শনিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৬

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-৩

অমুসলিম উৎসে ইসলাম ও মুহম্মদের উল্লেখ

টেকনিক্যাল আলোচনায় ঢোকার আগে প্রথমেই বলে নিতে চাই প্রাচীন আরবী লিপির পাঠোদ্ধারের কোন পদ্ধতিই একেবারে বিতর্কমূক্ত নয়। এটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা গবেষকদের কোন দোষ নয়। কারণপ্রথমত- আরবী বর্ণমালায় স্বরধ্বনিগুলির জন্য নির্দিষ্ট কোন বর্ণ নেই। ব্যঞ্জনবর্নগুলির উপরে নিচে নানারকম চিহ্নের সাহায্যে স্বরধ্বনিগুলির উচ্চারণ বোঝানো হয়।(আরবী বর্ণমালার প্রথম বর্ণ হল আলেফযা অবস্থানগতভাবে রোমান বর্ণমালার ‘a’ এর সমতুল্য। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সব ধরণের দীর্ঘস্বরের ব্যবহার বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়।)  শুধু আরবী লিপি নয় সিরিয়াকহিব্রুআরামায়িকফিনিশিয় সমস্ত সেমিটিক ভাষাশ্রয়ী লিপিগুলিতেই এই বিশেষ প্যাটার্ন দেখা যায়। দ্বিতীয়তশুধু তাই নয় অনেকগুলি আরবী বর্ণই দেখতে প্রায় একই রকম যেমন উদাহরণস্বরূপ আরবী বর্নমালার পঞ্চম বর্ন ‘জিম’ [ج], ষষ্ঠ বর্ণ ‘হা’ [ ح], সপ্তম বর্ণ ‘খা’ [خদেখতে অনেকটা একি রকম। এদের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে শুধু একটি ফুটকিতে। প্রাচিন লিপিতে অনেক সময়ই এইসমস্ত চিহ্নগুলি না থাকায় বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে পার্থক্য করা দুস্কর হয়ে পরে। কোন প্রাচীন আরবী বিবরনেই এইসব চিহ্ন পাওয়া যায় না। এমনকি প্রাচীন কোরানের যে সমস্ত পুথি পাওয়া গেছে সেখানেও এই সমস্ত চিহ্নগুলি অনুপস্থিত। এর বিরাট তাৎপর্য আমরা কোরান সংক্রান্ত আলোচনার সময় দেখব।

নিশ্চয়ই নীরস ভাষাতাত্বিক আলোচনায় হাঁফিয়ে উঠেছেন। চলেনইতিহাসের জটিল শূড়িপথ ধরে ইসলামের অনুসন্ধানে ফিরে যাই।তবে একটি বিষয়ে প্রথমেই পাঠকদের কাছ থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে চাই তা হল এখানে সর্বক্ষেত্রেই ঐতিহাসিক বিবরণগুলির আমি মূলানুগ ভাবানুবাদ করেছি। ঐতিহাসিক গবেষকদের মতো পূর্নাঙ্গ আক্ষরিক অনুবাদ করার মতো সময় ও রিসোর্স দুটোর কোনটাই নেই আর তার প্রয়োজনও নেই। ভাষাতাত্বিক আলোচনার ক্ষেত্রে আমি রোমান হরফ ব্যবহার করব কারণ বাংলা হরফ দিয়ে অনেক সুক্ষ পার্থক্য বোঝানো সম্ভব হবে না।

সপ্তম শতাব্দীর একটি সিরিয়াক ম্যানুস্ক্রিপ্টে মুহম্মদের উল্লেখ আছে বলে মনে করা হয়েছে।

এজি ৯৪৫৮নং ইনডিকশনশুক্রবার ৪ ফেব্রুয়ারী [অর্থাৎ ৬৩৪ খৃষ্টাব্দ/ ১২ হিজরীজ্বিলকদ মাস]নবম প্রহরে প্যালেষ্টাইনের গাজার ১২ মাইল পূর্বে রোমানদের সাথে মহম্মদের আরবদের (সিরিয়াক-tayyāyē d-hmt) একটি যুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। রোমানরা পালিয়ে যায়প্যাট্রিশিয়ান YRDN (সিরিয়াক BRYRDN) কে ফেলেযাকে আরবরা হত্যা করে। প্রায় ৪০০০ প্যালেষ্টাইনি অসহায় গ্রামবাসীক্রিশ্চিয়ানইহুদী ও সামারিটাননিহত হয়েছে। আরবরা পুরো এলাকায় ধংসযজ্ঞ চালিয়েছে


সিরিয়াক tayyāyē শব্দের আদত অর্থ যাযাবরপরবর্তী নথিতে এই শব্দটি দ্বারা বিজয়ী আরবদের বোঝানো হয়েছে। তাই থেকে এক ঐতিহাসিক রবার্ট.জি.হলান্ড tayyāyē d-hmt –এর অনুবাদ করেছেন মুহম্মদের আরবরা। পাঠক লক্ষ করুন নামবাচক শব্দের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ব্যঞ্জনধ্বনিগুলি লিপিকৃত করা হচ্ছে। কিন্তু আসল সমস্যা হল-সিরিয়াক লিপি ‘t’ আর ‘d’ এর মধ্যে পার্থক্য করে। সেখানে মুহম্মদ শব্দটি ‘hmd’ এই আকারে পাবার কথা। যদি আমরা মেনেও নি এখানে tayyāyē d-hmt –এর সঠিক অনুবাদ ‘মুহম্মদের আরবরা’, তাহলেও এর থেকে মুহম্মদ সম্মর্কে কিছুই জানা যায় না।


