আমরা ঈঙ্গিত পেলাম যে সুরা বাকারা এবং সম্ভবত সুরা নিশা কোরানে অনেক পরে ঢোকানো হয়েছে। কিন্তু দুটি ভিন্ন ভিন্ন অমুসলিম উৎসের ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছি না। আমাদের প্রয়োজন একটি অন্তত ইসলামী বিবরণ যা থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেলাম-

অষ্টম শতাব্দীর ইসলামী ইতিহাসবিদ কাতাদা ইবনে ডায়মা (মৃত্যু ৭৩৬) লিখেছেন যে ৬৩০ খৃষ্টাব্দে হুনায়ুনের যুদ্ধে মুহম্মদের চাচা আল-আব্বাস তার সেনাদলকে এই বলে আহ্বান করেন - ইয়া আসাব সুরাত আল-বাকারা অর্থ্যাৎ ‘হে, সুরা বাকারার অনুসারীরা’(৩)। বোঝা গেল সুরা বাকারা সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি পৃথক গ্রন্থ হিসাবে সংশ্লিষ্ট সময়ে অবস্থান করত।


প্রসঙ্গত এই দুটি সুরা ইসলামী আইনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অষ্টম শতাব্দীর প্রথম দিকে আরব সাম্রাজ্য মধ্যপ্রাচ্যের সীমা অতিক্রম করে পশ্চিমদিকে উত্তর আফ্রিকা ও পূর্বদিকে সিন্ধু পর্যন্ত্য বিস্তৃত হয়। এই বিশাল সাম্রাজ্যে আরবে প্রচলিত উপজাতি আইন চাপিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় ছিল আইনকে ধর্মের সাথে যুক্ত করা।যারা বস্তুত, প্রথম থেকে যারা সিরিজটি অনুসরণ করছেন তারা নিশ্চয়ই দেখেছেন একাধিক পর্বে আবদ-আল মালিক আর ইউসুফ বিন হজ্জাজের উল্লেখ করেছি। অনেকগুলি ইসলামী সূত্র জানায় আবদ আল-মালিক যিনি ৬৮৫ খৃস্টাব্দ থেকে ৭০৫ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত্য খলিফা ছিলেন এবং তার অধীনস্থ প্রশাসক হজ্জাজ ইবনে ইউসুফ কোরান সংকলন করেছিলেন। আবদ আল মালিক বলেন- আমি কোরান সংগ্রহ করেছি “জামা’তুল কুর’আনা”(৪)। একাধিক হাদিসে দেখা যায় হজ্জাজ ইবনে ইউসুফ কোরান সংগ্রহ ও সম্পাদনা করছেন। হজ্জাজ এমনকি কোরানের এগারোটি শব্দ পালটে দিয়েছিলেন বলেও কথিত আছে। একটা হাদিস পাওয়া যায় যেখানে এক মুসলিমের জবানীতে বলা হচ্ছে- “আমি হজ্জাজ বিন-ইউসুফ কে বলতে শুনেছি ‘কোরান রচনা কর যেমনভাবে জিব্রাইল তা রচনা করেছিলেন, তার অন্তর্ভূক্ত হবে গাভী সংক্রান্ত পাঠ, অন্তর্ভূক্ত হবে নারী সংক্রান্ত পাঠ এবং অন্তর্ভূক্ত হবে ইমরানের পরিবার সংক্রান্ত পাঠ”(৫)। পরিস্কারভাবে এখনে সুরা বাকারা, সুরা নিশা ও সুরা আলে ইমরানের কথা বলা হচ্ছে। 

মনে হয় আবদ আল-মালিক ও ইউসুফ বিন-হাজ্জাজের আগে কোরান সংকলিত হয়নি। ঐতিহাসিক তথ্যও সেই দিকেই ঈঙ্গিত করছে। উসমানের কোরান সংকলন সম্ভবত গাল গল্প ছাড়া কিছু নয়। বিস্তারিত তথ্যের জন্য আগের পর্বগুলি বিশেষ করে পঞ্চম ও সপ্তম পর্ব দেখতে অনুরোধ করছি। যাই হোক এতগুলি পর্বের আমরা বুঝতে পারলাম কোরান কোন নির্দিষ্ট সময়ে অবতীর্ণ হয়নি। কোন নির্দিষ্ট সময়ে বা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে কোরান রচিত হয়নি। কোরান হল ইভলভড টেক্সট বা ধাপে ধাপে উদ্ধুত ধর্মগ্রন্থ। যেটা প্রায় এক শতাব্দী ধরে বহু গ্রহন-বর্জনের মধ্য দিয়ে পূর্নাঙ্গ চেহারা নিয়েছে। মহাভারতের সাথে কৃষ্ঞের যতটুকু সম্পর্ক, মুহম্মদের সাথে কোরানের সম্পর্ক তার বেশী নয়।







১. John of Damascas, De Haeresibus C/C1(patralogia Greca 94) ; Quoted in Hoyland-Seeing Islam

২. Monk of Beth Hale, Disputation, fol. 4b; Quoted in Hoyland-Seeing Islam

৩. Premare, ‘Abd al-Malik b. Marwan’

৪. Mingana, The Transmission of Koran

৫. Ibn Hajar al-Asqalani, Tahdhib al- Tahdhib, vol 4, 195-197 n-386



প্রতিটি পর্ব একসাথে পড়তে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন-



http://nijerblog1992.blogspot.in/

মু্হম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-৮


কোরান আসলে কি ছিল?


কোরানের বিপুল অসংলগ্নতার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আমরা আগের পর্বে পেয়েছিলাম। যারা আগের পর্ব পড়েন নি তাদের আমি আগের পর্বটি পড়ে এই পর্ব শুরু করতে পরামর্শ দেব। আগের পর্বের লিঙ্ক এখানে দেওয়া হল- http://nijerblog1992.blogspot.in/2017/01/blog-post.html। আগের পর্বে আমরা ভাষাবিদ গার্দ-র পুইনের উল্লেখ পেয়েছি। ১৯৭২ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানার একটি মসজিদে কোরানের প্রাচীন হিজাজী লিপিতে প্রায় নষ্ট হযে যাওয়া সর্বপ্রাচীন (পরবর্তীকালে বিরমিংহামে আরো প্রাচীন কোরানের দুটি পৃষ্ঠা আবিস্কার হয়েছে)কোরানের পান্ডুলিপি আবিস্কার হয়। ইয়েমেনী সরকার এই পান্ডুলিপি পুনরুদ্ধারের যে প্রকল্প নেন তার প্রধান ছিলেন গার্দ-র পুইন। তিনি বর্তমানে প্রচলিত কোরানের সাথে সানায় প্রাপ্ত কোরানের বহু পার্থক্য লক্ষ্য করেন। তার মতে,


“My idea is that the Koran is a kind of cocktail of texts that were not all understood even at the time of Muhammad. Many of them may even be a hundred years older than Islam itself. Even within the Islamic traditions there is a huge body of contradictory information, including a significant Christian substrate; one can derive a whole Islamic anti-history from them if one wants.”

তিনি আরো বলেন;


The Koran claims for itself that it is 'mubeen,' or 'clear,' but if you look at it, you will notice that every fifth sentence or so simply doesn't make sense. Many Muslims—and Orientalists —will tell you otherwise, of course, but the fact is that a fifth of the Koranic text is just incomprehensible. This is what has caused the traditional anxiety regarding translation. If the Koran is not comprehensible—if it can't even be understood in Arabic—then it's not translatable. People fear that. And since the Koran claims repeatedly to be clear but obviously is not—as even speakers of Arabic will tell you—there is a contradiction. Something else must be going on.[1]


প্রকৃতপক্ষে আমরা উপরে যা দেখলাম তা হল রিভিশনিষ্ট স্কূল অফ ইসলামিক স্ট্যাডিসের মূল ধারণার এক চুম্বক। অন্য অধিকাংশ ধর্মীয় শব্দের মত (পঞ্চম পর্ব দ্রষ্টব্য)আরবী কুর’আন (Quran) শব্দটিও সিরিয়াক উৎস থেকে আগত। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল ধর্মীয় স্তোত্রসংকলন। কোরানিক স্কলার এরভিন গ্রাফ দেখিয়েছেন সিরিয়াক শব্দটি খৃষ্টীয় স্তোত্র বোঝাতেই ব্যাবহার হত।আমরা তৃতীয় পর্বেই উল্লেখ করেছি অনেকগুলি আরবী বর্ণ দেখতে একই রকম। তাদের উপরে নিচে নানারকম চিহ্ন দিয়ে পার্থক্য বোঝানো হয়। কোরানের প্রাচীন ম্যানুস্ক্রিপ্টগুলির কোনটিতেই এইসমস্ত চিহ্নগুলি নেই। এগুলী পরে বসানো হয়েছে। কোরানের দুর্বোধ্য ও অসংলগ্ন অংশগুলো পরিস্কার হয়ে যায় যদি এইসমস্ত চিহ্নগুলি সরিয়ে দিয়ে নতুন করে অর্থ করবার করবার চেষ্টা করা হয়।

উপরের আলোচনার ভিত্তিতে প্রশ্ন উঠতে পারে, কোরান যেসব আয়াতে নিজেকে পৃথক শাস্ত্র হিসাবে দাবী করছে সেগুলোর কি হবে- যেমন “এগুলো সুস্পষ্ট গ্রন্থের আয়াত। আমি একে আরবী ভাষায় কোরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার” [ সুরা ইউসুফ ১২:১-২ ]।এক্ষেত্রে সিরিয়াক উৎসের পর্যালোচনা করে লুক্সেমবা্র্গ এইভাবে অনুবাদ করেছেন-

“এটি হল সুষ্পষ্ট গ্রন্থের লিখিত প্রতিলিপি। আমি একে আরবী স্তোত্রসংকলন রূপে অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার”(১)

প্রকৃতপক্ষে কোরান হল স্তোত্তসংকলন, এর আর কোন দ্বিতীয় অর্থ নেই। ওল্ড ও নিউ টেষ্টামেন্টের নির্দিষ্ট শ্লোকসমষ্টি বোঝাতে এই শব্দটি ব্যাবহার হত।জটিল ভাষাতাত্বিক আলোচনার পূর্ণ বিবরণ এই পরিসরে দেওয়া সম্ভব হবে না, তার প্রযোজনও নেই। শুধু প্রক্রিয়াটা মাথায় রেখে নিচের সুরাটি ভালভাবে লক্ষ্য করুন


সুরা আলাক

১. পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।

২. সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিন্ড হতে।

৩. পড়, আর তোমার রব মহামহিম।

৪. যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।

৫. তিনি মানুষকে তা শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।

৬. মোটেই নয়, নিশ্চয় মানুষ সীমালঙ্ঘন করে থাকে।

৭. কেননা সে নিজেকে মনে করে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

৮. নিশ্চয় তোমার রবের দিকেই প্রত্যাবর্তন।

৯. তুমি কি তাকে দেখেছো যে বাধা দেয়

১০. এক বান্দাকে, যখন সে সালাত আদায় করে?

১১. তুমি কি ভেবে দেখেছ, যদি সে সৎ পথে থাকে

১২. অথবা তাকওয়ার নির্দেশ দেয়?

১৩. তুমি লক্ষ্য করেছ কি যদি সে মিথ্যা আরোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়?

১৪. সে কি জানেনা যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ দেখেন?

১৫. মোটেই নয় নয়, যদি সে বিরত না হয়, তবে আমি তাকে কপালের সম্মুখভাগের চুল ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাব।

১৬. মিথ্যাচারী পাপাচারী চুলগুচ্ছ

১৭. অতএব, সে তার সভাসদদের আহবান করুক।

১৮. অচিরেই আমি ডেকে নেব জাহান্নামের প্রহরীদেরকে।

১৯. মোটেই নয়, তুমি তার আনুগত্য করবে না। আর সিজদা কর এবং নৈকট্য লাভ কর।

(কোরানের অনুবাদগুলি মূলত www.hadithbd.com থেকে নেওয়া হয়েছে। আরো আট-দশটি অনুবাদ মিলিয়ে দেখা হয়েছে)

এই সুরাটি প্রথম আট আয়াতে মানুষের সৃষ্টিরহস্য আর আল্লার কৃপা ব্যাখ্যা করার পর আচমকা আমাদের একজন লোকের কথা বলতে থাকে যে কিনা তার বান্দাকে নামাজ পড়তে বাঁধা দিচ্ছিল। ইসলামিক স্কলার ইবনে রাওয়ান্দির(২) মতে গোটা সুরাটিই মোটের উপর অর্থহীন প্রলাপ। কাল্লা “মোটেই নয়” (no, indeed) শব্দটি সমগ্র সুরায় তিনবার ব্যবহৃত হয়েছে। ইবনে রাওয়ান্দি দেখিয়েছেন যে ষষ্ঠ আয়াতে কাল্লা- (এর অর্থ ‘মোটেই নয়’) এর কোনই অর্থ নেই কারণ এটি আগের আয়াতের (বা আয়াতগুলির) অস্বীকৃতি হতে পারে না। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সুরাটি দুটি অংশে বিভক্ত, কারণ দুটি অংশের বক্তব্য বিষয় আলাদা এমনকি ভাষাতাত্বিক গঠনও আলাদা।