৬৩৪ থেকে ৬৪০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে লেখা ডকট্রিনা জাকবি নামে আর একটি দলিল আমাদের কিছু তথ্য দেয়-
যখন ক্যানডিদেতাস [রোমান রাজকীয় রক্ষীবাহিনীর এক সদস্য] সারাসেনীয়দের দ্বারা হত হল তখন আমি ছিলাম সিজারিয়াতে এবং তারপর নৌকায় চড়ে রওনা দিলাম সায়কামিনার উদ্দশ্যে। লোকে বলছিল ক্যানডিদেতাস মারা গেছে আর আমরা ইহুদীরা অত্যন্ত খুশী হলাম। তারা আরো বলছিল একজন ধর্মপ্রচারক আবির্ভূত হয়েছেনতিনি আসছেন সারাসেনীয়দের সঙ্গেএবং আগমন ঘোষনা করেছেন অভিষিক্তজনেরখৃষ্ট- যার আসার কথা ছিল
সায়কামিনায় আসার পর আমার সাথে একজন ধর্মজ্ঞানী বৃদ্ধ মানুষের দেখা হল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “ সারাসেনীয়দের মধ্যে যে নবী আবির্ভূত হয়েছেন তার বিষয়ে তুমি কিছু জানাতে পার?” সে কাতর স্বরে বলল “ সে হল ভূয়াকারণ ধর্মপ্রচারকরা তলোয়ার হাতে আসেন না। আজকে চারদিকে যে বিশৃঙ্খলা চলছে তাতে আমি আতঙ্কিত যেপ্রথম খৃষ্ট খৃষ্টানরা যার আরাধনা করে তিনি ঈশ্বর দ্বারা প্রেরিত হয়েছিলামকিন্তু তার পরিবর্তে আমরা এখন এক খৃষ্টবিরোধীকে গ্রহন করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি।...........
.....অতএব আমিআব্রাহামখোঁজ করলাম এবং শুনলাম তাদের থেকে যারা তাকে দেখেছে যে এই তথাকথিত নবীর কোনই সত্যতা নেইশুধুই মানুষের রক্তপাত। সে আরো বলে যে তার হাতে রয়েছে স্বর্গের চাবিযা একেবারে অবিশ্বাস্য

মনোজোগী পাঠকরা নিশ্চই লক্ষ্য করেছেন এই বিবরণের সমস্যা কোথায়এই বিবরণে বর্ণিত নবী তখনও অর্থ্যাৎ ৬৩৪-৬৪০ খৃষ্টাব্দেও আরবদের মধ্যে সক্রিয়যেখানে ইসলামী বিবরণে বর্ণিত নবী মুহম্মদ কয়েক বছর আগেই মারা গিয়েছেন। এখানে ইসলাম বা কোরানের কোন উল্লেখ নেইএমনকি আক্রমনকারীদের মুসলিম বলেও অভিহিত করা হয়নিবলা হয়েছে সারাসেনীয়। অনান্য বহু সমসাময়িক দলিল পাওয়া গেছে কোনটিতেই ইসলামমুহম্মদ ও কোরানের কোনই উল্লেখ পাওয়া যায় না। কোরানের অনুপ্রেরণা বুকে নিয়েনবীর আদর্শকে সামনে রেখে যে দুঃধ্বর্শ মুসলিম বাহিনী আরবের মরুভূমি থেকে বেড়িয়ে এসে সারা মধ্যপ্রাচ্য জয় করে নেয়সাসানীয় সাম্রাজ্য তাদের হাতে বিধ্বস্ত হয় আর বাইজানটাইন সাম্রাজ্যকে এক বিরাট অংশ হারাতে হয়- আশ্চর্যের ব্যাপার সেই কোরান আর নবী মুহম্মদেরকেই ঐতিহাসিক দলিলে খুঁজে পাওয়া যায় না। মুমিন ভাইয়েরা নিশ্চয়ই বলবেন ইহুদী-নাসারা কাফেররা তাদের নবী আর কোরানের গুরুত্ব বুঝতে পারেনিতাই তাদের বিবরণে এর উল্লেখ পাওয়া যাবে না। কিন্তু আমি এক্ষুনি দেখাব যে সমকালীন ইসলামিক উৎসেও মুহম্মদ বা কোরানের কোন নামগন্ধ নেই।


খলিফা মুয়াবিয়ার আমলে ৬৭৭ বা ৬৭৮ খৃষ্টাব্দে নির্মিত একটি বাঁধে খোদিত আছে
-“ এই বাঁধ ঈশ্বরের দাস মুয়াবিয়ার, (অধীনস্ত)
বিশ্বাসীজনের সেনাপতি। আবদুল্লাহ বিন সাখর নির্মান করেছেন
ঈশ্বরের আদেশানুসারে ৫৮ সনে।
আল্লা! আপনার এই দাস মুয়াবিয়াকে মার্জনা করুন
বিশ্বাসীজনের সেনাপতিতার স্থান অনুমোদন করুন ও তাকে সাহায্য করুন এবং
বিশ্বাসীরা
তার অবস্থানে খুশী হোকলেখেন আমর বিন হাব্বাব/জনাব