সংশ্লিস্ট বিষয়ে স্কলারদের যে বিশাল গবেষনা আছে তা এই ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়। আমরা সরাসরি দেখব স্কলাররা কি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। পরিস্কারভাবে সুরাটিতে সম্পাদনার চিহ্ন বর্তমান। প্রথম আটটি আয়াত প্রচলিত ইসালামিক বিবরণের সাথে পরিস্কারভাবে মিলে যায়। কিন্তু পরের আয়াতগুলির অর্থ বুঝতে গিয়ে যে কোন ব্যক্তির চুল ছেড়ার উপক্রম হবে। গবেষক গান্টার লুলিং তার লেখায় দেখিয়েছেন সুরা ৯৬ প্রকৃতপক্ষে হয়ত ছিল একটি খৃষ্টীয় প্রার্থনাসঙ্গীত, যেটাকে পরবর্তীকালে কিছুটা পরিবর্তীত করে ইসালমিক বিন্যাসের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন আরবী ম্যানুস্ক্রীপ্টের উপর ভিত্তি করে লুলিং সুরাটির ৯ থেকে ১৮ নং আয়াতের পুনর্গঠন করেছেন। “তুমি কি তাকে দেখেছো যে বাধা দেয় এক বান্দাকে, যখন সে সালাত আদায় করে?” (আয়াত ৯-১০) লুলিঙের পুনর্গঠনে হয়েছে – তুমি কি কখনও দেখছো তিনি তার বান্দাকে অস্বীকার করেন যে তার উপাসনা করে। উষ্ণ সতর্কবানী “তুমি লক্ষ্য করেছ কি যদি সে মিথ্যা আরোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়?-সে কি জানেনা যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ দেখেন?” (আায়াত ১৩-১৪) হয়ে দাঁড়িয়েছে খৃষ্টীয় ঈশ্বরের আন্তরিকতার বার্তা; - তুমি কি কখনও দেখেছো তিনি মিথ্যা আরোপ করেছেন ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন? তুমি কি জাননা যে ঈশ্বর সব দেখেন। অত্যন্ত অবান্তর “অতএব, সে তার সভাসদদের আহবান করুক, অচিরেই আমি ডেকে নেব জাহান্নামের প্রহরীদেরকে।” (আায়াত ১৭-১৮) এটাকে অনুবাদ করা হয়েছে ঈশ্বরের স্বর্গীয় সভা ও দেবদূতদের প্রতি আহ্বান হিসাবে- ‘অতএব আহ্বান কর তার উচ্চ সভাসদদের! তারপর স্বর্গীয় দেবদূতদের আহ্বান করা হবে’(৩)

আমরা দেখতে পেলাম যে লুলিং এর পুনর্গঠনে সুরাটি হয়ে দাঁড়াল একটি প্রার্থনাসঙ্গীত যেখানে ধার্মিক ব্যক্তিবর্গকে ঈশ্বরের আহ্বান করতে বলা হচ্ছে এবং ঈশ্বরের আন্তরিকতা সম্পর্কে আস্বস্ত করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত আবার উল্লেখ করছি আল্লা হল ঈশ্বরের আরবী প্রতিশব্দ মাত্র, মুসলিম-খৃষ্টান-ইহুদী নির্বিশেষে সমস্ত আরববাসী ঈশ্বরকে ওই নামে ডাকে। দেখা যাচ্ছে প্রসঙ্গহীন, বিশৃঙ্খল এই কোরানিক সুরাটির স্পষ্ট অর্থ করা সম্ভব হয় যদি আমরা ইসলামী অনুশাসনের বাইরে গিয়ে চিন্তাভাবনা করি। শুধুমাত্র এই সুরাটিই নয় প্রায় অধিকাংশ মক্কী সুরাকেই সামান্য যৌক্তিক অদলবদলের সাহায্যে খৃষ্টীয় শ্লোকে বদলে ফেলা যায়। যে সমস্ত পাঠকদের বিষয়টি গলাধঃকরণ করতে অসুবিধা হচ্ছে তাদের আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে অনুরোধ করছি। বাইবেল থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টি প্রমান করা যেত, কিন্তু সেক্ষেত্রে আলোচনাকে অন্য খাতে নিয়ে যেতে হবে। কোরান ও বাইবেলের তুলনামূলক আলোচনা পরের কোন একটি পর্বে আমরা করব।

সুরা আলাক শুরু হচ্ছে ‘ইকরা’ (iqra) শব্দটি দিয়ে। তাফসিরকারক ও অনুবাদকরা এর অর্থ করেছেন পড় বা পাঠ কর ইত্যাদী। প্রাচীন আরবী ভাষাবিদ আবু উদায়দার গারিব আল-হাদিস (৮১৮ খৃঃ) গ্রন্থে পাওয়া যায় যে ক্রিয়াপদ qara- এর অর্থ হল পাঠ করা, iqra হল তার অনুজ্ঞাসূচক রূপ; অন্য একটি ক্রিয়াপদ dakara এর সমার্থক- অর্থ আহ্বান করা(invoke) । ইবনে রাওয়ান্দি এবং রবার্ট লুলিং দুজনেই ‘ইকরা’ এর অর্থ আহ্বান করা ধরেছেন। যে কোন ধর্মীয় যেহেতু স্তোত্তই উচ্চস্বরে, সুর করে পড়া হয় তাই এই দুই অর্থের মধ্যে পার্থক্য বিশেষ থাকে না। ‘ইকরা’ এর অর্থ invoke বা আহ্বান করা ধরলে সুরার প্রথম বাক্য আমাদের স্মরন করিয়ে দেয় হিব্রু বাইবেলের অত্যন্ত পরিচিত শব্দবন্ধ “qara be shem Yahwe” – প্রভুর নামে আহ্বান কর (জেনেসিস ৪:২৫-২৬। যে সমস্ত পাঠকদের বিষয়টি গলার্ধঃকরণ করতে অসুবিধা হচ্ছে তাদের আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে অনুরোধ করছি। বাইবেল থেকে সরাসরি আরো উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টি প্রমান করা যেত, কিন্তু সেক্ষেত্রে আলোচনাকে অন্য খাতে নিয়ে যেতে হবে। কোরান ও বাইবেলের তুলনামূলক আলোচনা পরের কোন একটি পর্বে আমরা করব।