মুয়াবিয়াকে বিশ্বাসীদের সেনাপতি বলা হয়েছে কিন্তু তার বিশ্বাস সম্পর্কে কিছুই জানা সম্ভব হয় না। একইভাবে ৬৮৮ খৃষ্টাব্দের এক লিপি যেটা মিশরের ফুসতাতে একটি সেতুর উপর পাওয়া গেছেতাতে বলা হচ্ছে-
এটাই সেই খিলান যা আমীরআবদ আল-আজিজ বিন মারওয়ানের আদেশে নির্মিত হয়েছে। আল্লা! তার সর্বকর্মে আশীর্বাদ করুনতার কর্তৃত্ব অনুমোদন করুন যেমনভাবে আপনি চান এবং তার ও তার পরিবারকে সর্বসুখী করুন। সাদ আবু উসমান নির্মান করেছেন এবং আবদ আর-রহমান লিখেছেন ৬৯ সনের সফর মাসে

এখানেও একইভাবে না মুহম্মদনা ইসলাম না কোরান। যেটা আমাদের সবচেয়ে বিস্মৃত করে সেটা হল ইসলামী প্রথা অনুসারে বিসমিল্লাহ-এর অনুপস্থিতি। ইসলামী প্রথায় যে কোন রচনার শুরুতে বিশমিল্লাহির রাহমানীর রহিম বা (পরম করুনাময় আল্লার নাম নিয়ে শুরু করছি) লেখা হয়ে থাকে। অথচ সপ্তম শতাদ্বীর একদম শেষভাগের আগে পর্যন্ত এ সম্পর্কে কেউ কিছু জানত বলে তো মনে হয় না। পরবর্তীকালে আমরা দেখব শাহাদা বা ইসলামে বিশ্বাসের ঘোষনা আবদ আল মালিকের শাসনকালের আগে চালু হয়নি।

আরেকবার মনে করিয়ে দিচ্ছি যেসব ইসলামী উৎসগুলি থেকে ইসলামের ইতিহাস জানা যায় সেগুলী বহু পরে রচিত। সমকালীন উৎস থেকে বিষয়গুলির সত্যতা প্রতিপাদনের চেষ্টা করলেই আমরা অবাক হয়ে দেখি যে সমকালীন উৎস আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দিচ্ছে। সমকালীন কোন বিস্তারিত ইসলামীক বিবরণ না থাকায় আমাদের নির্ভর করতে হয় অমুসলিম উৎসের উপর। অমুসলিম দলিল যেখানেই মুহম্মদইসলাম বা কোরানের উল্লেখ করেছে সেখানে কোন ক্ষেত্রেই প্রায় মুসলিম বিবরণের সাথে মেলে না। প্রথম যে অমুসলিম বিবরণ পাওয়া যায় যেখানে নিশ্চিতভাবে মুহম্মদের উল্লেখ আছে তা হল বিশপ সেবিওসের বিবরণ-
তারা যাত্রা শুরু করল মরুভূমির মধ্য দিয়ে এবং চলে এল আরবেইসমায়েলের পুত্রদের মধ্যেতারা তাদের সাহায্য প্রার্থনা করলএবং তাদেরকে ব্যাখ্যা করল যে তারা বাইবেল অনুসারে তাদের [আরবদের] আত্বীয়। যদিও তারা [ইসমেলাইটরা] এই আত্বীয়তা স্বীকার করতে প্রস্তুত তবুও তারা [ইহুদীরা] কখনই জনগনকে প্রত্যয়দানে সক্ষম হল নাকারণ তাদের ধর্মসম্প্রদায় ছিল পৃথক।
এই সময় সেখানে ছিলেন মহমেত নামে এক ইসমেলাইটএকজন বণিকতিনি নিজেকে তাদের সামনে উপস্থিত করলেন ঈশ্বরের আদেশপ্রাপ্তসত্যের পথচারীএক ধর্মগুরু হিসাবে তাদের আব্রাহামের ঈশ্বরকে জানতে শেখালেনকারণ তিনি জানতেন ও ভালভাবে মোসেসের কাহিনীর সাথে পরিচিত ছিলেন। যেহেতু স্বর্গ থেকে আদেশ এসেছেতাই তারা সবাই সেই মানুষের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হলএকি আইনের অধীনে এবং মিথ্যা ধর্মাচরণকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ফিরে গেল জীবিত ঈশ্বরের কাছে যিনি নিজেকে আব্রাহামের কাছে প্রকাশ করেছিলেন। মহমেত তাদেরকে নিষেধ করলেন মৃত পশুর মাংস খেতেমদ্যপান করতেমিথ্যা কথা বলতে ও ব্যাভিচার করতে। তিনি আরো বলেন “ঈশ্বর এই ভূমি আব্রাহামকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং বংশপরম্পরায় চিরকালে জন্যযিনি সেই প্রতিশ্রুতি অনুসারে চলেছেন কেননা তিনি ইসরায়েলকে ভালবাসতেন। এখন তোমরাইসরায়েলের পুত্ররাঈশ্বর তোমাদের দ্বারাই আব্রাহাম ও তার বংশধরদের দেওয়া সেই প্রতিশ্রতি পূর্ণ করবেন। এস এবং অধিকার কর সেই দেশ যা ঈশ্বর তোমাদের পিতা আব্রাহামকে দিয়েছিলেনকেউই তোমাদের প্রতিরোধ কলতে পারবে না কারণ ঈশ্বর আছেন তোমাদের সাথে