প্রকৃতপক্ষে শুধু লুলিং নয়, আরো অসংখ্য স্কলার কোরানে ইসলামিক কাঠামোর নিচে খৃষ্টীয় উপস্তরের অস্তিত্ব প্রমান করেছেন। এই বিষয়টি এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে একে আর অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই। কোরান আসলে ছিল খৃষ্টীয় ধর্মসঙ্গীত সংকলন। পরবর্তীকালে ইসলামী বিবরণ অর্থাৎ মুহম্মদ, জিব্রাইল, ওহী আসা ইত্যাদী প্রচারিত হওয়ার পর সম্পাদনার মাধ্যমে ইসলামিক বিন্যাসের সাথে খাপ খাইয়ে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরেকজন কোরান বিশেষজ্ঞ রিচার্ড বেল(১৮৭৬-১৯৫২) কোরানের বহু স্থানে সম্পাদনার চিহ্ন আবিস্কার করেছেন। যেমন-

“তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। তিনি তো এসব কিছু থেকে পবিত্র, বরং নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু রয়েছে সবই তার আজ্ঞাধীন। [ সুরা বাকারা ২:১১৬ ]

তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবক। যখন তিনি কোন কার্য সম্পাদনের সিন্ধান্ত নেন, তখন সেটিকে একথাই বলেন, `হয়ে যাও' তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়। [ সুরা বাকারা ২:১১৭ ]

যারা কিছু জানে না, তারা বলে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে কেন কথা বলেন না? অথবা আমাদের কাছে কোন নিদর্শন কেন আসে না? এমনি ভাবে তাদের পূর্বে যারা ছিল তারাও তাদেরই অনুরূপ কথা বলেছে। তাদের অন্তর একই রকম। নিশ্চয় আমি উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেছি তাদের জন্যে যারা প্রত্যয়শীল। [ সুরা বাকারা ২:১১৮ ]

নিশ্চয় আমি আপনাকে সত্যধর্মসহ সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীরূপে পাঠিয়েছি। আপনি দোখজবাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন না। [ সুরা বাকারা ২:১১৯ ]

ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন। বলে দিন, যে পথ আল্লাহ প্রদর্শন করেন, তাই হল সরল পথ। যদি আপনি তাদের আকাঙ্খাসমূহের অনুসরণ করেন, ঐ জ্ঞান লাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে, তবে কেউ আল্লাহর কবল থেকে আপনার উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী নেই। [ সুরা বাকারা ২:১২০]

আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। [ সুরা বাকারা ২:১২১ ]”

বেল দেখিয়েছেন আয়াত ১১৬-১১৭ হল ১২০ নং আয়াতে যে দাবী করা হয়েছে ইহুদী ও খৃষ্টানরা কখনই সন্তুষ্ট হবে না তার ব্যাখ্যা। প্রকৃতপক্ষে এই আয়াতদুটি ১২০ এর পরে আসা উচিত। ১১৮-১৯ আয়াতে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু বক্তব্য দেখা যায়, যার সাথে অন্য তিনটি আয়াতের কোন সম্পর্ক নেই। এই আয়াতদুটিকে অন্যকোথাও থেকে তুলে আনা হয়েছে। বেল আয়াতগুলিকে পরপর সাজিয়েছেন এইভাবে-

“ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন। বলে দিন, যে পথ আল্লাহ প্রদর্শন করেন, তাই হল সরল পথ। যদি আপনি তাদের আকাঙ্খাসমূহের অনুসরণ করেন, ঐ জ্ঞান লাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে, তবে কেউ আল্লাহর কবল থেকে আপনার উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী নেই। [ সুরা বাকারা ২:১২০]

তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। তিনি তো এসব কিছু থেকে পবিত্র, বরং নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু রয়েছে সবই তার আজ্ঞাধীন। [ সুরা বাকারা ২:১১৬ ]

তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবক। যখন তিনি কোন কার্য সম্পাদনের সিন্ধান্ত নেন, তখন সেটিকে একথাই বলেন, `হয়ে যাও' তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়। [ সুরা বাকারা ২:১১৭ ]

আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। [ সুরা বাকারা ২:১২১ ]”

কোরানের নিম্মোক্ত অংশেও সম্পাদনার চিহ্ন বর্তমান-

“তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভ্রাতৃকণ্যা; ভগিনীকণ্যা তোমাদের সে মাতা, যারা তোমাদেরকে স্তন্যপান করিয়েছে, তোমাদের দুধ-বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মাতা, তোমরা যাদের সাথে সহবাস করেছ সে স্ত্রীদের কন্যা যারা তোমাদের লালন-পালনে আছে। যদি তাদের সাথে সহবাস না করে থাক, তবে এ বিবাহে তোমাদের কোন গোনাহ নেই। তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রী এবং দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা; কিন্তু যা অতীত হয়ে গেছে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাকরী, দয়ালু” [সুরা নিসা,২৩]

এই আয়াতে পূর্নাঙ্গ বিবাহ আইন বর্ণিত হয়েছে যা স্বয়ংসম্পূর্ণ।বস্তুত আরবে তৎকালীন যুগে প্রচলিত আইনকেই ধর্মীয় নিয়ম হিসাবে কোরানের অন্তর্ভূক্ত করা হল।তার পরের আয়াত দেখুন-

এবং নারীদের মধ্যে তাদের ছাড়া সকল সধবা স্ত্রীলোক তোমাদের জন্যে নিষিদ্ধ; তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক হয়ে যায়-এটা তোমাদের জন্য আল্লাহর হুকুম। এদেরকে ছাড়া তোমাদের জন্যে সব নারী হালাল করা হয়েছে, শর্ত এই যে, তোমরা তাদেরকে স্বীয় অর্থের বিনিময়ে তলব করবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য-ব্যভিচারের জন্য নয়। অনন্তর তাদের মধ্যে যাকে তোমরা ভোগ করবে, তাকে তার নির্ধারিত হক দান কর। তোমাদের কোন গোনাহ হবে না যদি নির্ধারণের পর তোমরা পরস্পরে সম্মত হও। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিজ্ঞ, রহস্যবিদ” [সুরা নিসা,২৪]

“আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন মুসলমান নারীকে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না, সে তোমাদের অধিকারভুক্ত মুসলিম ক্রীতদাসীদেরকে বিয়ে করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞাত রয়েছেন। তোমরা পরস্পর এক, অতএব, তাদেরকে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর এবং নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে মোহরানা প্রদান কর এমতাবস্থায় যে, তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে-ব্যভিচারিণী কিংবা উপ-পতি গ্রহণকারিণী হবে না। অতঃপর যখন তারা বিবাহ বন্ধনে এসে যায়, তখন যদি কোন অশ্লীল কাজ করে, তবে তাদেরকে স্বাধীন নারীদের অর্ধেক শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ ব্যবস্থা তাদের জন্যে, তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে ভয় করে। আর যদি সবর কর, তবে তা তোমাদের জন্যে উত্তম। আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়”[সুরা নিসা,২৫](৪)