এর পরে আছে আরব ও ইহুদীদের মিলিত অভিযানের বিবরণ যার সাথে ইতিহাসের কোনই সম্পর্ক নেই। শুধু তাই নয় লেখক বহু স্থানের উল্লেখ করেছেন যেগুলীর উৎস হল বাইবেলের জেনেসিস। লেখক মনে হয় গোটা বিষয়টিকে পৌরাণিক চরিত্র দিতেই বেশী আগ্রহী ছিলেন বাস্তব ঘটনাবলী বর্ণনা করার চেয়ে। যদি আমরা মেনে নি এই বিবরণ বিকৃতভাবে হলেও কিছুটা ঐতিহাসিক সত্য উপস্থাপনা করেসেক্ষেত্রে আমরা ইসলামের আদি যুগের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র পাই যা এমনকি খোদ কোরানের সাথেই সংঘাতপূর্ণ- ‘অবশ্য মুমিনদের প্রতি শত্রুতায় ইয়াহুদী আর মুশরিকদেরই তুমি সর্বাধিক উগ্র দেখিবে’ (সুরা মায়েদা,  ৮২)। মুহম্মদের নির্দেশে মদিনার ইহুদীদের উপর অত্যাচার ও বিতারনের বিশদ বর্ণনা জানেন না এমন লোক বাংলা ব্লগ দুনিয়ায় পাওয়া যাবে না। শুধু তাই নয় কোরান যেখানে ইহুদীদের সর্বাপেক্ষা বড় শত্রু বলে অভিহিত করছে , সেখানে সমকালীন খৃষ্টান নথির এই বর্ণনা পুরো ইসলামী ইতিহাসের সত্যতা সম্পর্কেই প্রশ্ন তুলে দেয়।


বিশপ সেবিওস পরে উল্লেখ করেছেনমুয়াবিয়াতৎকালীন সিরিয়ার শাসনকর্তা এবং পরবর্তী খলিফা৬৫১ খৃষ্টাব্দে বাইজানটাইন সম্রাটকে একটি চিঠি পাঠান। তাতে তিনি সম্রাটকে খৃষ্টধর্ম ত্যাগ করে আব্রাহামের ঈশ্বরকে গ্রহন করতে বলেছেন
“ যদি শান্তিতে বাস করতে চাও... নিজের মিথ্যা ধর্ম ত্যাগ কর যে ধর্মে তুমি ছোটো থেকে প্রতিপালিত হয়েছ। ত্যাগ কর ওই যীশুকে এবং চলে এস মহান ঈশ্বর যার আমি ইবাদত করিআমাদের পিতা আব্রাহামের ঈশ্বরের কাছে।...... যদি না কর তবে যে যীশুযাকে তুমি খৃষ্ট বলে ডাকযে নিজেকেই বাঁচাতে পারেনি ইহুদীদের হাত থেকেসে তোমাকে আমার হাত থেকে কিভাবে বাঁচাবে


কোরান অনুসারে যীশু বা ঈশা নবীর মৃত্যু হয়নি- “....ইহা নিশ্চিত যে তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই (সুরা আল নিসাআয়াত ১৫৭) বরং আল্লাহ তাহাকে তাহার নিকট তুলিয়া লইয়াছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালীপ্রজ্ঞাময় (সুরা আল নিসাআয়াত ১৫৮) এখানে আবার আমরা দুই বিবরণের অসঙ্গতি ও বৈপরীত্যের সম্মুখীন হই। দ্বিতীয়তদ্বিতীয়ত বিশপ সেবিওসের এই চিঠিতে ইসলামের কেন্দীয় চরিত্র মুহম্মদের কোন উল্লেখ নেইতবে কি আদি ইসলামে মুহম্মদ কেন্দ্রীয় অবস্থানে ছিলেন নাকে বলতে পারে!
x

সোমবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৬

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-২

        
               ইসলামী ইতিহাসের আরবী  ভিত্তি ও উপরিকাঠামো

বাংলা ব্লগ দুনিয়ায় ইসলামের প্রানপুরুষ মুহম্মদকে নিয়ে শয়ে শয়ে লেখা আছে, কিন্তু তার সবটাই মুহম্মদ সংক্রান্ত ইসলামী বিরবণ কে মেনে নিয়ে, যার ঐতিহসিক সত্যতা কোন ভাবেই প্রতিপাদন করা সম্ভব নয়। এমনকি নাস্তিক ব্লগাররা ইসলাম ও মুহম্মদ নিয়ে প্রচুর প্রবন্ধ লিখলেও তার কোনটিতেই ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের চেষ্টা হয়নি এমনকি এ সংক্রান্ত বিশাল গবেষনা সম্পর্কে তারা অবগত আছেন বলেও তাদের লেখা দেখে মনে হয়না। একমাত্র মুক্তমনা ব্লগে কয়েক বছর আগে বিপ্লব পাল তার একটি প্রবন্ধে বিষয়টাকে বুড়ি ছুয়ে গিয়েছিলেন; এ ছাড়া আর কোন লেখা আমার চোখে পড়েনি। বিপ্লব পালের আর্টিকেলটি পড়ার পর থেকেই আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে থাকি এ সংক্রান্ত গবেষনালব্ধ তথ্যগুলি বিশদভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভব করি। ইষ্টিশন ব্লগে নিয়মিতভাবে এই সিরিজটি প্রকাশ করছি। যারা আরো ভালভাবে জানতে চাইবেন তারা সরাসরি  ইবনে ওয়ারাকের Origines of Koran  এবং রবার্ট স্পেনসারের Did Muhammad Exist বইদুটি দেখতে পারেন।