পরিস্কারভাবে আয়াত ২৪ এ বিকল্প সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বেলের মতে সাম্রাজ্য বিস্তূত হওয়ার ফলে পরবর্তীকালে বিবাহ আইনের কিছু শিথিলতা প্রয়োজন হয়ে পরে। তখন নতুন আয়াত যুক্ত করে নতুন পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা হয়। প্রসঙ্গত সুরা নিসা আর সুরা বাকারা ইসলামী আইনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন উপাদান।

কোরানিক শব্দ হুর (Hur) সাধারনভাবে কুমারী অর্থে অনুবাদ হয়ে থাকে। হুর শব্দটি শোনেন নি এরকম ব্যক্তি বাংলা অন্তর্জালে অন্তত পাওয়া যাবে না।কোরানের আল্লা প্রত্যেক জান্নাতিকে ৭২ টা হুর দেবার প্রতিজ্ঞা করেছেন। সমস্যা হল একজন ব্যক্তি ৭২ টা কুমারী নিয়ে করবেটা কি! তাও আবার কোরান অনুসারে মুনিন বান্দারা তাদের বিবিদের নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন [সুরা যুখরুফ,৭০]। এর থেকে হাস্যকর বৈপরীত্য আর কিছু হতে পারে না, যদি না কল্পনা করা হয় যে পার্থিব স্ত্রীরা দুঃখ ও ঈর্ষা নিয়ে হুরের সাথে তাদের স্বামীদের লীলাখেলা দেখবে। অনেকেই শুনলে অবাক হবেন যে হুর শব্দের আভিধানিক অর্থ হল শুধুমাত্র সাদা। কোরান অনুবাদকরা এর অর্থ করেছেন শ্বেতচক্ষুবিশিষ্ট, বৃহৎ চক্ষুবিশিষ্ট, লাস্যময়ী ইত্যাদী। এখন কোন নারীর চোখের প্রশংসায় কি সাদা চোখ অভিধা ব্যবহার হয় নাকি হওয়া সম্ভব। সাহিত্যে সুন্দরী রমনীর হয় কালো চোথ না হলে নীল চোখের বর্নণা ঝুড়ি ঝুড়ি পাওয়া যায়; কিন্তু সাদা চোখ নৈব নৈব চ। আরবীতে কুমারীর প্রতিশব্দ হল হুরী (Houri)। কোরানে তাহলে হুরীর বদলে হুরের উল্লেখ করা হল কেন? পূর্বোক্ত এক্ষেত্রেও গবেষক ক্রিস্তোফ লুক্সেমবার্গ অসাধারণ বিশ্লেষনের সাহায্যে সমস্যার সমাধান করেছেন। যে সমস্ত প্রসঙ্গে হুর উল্লিখিত হয়েছে, সেগুলী খতিয়ে দেখে তার অভিমত এখানে প্রকৃতপক্ষে সাদা কিশমিস অর্থ্যাৎ আঙুরের কথা বলা হয়েছে। আজ্ঞে হ্যাঁ, আঙুর- এবং এটি খৃষ্টীয় স্বর্গের ধারণার সাথে পরিপূর্নভাবে মিলে যায়। বহু খৃষ্টীয় শ্লোকে স্বর্গের দ্রাক্ষাকুঞ্জের সন্ধান পাওয়া যায়। লুক্সেমবার্গ নিজেই একটির উল্লেখ করেছেন- সিরিয় সেন্ট এফ্রাইমকৃত খৃষ্টীয় চতুর্থ শতকের একটি শ্লোক যেখানে স্বর্গীয় দ্রাক্ষাকুঞ্জের উল্লেখ আছে। লুক্সেমবার্গের মতে, আরবীতে দ্রাক্ষাকুঞ্জ ব্যকরণগতভাবে স্ত্রীলিঙ্গ, এর থেকেই কোরানের ভূল ব্যাখ্যা প্রচলিত হয়ে থাকবে(৫)।





Ref:

1. Luxemberg, Syro-Armaic

2. Ibn Rawandi, On Pre-Islamic Christian Strophic Poetical Texts in the Koran: acritical look at the work of Gunter Luling” in Ibn Warraq “What the Koran really says”

3. Ibn Rawandi, On Pre-Islamic Christian Strophic Poetical Texts

4. Richard Bell, “From Introduction to Koran” in Ibn Warraq Ed “What the Koran really says”

5. Robert Spencer, “Did Muhammad Exist”









মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব – ৭

আরবী কোরানের অনারবীয় উৎস:


আগের পর্বে হাদিসগুলির অন্তঃসারশূন্যতা আমরা দেখেছি। এই পর্বে হাদিস সংকলেনর ইতিবৃত্ত আলোচনা করার কথা ছিল। বিশেষ কারণবশত দুই পর্বের জন্য হাদিস আলোচনা স্থগিত রাখলাম। তার বদলে আমরা এই পর্বে কোরান নিয়ে আলোচনা করব। মুসলিমদের কাছে কোরান আল্লার বাণী, আল্লা নিজেই বলেছেন এই সেই গ্রন্থ যাতে কোন ভূল নাই। অতএব কোন ধার্মিক মুসলিমের পক্ষে কোরানের কোন ভূল খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবটা হল কোরানের ভাব ও ভাষা দুটোই এমন মাত্রায় এলোমেলো আর দুর্বোধ্য যে তাফসিরের সাহায্য ছাড়া সরাসরি আরবী কোরান পড়ে এর অর্থ বোঝা অসম্ভব। কোরানে আরবী ব্যাকরণের আদ্যোশ্রাদ্ধ করা হয়েছে। কোরানে আরবী ব্যকরণের সাধারণ নিয়মাবলী ও বাক্যগঠনগত দিক থেকে অন্তত একশটি ভূল পাওয়া যায়(১)। ব্যাকরণগত ভূলগুলি এখানে আলোচনা করা সম্ভব হল না। আলী দস্তি রচিত ‘বিশত ও সেহ সাল’ (ইংরাজীতে 23 Years) গ্রন্থের সংশ্লিষ্ট অংশে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মুসলিমদের মধ্যে গোড়ামি ও অত্যুক্তি চেপে বসার আগে বহু ধর্মীয় দার্শনিক যেমন মুতাজিলা দার্শনিক ইব্রাহিম আন-নাজ্জাম (৭৭৫-৮৪৫) খোলাখুলি স্বীকার করেছেন কোরানের বিন্যাস ও বাক্যগঠন অলৌকিক কিছু নয় এবং অন্য কোনো খোদাভীরু মানুষের পক্ষে একই ধরনের কাজ এর থেকেও বেশী সাহিত্যমানসম্পন্ন কাজ করা সম্ভব।