প্রকৃতপক্ষে সোভিয়েত প্রাচ্যবিদরা বিংশ শতাদ্বীর ৩০ এর দশক থেকেই ইসলামিক বিবরনের ঐতিহাসিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় সোভিয়েত ঐতিহাসিক ক্লিমোভিচ ইসলামকে একটি আন্দোলন হিসাবে দেখেছেন যা আদিতে ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। মুহম্মদ এই আন্দোলনের নেতৃত্বে এসে একে একটি ধর্মীয় চরিত্র দেন। একি সাথে আন্দোলন তার প্রগতিশীল ও দরদী চরিত্র হারায়। তার মতে মক্কা ছিল প্রধান বানিজ্যকেন্দ্র, মক্কার বাসিন্দারা ছিলেন প্রায় সকলেই ব্যবসায়ী। অথচ  বানিজ্যের প্রধান উৎস ছিল কাবার তীর্থযাত্রীগন, আর কাবার দখল ছিল কিছু ধনী কুরাইস পরিবারের হাতে। এই অল্পসংখ্যক ধনী কুরাইস পরিবারের বিরুদ্ধে দরিদ্রতর শ্রেনীর শ্রেনীসংগ্রাম হিসাবে ইসলাম জন্ম নেয়। আধুনিক ভাষাতাত্বিক গবেষনার আলোকে ক্লিমোভিচের এই বিশ্লেষন আদৌও গ্রহনযোগ্য নয়। কারণ আমাদের মক্কা থেকে ইসলামের উদ্ধব তত্বে সংশয় প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ আছে । শুধু তাই নয় প্যাট্রিসিয়া ক্রোন দেখিয়েছেন বানিজ্যকেন্দ্র হিসাবে মক্কার উল্লেখ সমকালীন (মুসলিম এবং অমুসলিম) কোন উৎসেই পাওয়া যায় না (Meccan trade: Patricia Crone)এটা হল এককথায় অবিশ্বাস্য ঘটনা কারণ বলা হয়েছে পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর দক্ষিনের সব বানিজ্যপথগুলি মক্কায় এসে মিলিত হত।মক্কার মাধ্যমেই ভারতের বিলাসদ্রব্য আরবের বনিকদের মাধ্যমে বাইজানটাইন সাম্রাজ্যে ঢুকত। ঐতিহাসিক ওয়াট বলেছেন- “by the end of sixth century A.D , (the Quraysh) had gained control of most of the trade from the Yemen to the Syria”কিন্তু দেখা যায় মুহম্মদের কথিত জন্মের ৫ বছর আগে ৫৬৫ খৃষ্টাব্দে লেখা ষষ্ঠ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক Procopius of Caesarea তার বিবরণে মক্কার কোন উল্লেখ করেননি। (মুসলিম ঐতিহাসিকরা অনেকসময় টলেমির বিবরনে প্রাপ্ত মাকোরাবা নামে একটি স্থানের উল্লেখ দেখিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন এটাই ইসলামের নবীর জন্মভূমি মক্কা।)বানিজ্যকেন্দ্র হঠাৎ করে গড়ে ওঠে না। কিন্তু সমসাময়িক গ্রিক, রোমান, আরামায়িক, সিরিয়ান কোন বিবরনেই মক্কার উল্লেখ নেই।

পৃথিবীর ম্যাপে মক্কার ভৌগলিক অবস্থান লক্ষ্য করেছেন, সবদিক থেকে সমস্ত বানিজ্যপথগুলো মক্কায় এসে মিলছে এর থেকে কষ্টকল্পনা আর কি হতে পারে। কি ভাবছেন! কাহিনী আরো বাকি আছে। একাদশ শতাব্দীর মুসলিম ঐতিহাসিক আল আজরাকি (১০৭০ সাল) ইসলামপূর্ব আরবের তীর্থস্থান যেমন মিনা, আরাফা, উকাজ, মাজান্না ইত্যাদীর নাম করেছেন কিন্তু মক্কার নাম নিতেই ভূলে গিয়েছেন। দ্বিতীয়বার ভাবনার পরে পরিশিষ্ট অংশে মক্কার স্থান হয়েছে। প্যাট্রিসিয়া ক্রোন এটাও দেখিয়েছেন উপজাতি অধ্যুষিত আরবে সমস্ত তীর্থস্থান অবস্থিত ছিল ফাঁকা মরুভূমিতে যেখানে কোন পক্ষেরই কর্তৃত্ব থাকত না, মক্কার মতো কোন শহরে নয়।(Meccan Trade: Patricia Crone)কোরানের আল্লা অবশ্য মক্কাকে একেবারে ভূলে যাননি, তিনি শুধু একবার মক্কার উল্লেখ করেছেন –
“ তিনি মক্কা উপত্যকায় উহাদের হস্ত তোমাদের হইতে এবং তোমাদের হস্ত উহাদের হইতে নিবারিত করিয়াছেন, উহাদের উপর তোমাদের বিজয়ী করার পর, তোমরা যাহা কিছু কর আল্লাহ তাহা দেখেন”[সুরা ফাতহ, আয়াত ২৪] (সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ কতৃক কোরানের বাংলা অনুবাদ থেকে গৃহীত)।

কিন্তু এ থেকে কিছুই বোঝার উপায় নেই।

মক্কা ও মদিনায় পুরাতাত্বিক খননকার্য চালাতে পারলে হয়ত এই রহস্যের সমাধান পাওয়া যেতে পারত। গবেষনার ফলাফল ইসলামের বিরুদ্ধে যেতে পারে এই আশংকায় সৌদি ও অনান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলি নিরপেক্ষ দলকে কোনরকম অনুসন্ধানের সুযোগই দেয় না। অতএব আমাদের পরোক্ষ উপাদানের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন উপায় নেই।
আসুন খানিকক্ষনের জন্য ইসলামী বিবরনের উপর আস্থা রাখি। নিচে ইসলামী ইতিহাসের একটি ক্রমবিবরণী দিয়ে দিলাম। যারা বিশদে ইসলামী ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় জানেন, তারা স্বচ্ছন্দে এই অংশটি বাদ দিয়ে যেতে পারেন:

৫৭০ খৃষ্টাব্দ: মুহম্মদের জন্ম

৬১০ খৃষ্টাব্দ: মু্ম্মদের নবয়ুৎ প্রাপ্তি

৬২২ খৃষ্টাব্দ: হিজরা বা মহম্মদ ও তার অনুগামীদের মদিনায় আশ্রয়লাভ

৬২৪ খৃষ্টাব্দ: বদর যুদ্ধ

৬২৫ খৃষ্টাব্দ: উহুদ যুদ্ধ

৬২৭ খৃষ্টাব্দ: খন্দক যুদ্ধ

৬২৮ খৃষ্টাব্দ:হুদাইবিয়ার সন্ধি

৬৩০ খৃষ্টাব্দ:মহম্মদের মক্কা বিজয়

৬৩২ খৃষ্টাব্দ: মহম্মদের মৃত্যু, খলিফায়ে রাসেদিনের শুরু

৬৩২-৩৩ খৃষ্টাব্দ: রিদ্দার যুদ্ধ, মুহম্মদের মৃত্যু সংবাদে ইসলামত্যাগ করে মূর্তাদ হবার ধুম পরে যায়। খলিফা আবু বকর এই বিদ্রোহীদের দমন করেন।

৬৩৩ খৃষ্টাব্দ: ইয়ামানার যুদ্ধ, সিরিয়ার ধর্মপ্রচারক মুসায়লামার অনুগামীদের বিরুদ্ধে মুসলিমরা যুদ্ধযাত্রা করে। মুসায়লামার জনপ্রিয়তা সম্ভবত মুহম্মদের থেকে কম ছিল না। যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৬৩৩ খৃষ্টাব্দ: আরবদের ইরাক আক্রমন

৬৩৪-৬৪৪ খৃষ্টাব্দ: খলিফা উমরের আমল

৬৩৬-৩৭ খৃষ্টাব্দ: আরবদের সিরিয়া ও প্যালেষ্টাইন জয়

৬৩৯ খৃষ্টাব্দ:    আরবদের আর্মেনিয়া ও মিশর জয়

৬৪৪ খৃষ্টাব্দ:    আরবদের পারস্য দখল

৬৪৪-৬৫৬ খৃষ্টাব্দ: খলিফা উসমানের আমল

৬৫৩ খৃষ্টাব্দ: উসমান কোরান সংকলিত করেন

৬৫০-৬০ খৃষ্টাব্দ: আরবরা উত্তর আফ্রিকা জয় করল

৬৫৪ খৃষ্টাব্দ: আরবদের সাইপ্রাস ও রোডস দখল


৬৫৬-৬৬১ খৃষ্টাব্দ: খলিফা আলির আমল
৬৬১ খৃষ্টাব্দ: আলির মৃত্যু, খলিফায়ে রাসেদিনের সমাপ্তি

৬৬১-৬৮০ খৃষ্টাব্দ: উমাইয়া শাসনের সূত্রপাত, মুআবিয়ার আমল

৬৭৪ খৃষ্টাব্দ খৃষ্টাব্দ: আরবদের কনস্ট্যানটিনোপল অবরোধ

৬৮০-৮৩ খৃষ্টাব্দ: প্রথম ইয়াজিদের শাসন

৬৮৫-৭০৫ খৃষ্টাব্দ: আবদ আল মালিকের শাসন। কিছু ইসলামী সূত্র অনুসারে তিনি কোরান সংকলিত করেন

৬৯১ খৃষ্টাব্দ: Dome of the Rock লিপি। প্রথমবারের মত কোরানের আয়াত উৎকির্ণ হল।

৬৯০ খৃষ্টাব্দ: ইসলামী সূত্র অনুসারে ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কোরান সংকলিত করেন। কোরানের অনান্য সংস্করণ পান সেগুলো পুড়িয়ে ফেলেন। সূত্রমতে তিনি কোরান পরিবর্তনও করেন