আলী দস্তির মতে- 

 “কোরানের বাক্যসমূহ অসম্পূর্ণ এবং সম্পূর্ণভাবে বোধগম্য হবার ক্ষেত্রে এগুলির ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। এতে অনেক বিদেশি শব্দ, অপ্রচলিত আরবি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং অনেক শব্দ রয়েছে যেগুলোকে স্বীয় সাধারণ অর্থে ব্যবহার করা হয়নি। লিঙ্গ এবং সংখ্যার অন্বয়সাধন না করে বিশেষণ এবং ক্রিয়াপদের ধাতুরূপ করা হয়েছে। অনেক সময় সংশ্লিষ্টতা নেই এমন অপ্রয়োজনীয় ও ব্যাকরণগতভাবে ভুল সর্বনাম পদ ব্যবহার করা হয়েছে এবং ছন্দবদ্ধ অনুচ্ছেদসমূহে এমন অনেক বিধেয় পদ ব্যবহার করা হয়েছে যার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদে আলোচ্য মূল বিষয়ের সাথে এগুলোর কোনো মিল নেই। ফলে ভাষাগত এমন অনেক অগ্রহণযোগ্য বিষয়াদি কোরানের সমালোচকদের (যারা কোরানের বোধগম্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন) সমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। এই সমস্যাগুলো নিষ্ঠাবান মুসলমানদের মনেও যথেষ্ট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ফলে কোরানের তফসিরকারকরা কোরানের বক্তব্যের ব্যাখ্যা খুঁজতে বাধ্য হয়েছেন। কোরান অধ্যয়নের ক্ষেত্রে মতভিন্নতার পিছনে যেসব কারণ রয়েছে, এ বিষয়টি তাদের মধ্যে অন্যতম।“

....... বলা বাহুল্য, কোরানের তফসিরকারকদের এই অসংলগ্নতাগুলোকে ব্যাখ্যা এবং সমর্থনীয় করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। তাঁদেরই একজন হচ্ছেন পারস্যের বিখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত ও ভাষাবিদ এবং জার-আল্লাহ (আল্লাহর প্রতিবেশি) খেতাবে ভূষিত আলজামাখশারি, পুরো নাম আবু আল-কাশিম মাহমুদ ইবনে উমর আল-জামাখশারি (জন্ম হিজরি ৪৬৭ বা ১০৭৫ খ্রিস্টাব্দ-মৃত্যু হিজরি ৫৩৮ বা ১১৪৪ খ্রিস্টাব্দ) যার সম্পর্কে একজন মুরীয় (উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার আরব মুসলমান) লেখক বলেছেন, ‘ব্যাকরণঅনুরাগী এই তাত্ত্বিক একটি গুরুতর ভুল করেছেন। আরবি ব্যাকরণের সাথে মিল রেখে কোরান পড়ানো আমাদের দায়িত্ব নয়। বরং আমাদের উচিত সম্পূর্ণ কোরান যেভাবে আছে সেভাবে একে গ্রহণ করা এবং আরবি ব্যাকরণকে এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা” (আলী দস্তি, নবী মুহম্মদের ২৩ বছর)


মুসলিম স্কলারদের এইরকম চরম অবস্থানের ফলে আমাদের অমুসলিম স্কলারদেরই অনুসরণ করতে হবে যারা প্রকৃতই নির্মোহভাবে সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছেন। দেখা যায় কোরান বারবার বলেছে যে তা আরবী ভাষায় লিখিত- দ্রষ্টব্য ১৬:১০৩,১৩:৩৭,২৬:১৯২-৯৫,১২:১,৪৩:৩। সুরা শুয়ারার ১৯৫ নং আয়াত অনুসারে কোরান সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় নাজিল হয়েছে। কোরানের ভাষা কি রকম স্পষ্ট তা এমনকি যে কোরানের মূলানুগ অনুবাদও পড়ার চেষ্টা করেছে সেই জানে! গবেষকরা জানাচ্ছেন কোরানের প্রতি পাঁচটার বাক্যের একটির কোনই অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না (ভাষাবিদ গার্দ-র পুইনের মত, অধিকাংশ অমুসলিম স্কলার সমর্থন করেছেন)। আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন পরিস্কার আরবী ভাষায় লিখিত আল্লার বাণী কোরানের অন্তত পাঁচভাগের একভাগ সম্পূর্ণ অর্থহীন। অত্যন্ত যৌক্তিক যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হল কোরানের এই বিশাল ভাষাগত অসংলগ্নতার কারণ কি? ঠিক এইখান থেকেই আমরা আমাদের অনুসন্ধান শুরু করব। কারণ এইখানেই ইসলামী ইতিহাসের প্রবল তাৎপর্যপূর্ণ অথচ প্রায় অনোলোচিত বিষয় লুকিয়ে আছে।



কোরান কেন তা আরবী ভাষায় লিখিত বলে বারবার দাবী করছে। সুরা নাহলের ১০৩ নং আয়াতে দেখা যায়- “আমি তো ভালভাবেই জানি যে, তারা বলেঃ তাকে জনৈক ব্যক্তি শিক্ষা দেয়। যার দিকে তারা ইঙ্গিত করে, তার ভাষা তো আরবী নয় এবং এ কোরআন পরিষ্কার আরবী ভাষায়”। কুরাইশরা নাকি কোরানের পার্থিব উৎসের দিকে ঈঙ্গিত করাতে এই আয়াত নাজিল হয়েছিল। সিরাত লেখক ইবনে ইশাক এই আয়াতে উল্লিখিত অনারব ব্যক্তির পরিচয় দিয়েছেন - তিনি হলেন খৃষ্টান ধর্মালম্বী জাবর, বানু আল-হাঁদরামির ক্রীতদাস যার থেকে মুহম্মদ শিক্ষা নিতেন বলে কথিত রয়েছে। আমি অল্প কয়েকটা আয়াত উপরে উল্লেখ করেছি প্রকৃতপক্ষে অজস্র আয়াতে একই ধরণের বক্তব্য পাওয়া যাবে। এখন মূল ওল্ড টেস্টামেন্ট পড়তে গিয়ে কি কোন ব্যক্তির সন্দেহ জাগে যে এটি হিব্রু ভাষায় রচিত নয়। গীতা পড়তে গিয়ে কারো কি মনে হয় যে তিনি যেটা পড়ছেন সেটা ধ্রুপদী সংস্কৃত নয়। তাহলে কোরান সম্পূর্ণ অপ্রাসাঙ্গিক বিষয় বারবার কেন উল্লেখ করছে? বারংবার অপ্রাসঙ্গিকভাবে আরবীর উল্লেখ কি কিছু ঈঙ্গিত করছে? তবে কি কোরান আসলে আরবী ভাষায় লিখিত ছিল না?



যদি কোন আলেমের কাছে যান তিনি বলবেন কোরানের সবচেয়ে রহস্যময় অংশ হল আলীফ-লাম-মীম; চোদ্দোশ বছরেও এর অর্থ বোঝা যায় নাই- এর অর্থ শুধু আল্লাহই জানেন। আমাদের আল্লার মোনোপলিতে হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না। অতএব চলেন আলীফ-লাম-মীম ছেড়ে আমরা অন্য কয়েকটি কোরাণিক শব্দ নিয়ে নাড়াচাড়া করি। কোরানে বিস্তর শব্দ আছে যেগুলো আরবী ভাষার শব্দ তো নয়ই জানা কোন ভাষারই শব্দ নয়। কোরানের তাফসিরকারক ও অনুবাদকরা এইসব শব্দের একেকরকম অর্থ করেছেন। সাধারণভাবে মুসলিম স্কলাররা এইসমস্ত বিষয়ে একমত হলেও তাদের ঐক্যমত্য কোন ভাষাতাত্বিক বিবেচনা থেকে নয় বরং তারা শুধুমাত্র একেকজন স্কলার তাদের পূর্বসূরীকে অনুসরণ করেছেন। এর অর্থ হল তারা কোন একটি প্রথার অনুসরণ করেছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা একেবারেই একমত হতে পারেন নি। কোরানের ১০৮ নং সুরার নাম হল আল-কাওসার। এই সুরার প্রথম আয়াতে বলা হচ্ছে “নিশ্চয় আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি”। কিন্তু কাওসার বস্তুটি কি?এই সুরার বাইরে সম্পূর্ণ অপরিচিত। সাধারণভাবে কোরান অনুবাদকরা এর অর্থ করেছেন প্রাচুর্য বা আধিক্য। জনপ্রিয় তাফসির তাফসির আল-জালালাইন ব্যাখ্যা করেছে - কাওসার হল জান্নাতের উদ্যানে অবস্থিত একটি নদী যার মাধ্যমে সেখানকার অধিবাসীদের জল দেওয়া হয়। এর অর্থ অসীম মঙ্গল নবুয়ুৎ, কোরান, ইবাদত ও অনান্য বস্তুর আকারে(২)। অনান্য কোরাণিক স্কলাররা আদৌও নিশ্চত নন। কোরান বিশেষজ্ঞ আল-কুরতুবী (১২৭৩ খৃষ্টাব্দ) কাওসার শব্দের ১৭টি অর্থ দিয়েছেন আরেক বিশেষজ্ঞ কুরতুবীর সমসাময়ীক ইবন আন-নাকিব (১২৯৮খৃষ্টাব্দ) দিয়েছেন ২৬ টি। বোঝাই যায় তাদের শব্দটির অর্থ জানা ছিল না। তারা প্রকৃতপক্ষে সর্বোচ্চ সংখ্যক আন্দাজ করছিলেন।




এইরকম আরেকটি শব্দ হচ্ছে ‘কালালা’ (৪:১২)। ঐতিহাসিক ও কোরান বিশেষজ্ঞ মু্হম্মদ ইবনে জারির আট-তাবারী (৮৩৯-৯২৩) তিনটি পৃথক সনদ অনুসরণ করে শব্দটির তিনটি পৃথক অর্থ ধায্য করেছেন। সুরাটি থেকে আদপেই এর অর্থ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। আরেকটি শব্দ হল সিজ্জিন (৮৩:৭-৯) । যেটি আরবী শব্দ নয় এবং অন্য কোন ভাষারও শব্দ নয়। তাফসিরকারকরা জানাচ্ছেন সিজ্জিন হল এমন একটি জায়গা যেখানে পাপীদের আমলনামা রাখা হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সিজ্জিনের অর্থ শুধু পাপীদের আমননামা। পূর্বেই বলা হয়েছে এই ধরণের অনুমানের পেছনে যেসব ভাষাতাত্বিক বিবেচনা দেখানো হয় সেগুলো যে দুর্বল শুধু তাই নয় একেবারে যদৃচ্ছ। একই ধরণের শব্দ সিজিল (sijill) পাওয়া যায় সুরা আম্বিয়ার ১০৪ নং আয়াতে- “সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব সিজ্জিলের মতো” আরবেরীর মতো কোরান অনুবাদকরা সিজিলের অনুবাদ করেছেন স্ক্রল বা গুটানো দলিল। কিন্তু সিজ্জিল একটি নামবাচক বিশেষ্যও হতে পারে। আর্থার জেফারী তার বই ‘The Foreign Vocabulary of Qur’an’ এ দেখিয়েছেন কোরানের আদি ব্যাখ্যাকারদের এই শব্দটির অর্থ পুরোপুরি অজানা ছিল। চতুর্দশ শতাব্দীর জনপ্রিয় তাফসিরকারক ইবনে কাসীর তার প্রবর্তিত তাফসিরে লিখেছেন- “সিজিল বলতে যা বোঝায় তা হল কিতাব। আস-সুদ্দী এই আয়াতের বিষয়ে বলেছেন- আস-সিজিল একজন ফিরিস্তা যার উপর দলীল রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে; যখন কোন ব্যক্তি মারা যায় তার আমলনামা আস-সিজিলের কাছে চলে যায়”। জেফারীর মতে সিজিল কোন আরবী শব্দই নয়। এই শব্দটি এসেছে গ্রীক ‘sigillion’ থেকে যার অর্থ রাজকীয় ফরমান। বিতর্ক রয়েছে সুরা আল ইখলাসের ২ নং আয়াত – ‘আল্লা-হুসসামাদ’(Allahu as-samad) নিয়েও। আবদুল্লা ইউসুফ আলী আয়াতটির অনুবাদ করেছেন Allah, the eternally Besought of all। আরবেরী অনুবাদ করেছেন God, the everlasting Refuge। কিন্তু তাদের কেউই নিশ্চিত ছিলেন না যে as-samad বলতে কি বোঝায়। তাবারি এই শব্দটির অনেকগুলি অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। সবকিছু ক্ষতিয়ে দেখে ঐতিহাসিক ফ্রানজ রোসেনথাল সিদ্ধান্ত করেন যে as-samad প্রকৃতপক্ষে ছিল উত্তর-পশ্চিম সেমিটিক ধর্মীয় পরিভাষা। মনে হয় মুহম্মদ বা যিনি কোরান সংকলন করেছিলেন তিনিও এর অর্থ জানতেন না।