৭০৫-১৫ খৃষ্টাব্দ: প্রথম আল ওয়ালিদের শাসন।

৭১১-১৩: মহম্মদ বিন কাসেমের ভারত অভিযান। আরবদের সিন্ধু জয়

৭১১-১৮ খৃষ্টাব্দ: মুসলিমদের স্পেন জয়

৭৩২ খৃষ্টাব্দ:    ত্যুরের যুদ্ধে চার্লস মার্টেল মুসলিমদের অগ্রগতি রোধ করলেন।

৭৫০ খৃষ্টাব্দ:    আব্বাসীয় বিপ্লব, উমাইয়া শাসনের অবসান

৭৫০-৬০ খৃষ্টাব্দ: ইবনে ইশাক প্রথম সিরাত গ্রন্থ লিখলেন

৮৩০-৬০ খৃষ্টাব্দ: ষটি প্রধান হাদিস এই সময়ের মধ্যে লেখা হয়
                                        



               


রবিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৬

মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-১

                    
                            ইতিহাসের পথে ইসলামের অনুসন্ধান

২০০৮ সাল- নভেম্বর মাস, জার্মানীর মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক ধর্মতত্বের অধ্যাপক মুহম্মদ স্বেন কালিচ তার দীর্ঘদিনের গবেষনার ফল ঘোষনা করলেন। তিনি একদম পরিস্কারভাবে দুটো বিষয় তুলে ধরেন, প্রথমত- ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা মুহম্মদের সম্ভবত কোন অস্তিত্ব ছিল না। দ্বিতীয়ত, যদি ইসলামের ইতিহাসে কোন মুহম্মদ যদি থেকেও থাকে তার সাথে ইসলামিক বিবরণের মুহম্মদের কোনই সম্পর্ক নেই। বস্তুত ইসলমিক বিবরণের সবটাই প্রায় গল্পকথা মাত্র যা অনেক পরে রচিত হয়েছে। ইসলামিক বিবরণে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এমন ঐতিহাসিকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এক্ষেত্রে কালিচ মোটেও একা নন আর তিনিই প্রথম এই দাবী করলেন বিষয়টা এরকমও নয়। আসলে কালিচের এই ঘোষনার তাৎপর্য হল প্রথমত তিনি ছিলেন মুসলিম (জার্মানীর প্রথম ইসলামিক ধর্মতত্বের অধ্যাপক ছিলেন। ২০১০ সালে তিনি ইসলাম পরিত্যাগ করেন) আর দ্বিতীয়ত তার আগে কেউই এত দৃঢ়ভাবে মুহম্মদের অস্তিত্ব নাকচ করতে পারেনি।

এখন প্রশ্ন হল এই ঘোষনার ভিত্তি কি? আল্লার রাসুলের কর্মকান্ডের কি কোন ঐতিহাসিক প্রমান আছে, কোন শিলালিপি পাওয়া গেছে যা তার অস্তিত্ব প্রমান করে? সমকালীন অমুসলীম উৎস কি নবীর কর্মকান্ডের নিশ্চিত প্রমান দেয়?

উত্তর হচ্ছে না, কিস্যু নেই। ধর্মীয় সাহিত্যকে এত নিশ্চিতভাবে ইতিহাস হিসাবে গ্রহন করা চলতে পারে না যার মধ্যে আবার অসংখ্য পরস্পরবিরোধী ও অসংলগ্ন তথ্য রয়েছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের ১৬০ কোটি মানুষ এত দৃঢ়ভাবে ইসলামিক সূত্রে আস্থাশীল যে তাদের বিশ্বাসের জোর দেখে অনেক গবেষক পর্যন্ত্য প্রভাবিত হয়েছেন। ফলস্বরুপ কোরান ও অনান্য ইসলামিক সূত্রের অনুসন্ধান কোন নির্মোহ সংশয়ী দৃষ্টি নিয়ে করা হয়নি। যারাই এ বিষয়ে নিয়ে গভীর চর্চা করেছেন তারাই এ বিষয়ে ক্রিটিকাল দৃষ্টিভঙ্গীর অভাবের কথা লিখেছেন। গবেষক আর্থার জেফারি ১৯৩৭ সালে দেখেছিলেন-critical investigation of the text of Quran is a study which is still in its infancy”. পঞ্চাশ বছরেরও বেশী বাদে ১৯৯০ সালেও আমরা সেই একই কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই- I have often come encountered individuals who came to the study of Islam with a background in the historical study of Hebrew Bible or early Cristianity, who express surprise at the lack of critical thought that appears in introductory textbook on Islam. The notion that ‘Islam was born in the clear light of History’ is still seems to be assumed by a great many writers of such texts. (Andrew Rippin,1990)


  এতদসত্বেও বলতেই হবে যে বহু ঐতিহাসিক বিভিন্ন সময়ে ইসলামিক বিবরণের ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করেছেন এবং বিভিন্ন ইসলামিক উৎসের মধ্যেকার বৈপরীত্য খুঁজে বার করেছেন এবং সর্বশেষে ইসলামিক বিবরণের সাথে অমুসলিম উৎসের পার্থক্য দেখিয়েছেন। এইভাবে তারা প্রতিষ্ঠা করেছেন যাকে অ্যাকাডেমিক পরিভাষায় বলা হয় Revisionist School of Islamic Studiesজন ওয়ানসব্রাউ, গান্টার লুলিং, ক্রি্স্তোফ লুক্সেেমবার্গ, মাইকেল কুক, পাট্রিসিয়া ক্রোন এই সমস্ত গবেষকদের যে বিশাল গবেষনা রয়েছে তার উপর দাঁড়িয়ে আমরা অতি সহজেই হাদিস ও সিরাত কে ঐতিহাসিক প্রমান্য গ্রন্থ হিসাবে অস্বীকার করতে পারি। কারণ দেখা যায়-