ওল্ড টেস্টামেন্টের সাথে যদি মিলিয়ে দেখেন আপনার চোখে পড়বে প্রায় সমস্ত পৌরাণিক কাহিনী এক থাকলেও চরিত্রগুলির নাম অনেকাংশে পালটে গেছে। ফ্যারাও হয়ে গেছে ফেরাউন, মোজেস হয়ে গেছে মুসা, বাইবেলের নোয়া হয়ে গেছে নুহ, আব্রাহাম হয়ে গেছে ইব্রাহিম, জেসাস অর্থ্যাৎ যীশু হয়ে গেছেন ইশা (যদিও এই বিষয়টি বাকিগুলোর থেকে আলাদা), রাজা ডেভিড হয়ে গেছে দাউদ, যীশুর মা মেরী হয়ে গেছেন মরিয়ম। কারণটা আর কিছুই নয় কোরানে এই নামগুলি সরাসরি হিব্রু থেকে নেওয়া হয়নি, বরং সিরিয়াক থেকে নেওয়া হয়েছে। কোরানে সিরিয়াক ভাষার প্রভাব এখানেই শেষ নয়; পাঠকরা শুনে চমকে উঠবেন বহুল প্রচলিত প্রায় সমস্ত ধর্মীয় পরিভাষা যেমন ১. আয়াত ২. কাফির ৩. সালাত ৪. নাফস ৫. জন্নৎ ৬. তাঘুত ৭. মসিহ প্রকৃতপক্ষে সিরিয়াক উৎস থেকে আগত। খৃষ্টান বোঝাতে কোরানে নাসারা শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দটি সিরিয়াক ভাষা থেকে আগত কারণ সিরিয়াক ছাড়া আর কোন ভাষা নেই যেখানে এর কাছাকাছি কোন প্রতিশব্দ আছে। (রোমান সাম্রাজ্যে এমনকি আংশিকভাবে পারসীক সাম্রাজ্যেও অখৃষ্টানরা খৃষ্টানদের nasraye নামে ডাকত। সেখান থেকেই সিরিয়াক ভাষায় পদটি এসে থাকবে।)(3)



শুধুমাত্র ধর্মীয় শব্দই নয় কোরান সাংস্কৃতিক ও আইনগত শব্দও সিরিয়াক থেকে ধার করেছে। সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হল জিজিয়া(4)।কোরানে সিরিয়াক প্রভাব শুধু শব্দ ধার নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেমিটিক ভাষার প্রবাদপ্রতিম গবেষক আলফোনসে মিঙ্গানা (১৮৭৮-১৯৩৭) কোরানের বাক্যগঠনের উপর সিরিয় ব্যাকরণের প্রভাব তুলে ধরেছেন। মিঙ্গানা দেখিয়েছেন যে সুরা বাকারার ৮৫ নং আয়াতের অংশ যার সাধারণভাবে অনুবাদ হয়ে থাকে – “তোমারাই তো সেই লোক যারা পরস্পর খুনোখুনি করছ” আরবী ভাষায় যথেষ্ট অদ্ভুত বাক্যগঠন। কারণ সাপেক্ষ সর্বনাম ছাড়াই নির্দেশক সর্বনামের ব্যাবহার আবরীর বৈশিষ্ট নয় বরং সিরিয়াক ভাষার বৈশিষ্ট। এই ধরণের গঠন কোরানে বেশ কিছু পাওয়া যায় যেগুলী সিরিয় ব্যাকরনের আলোকেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। এরকম আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় – “তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যদি কেউ হাতছাড়া হয়ে কাফেরদের কাছে থেকে যায়” (৬০:১১)। এখানে স্ত্রী অর্থে ‘শাই’ (Shai) শাই শব্দটি রয়েছে যা আদৌ মানুষ বোঝাতে ব্যাবহৃার করা হয় না। এইরকম সাংঘাতিক অসংলগ্নতার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তাফসিরকারক ও অনুবাদকরা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক সমঝোতা করতে বাধ্য হয়েছেন।



সিরিয়াক প্রকৃতপক্ষে আরামায়িক ভাষার একটি উপভাষা। একে সিরিয়-আরামায়িক নামেও উল্লেখ করা হয়। ইসলামের উত্থানের যুগে সিরিয়াকের ব্যাপক প্রচলন ছিল। যিনিই কোরান সংকলন করে থাকুন না কেন দেখে মনে হয় আরবী ভাষার থেকে তার সিরিয়াক ভাষাতেই দখল বেশী ছিল। তবে কি কোরান প্রাথমিকভাবে ছিল সিরিয়াক গ্রন্থ যেটা পরবর্তীকালে খৃষ্টধর্ম থেকে আলাদা (পঞ্চম পর্ব দ্রষ্টব্য) পৃথক ধর্ম হিসাবে ইসলামকে ভিত্তি দেওয়ার প্রয়োজনে আরবীতে অনুবাদ করা হয় এবং মৌলিক আরবী গ্রন্থ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়? সেক্ষেত্রে অবশ্য কোরানের ভাষাগত অসংলগ্নতার দায় অনায়াসে অযথার্থ অনুবাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া যায়। পরের পর্বে আমরা দেখব শুধুমাত্র ভাষাতাত্বিক বিবেচনাই যথেষ্ট নয় অসংলগ্নতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য, আরো কিছু উপাদান পাশাপাশি কাজ করেছে। এই অনুমান মেনে নিলে কোরানের বারংবার আরবী গ্রন্থ হিসাবে দাবীরও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। প্রবাদে আছে না- অতিভক্তি.....
















1. Ali Dasti; “23 Years”



2. Al-Mahali and as-Suyuti, Tafsir al-Jalalayn


3. কোন শব্দের এতগুলী অর্থ থাকতেই পারে না। কোন শব্দের পরস্পর থেকে পৃথকযোগ্য চার-পাঁচটির বেশী অর্থ থাকলেই তার ব্যবহার সেই ভাষায় যথেষ্ট ambiguity বা দ্বার্থকতার সৃষ্টি করবে। ফলে দ্বার্থকতার নিরসন করার জন্য শেষ পর্যন্ত্য শব্দটির ব্যবহার কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে সীমিত হয়ে যাবে। অর্থ্যাৎ শব্দটি আর এতগুলী অর্থে ব্যাবহার হবে না।


3. Alphonse Mingana “Syriac Influence on the Style of the Koran” in Ibn Warraq “What the Koran Really Says”