১.মু্হম্মদের সমকালীন অর্থ্যাৎ সপ্তম শতাদ্বীর প্রথম চার দশকের কোন লেখায় মুহম্মদের কোন উল্লেখ নেই। শুধু তাই নয় ইসলাম বা মুসলিম শব্দটি আছে এমন কোন লেখা পাওয়া যায়নি। ৬৩৪ খ্রীস্টাব্দে রচিত একটি প্রায় ধূসর হয়ে যাওয়া ছোট চিরকুট আকারের বিবরণে মুহম্মদের নাম আছে বলে মনে করা হয়। এই বিষয়ে আমি পরে আসছি। প্রকৃতপক্ষে ওই চিরকুট থেকে কিছুই প্রমান করা যায়না। প্রথম বারের মত নিশ্চিতভাবে মুহম্মদের উল্লেখ পাওয়া যায় আর্মেনীয় খৃষ্টান বিশপ সেবিওসের বিবরণে।এটি ৬৭০ সালের দিকে রচিত হয়েছিল, মহম্মদের কথিত কর্মকান্ডের অন্তত ৩০-৪০ বছর বাদে।

২. এমনকি এই বিবরণেও মুহম্মদের অনুগামীদের মুসলিম বলা হয়নি বলা হয়েছে ইসমেলাইটএর আগের সব লেখাতেই আরবদের দ্বারা বিজিত মানুষরা তাদের সারাসেন, ইসমেলাইট, হাজারীয় ইত্যাদী হিসাবে চিহ্ণিত করেছে, মুসলিম হিসাবে নয়।

৩. কোরানে মুহম্মদের উল্লেখ আছে মাত্র চার বার। যেখানে মোসেস বা মুসা নবী ১৩৬ বার উল্লিখিত হয়েছেএমনকি ফেরাউনের উল্লেখ আছে ৭৬বার। যে সমস্ত সুরায় মুহম্মদের নাম আছে সেখানেও প্রসঙ্গ পরিস্কার নয়। এইসব জায়গায় অনায়াসে Mu-ammad শব্দের আভিধানিক অর্থ নিযুক্ত বা প্রসংশিত ব্যক্তি অনায়াসে লাগানো যেতে পারে।

৪. সিরা বা মুহম্মদের জীবনীগ্রন্থগুলি হল ইসলামিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রথম সিরাত গ্রন্থটি লেখেন ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৭) মুহম্মদের মৃত্যুর ১০০-১২৫ বছর পরেএই বইটি ঘোষিতভাবেই পরবর্তী সব মুসলিম ঐতিহাসিকদের সোর্স হিসাবে ব্যাবহৃত হয়েছে। হাদিসগুলি লেখা শুরু মুহম্মদের কথিত মৃত্যুর অন্তত দুশ বছর পরে।

৫. ৬-৭ প্রজন্ম পরে লেখা হাদিসগুলিকে কোন আধুনিক ঐতিহাসিকই ঐতিহাসিক বিবরণ হিসাবে স্বীকার করেন নি। সহজ বুদ্ধিতেই বোঝা যায় এধরনের বিবরণ সম্পূর্ণভাবে প্রচলিত মিথের উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য। মুসলিম স্কলাররাও অনেকেই জাল হাদিসের অস্তিত্ব মেনে নিয়েছেন। আমরা প্রতিনিয়ত দেখে থাকি মুনিন ভাইয়েরা কোন হাদিস নিয়ে অস্বস্তিতে পড়লেই সেটা তখুনি জাল হাদিস হয়ে যায়।

৬. দেখা যায় পরবর্তী ঐতিহাসিক আল ওয়াকিদি (৭৪৫-৮২২) অনেক বিষয়েই ইবনে ইশাকের থেকে বেশী জানেন। যেমন যেসব অভিযানে যুদ্ধ হয়নি- কেন, কি কারণে তার বিস্তারিত বর্ননা দিয়েছেন ওয়াকিদি- যেখানে ইবনে ইশাক শুধু উল্লেখ করেছেন। আল তাবারীর ইতিহাসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ভাল করে লক্ষ্য করলে পুরোটাকেই বানানো গল্পের একটা ট্রাডিশন ছাড়া কিছুই মনে হয়না।

৭.একাধিক হাদিস পাওয়া যায় যেখানে দেখা যাচ্ছে ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কোরান সংকলিত করছেন যেটা তার অন্তত ৪০ বছর আগেই উসমানের আমলে হয়ে যাওয়ার কথা। অন্য হাদিস অনুসারে মসজিদে কোরান তিলাওয়াত প্রথাও তিনিই চালু করেন।

ইসলামিক ইতিহাসের এরকম অসংখ্য অসংলগ্ন, পরস্পরবিরোধীতার উল্লেখ করা যেতে পারে যার জন্য যুক্তিবাদী মানুষের পক্ষে ইসলামিক ইতিহাসে আস্থা রাখা শক্ত। আপাতত ইসলামের পঞ্চম খলিফা মুআবিয়ার আমলে ছাপা মুদ্রার ছবি দিলাম; যেখানে দেখা যাচ্ছে মুসলিম শাসক একটি ক্রুস বহন করছেন। অপর পিঠে সম্ভবত মহম্মদের নাম রয়েছে।




কি বলেন মুনিন ভাইয়েরা, পুরোপুরি কুফরি!